নামমাত্র মূল্যে ‘রূপসা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প’-এ ফেঁসে যাচ্ছেন পদত্যাগকারী ও বর্তমান কিছু উচ্চপর্যায়ের বিচারপতি। তারা আপাতত আত্মগোপনে থাকলেও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে তাদের নাম উঠে এসেছে। তথ্যটি নিশ্চিত করেছে দুদক সূত্র।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, সুবিধা চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বহুমাত্রিক দুর্নীতির সহায়ক ছিলেন তৎকালীন বিচার বিভাগীয় নেতৃত্ব। তারা নিজেদের ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে শেখ পরিবারের স্বার্থে কাজ করতেন। বিনিময়ে নিজেদের জন্য আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন।
একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ হলো রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কর্তৃক বাস্তবায়িত কথিত ‘রূপসা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প’। রাজধানীর গুলশান এলাকায় কয়েক শত কোটি টাকার এই ফ্ল্যাট প্রকল্প মূলত বিতরণ করা হয়েছিল উচ্চপর্যায়ের রাজনীতি ও বিচার বিভাগের ব্যক্তিদের মধ্যে।
প্রকল্পের সুবিধা ভাগাভাগিতে নাম উঠে এসেছে ৪৮ জনের। এতে উল্লেখযোগ্যরা হলেন: পদত্যাগকারী প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীন, আপিল বিভাগের বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী, হাইকোর্টের বিচারপতি কামরুল হাসান মোল্যা, পদত্যাগকারী বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের ভাই আশিকুর রহিম। এছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব জাহাঙ্গীর আলম, রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান মিঞা (মরহুম), এবং সাবেক আইজি নূর মোহাম্মদও রয়েছেন।
প্রকল্পে অংশ নিয়েছেন আরও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা—খুলনা মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল ডা. জালাল আহমেদ, এফবিসিসিআই’র পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হায়দার ভূঁইয়া, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ডিজি সিদ্দিক মো. জুলফিকার রহমান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন, সচিব মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান সরকার, রাজউকের মেম্বার ইমরান কবির চৌধুরী, সদস্য (অ্যাস্টেট) নূরুল ইসলাম, আওয়ামী এমপি জহিরুল ইসলাম মোহনের মেয়ে ইফফাত জাহান অ্যামি, প্রশাসন ক্যাডারের ডা. এম. নাসির উদ্দিন মুন্সি, সচিব এসএম কামরুল হাসান ও যুগ্ম সচিব মিনাক্ষী বর্মন।
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই প্রকল্পে অংশগ্রহণকারীরা রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার সুবিধা নিয়ে নিজেদের জন্য কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন। মামলা-দুর্নীতি বিষয়ক তথ্য অনুসারে, এই প্রকল্প ছিল সরকারের অনুমোদন ও উচ্চপর্যায়ের সমর্থন ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের পর ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা এবং রূপসা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের সুবিধাভোগী বিচারপতি ও আওয়ামী দলের পদাধিকারিরা পালিয়ে গেছেন।
এ পরিস্থিতিতেও রাজউক প্রকল্পটি বাতিল করেনি। বরং সুবিধাভোগীরা এখনো উচ্চ আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজউক রাজধানীর গুলশানে ‘রূপসা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প’ হাতে নিয়েছিল। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল হাসিনার দীর্ঘ ফ্যাসিজমের বরকন্দাজদের পুরস্কৃত করা। এ জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার ও জোরপূর্বক দখল করা হয়েছিল গুলশান মডেল টাউনের সিএনডব্লিউ (বি) রোড ৩৫, বাড়ি-৮, গুলশান-২-এ অবস্থিত ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি সম্পত্তি।
১৯৬৩ সালের ৭ অক্টোবর তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) থেকে সম্পত্তিটি ৯৯ বছরের লিজ ডিড মূল্যে ওসমান শেখকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে ১৯৯০ সালে তিনি সম্পত্তিটি স্ত্রী জাহিরা ওসমান শেখকে দান করেন এবং খাজনা-খারিজ পরিশোধ করেন কিন্তু অজ্ঞাত কারণে রাজউক সম্পত্তিটিকে ‘ক’ তফসিল শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করে। হতবুদ্ধি জাহিরা ওসমান নিয়ম অনুযায়ী ‘কোর্ট অব সেটেলমেন্ট’-এ যান এবং ১৯৮৯ সালে মামলা (নং-৪১৯/৮৯) করেন। রেকর্ড পর্যালোচনার পর স্যাটেলমেন্ট কোর্ট ১৯৯১ সালের ১৪ এপ্রিল তার পক্ষে রায় দেন। এরপর ওসমান শেখ ইন্তেকাল করেন।
১৯৯৭ সালে সরকারপক্ষ স্যাটেলমেন্ট কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রিট (নং-১৭১৬/৯৭) করে। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার পর হাইকোর্ট জাহিরা ওসমানের পক্ষে দেয়া স্যাটেলমেন্ট কোর্টের রায় বহাল রাখে এবং দুই মাসের মধ্যে রাজউককে প্লট বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয় কিন্তু রাজউকের তৎকালীন প্রশাসন হাইকোর্টের রায় উপেক্ষা করে। জাহিরা ওসমান তখন সাপ্লিমেন্টারি এফিডেভিটের মাধ্যমে হাইকোর্টে আরেকটি মামলা (রিট নং-৩৪১৭/৯৭) করেন। এই আদেশও উপেক্ষা করায় তিনি আদালত অবমাননা মামলা দায়ের করেন। ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট জাহিরা ওসমানের পরিচয় সনাক্তের মাধ্যমে দ্রুত রায় বাস্তবায়নের জন্য গৃহায়ণ ও গঠনমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন কিন্তু নির্দেশ কার্যকর হওয়ার আগেই রাজউক সম্পত্তি দখলে নিয়ে ‘রূপসা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প’ বাস্তবায়ন শুরু করে।
মামলাসূত্রে জানা গেছে, ৩২ কাঠা প্লটের ওপর নির্মিত ‘রূপসা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প’-এর প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন প্রায় ৪ হাজার বর্গফুট (৩,৯৯৯ বর্গফুট)। প্রতি বর্গফুটের মূল্য ধরা হয়েছে ১৪ হাজার টাকা। ফলে এক ফ্ল্যাটের দাম দাঁড়ায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। পার্কিং ও ইউটিলিটি স্পেসের মূল্য আলাদাভাবে ধরা হয়েছে। সংবাদ সূত্রে জানা যায়, প্রচলিত বাজার মূল্যের চেয়ে প্রায় অর্ধেক দামে এই ফ্ল্যাট শেখ হাসিনা তার দোসরদের উপহারস্বরূপ দিয়েছেন। প্রকল্পের জন্য ধার্যকৃত অর্থ দুই ধরনের—দুর্নীতিপূর্ণভাবে অর্জিত অর্থ বা অজানা উৎস থেকে সংগৃহীত অর্থ।
সুবিধাভোগীদের মধ্যে ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীন, আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী, এম.ইনায়েতুর রহিম, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান মিঞাসহ আরও উচ্চপদস্থ বিচারক ও সরকারি কর্মকর্তা। তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজউকের মাধ্যমে প্লট তৈরি করেছেন। কোনো আইন-কানুন বা উচ্চ আদালতের রায়কে তোয়াক্কা করা হয়নি। বরং বহুবিধ দুর্নীতির মাধ্যমে কাজ হয়েছে।
চলতি বছরের ১৮ জুন গুলশান-২-এ (হোটেল ওয়েস্টিনের পেছনে) দুদকের অ্যানফোর্সমেন্ট টিম রাজউকের ‘রূপসা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প’-এ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। দুদক রাজউককে চিঠি দিয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। তবে অদ্যাবধি প্রকল্প বাতিল হয়নি।
দুদকের উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) মো: আকতারুল ইসলাম বলেন, “বিগত সরকারের সময় গোপনে অনুগত বিচারপতি, আমলা, আওয়ামী লীগ নেতা, তাদের সন্তান এবং বিভিন্ন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদেরকে বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। আমাদের টিম বরাদ্দ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা যাচাইয়ে আবেদনপত্র, বরাদ্দ সংক্রান্ত কাগজপত্র ও বরাদ্দপ্রাপ্তদের তালিকা সংগ্রহ করেছে। বর্তমানে রূপসা অ্যাপার্টমেন্ট দুর্নীতির আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান চলছে।”
প্লটের প্রকৃত মালিক মো: মোতালেব ভুইয়া অভিযোগ করেন, “হাইকোর্টের রায় আমার পক্ষে এসেছে। তবু সেই রায়ের তথ্য গোপন করে বিচারপতি ও প্রভাবশালী আমলারা ক্ষমতার অপব্যবহার ও জালিয়াতির মাধ্যমে আমার সম্পত্তি জবর দখল করেছে। রাজউক এই অনিয়মের অনুঘটক হিসেবে দায়িত্বে ছিল। আমি এখনো আইনি লড়াই চালাচ্ছি।”

