গণঅভ্যুত্থানের পর দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে নতুন গতি এসেছে। স্থাবর–অস্থাবর সম্পদ ক্রোক, অবরুদ্ধ করা এবং ধরপাকড়—সব ক্ষেত্রেই রেকর্ড সাফল্য দেখাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই সঙ্গে মামলা ও চার্জশিটেও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
দুদকের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মোট ৫৪১টি মামলা বা এজাহার দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় অভিযুক্ত হয়েছে বিভিন্ন শ্রেণীর ২ হাজার ২৯৭ জন। একই সময়ে ১ হাজার ২০৩ জন আসামির বিরুদ্ধে ৩৪৯টি মামলায় চার্জশিট দাখিল করেছে দুদক অর্থাৎ, মামলা ও চার্জশিট মিলিয়ে সাড়ে ৩ হাজারেরও বেশি তথাকথিত ভিআইপি আসামি এবার দুদকের জালে ধরা পড়েছেন।
নতুন অনুসন্ধানেও পিছিয়ে নেই সংস্থাটি। জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত নতুন করে ১ হাজার ৬৩টি অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সময় দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ৩৮২টি সম্পদ বিবরণী নোটিশ জারি হয়েছে। অন্যদিকে ১১ মাসে ২৩০ জনকে অব্যাহতি দিয়ে ৮২টি মামলায় এফআর (ফাইনাল রিপোর্ট) এবং ৩৯টি পরিসমাপ্তি দেওয়া হয়েছে।
তুলনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৪৩৯টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য আমলে নিয়েছিল দুদক। ওই সময়ে ৩২৮টি মামলা এবং ৩৪৫টি মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়। তবে ওই বছরের নভেম্বরে কমিশন না থাকায় কোনো নতুন অনুসন্ধান বা মামলার সিদ্ধান্ত হয়নি। একই বছরে মোট ২২৭টি অভিযোগের পরিসমাপ্তি করা হয় এবং ৪৮টি মামলায় অব্যাহতি বা পরিসমাপ্তি দেওয়া হয়েছিল।
২০২৩ সালে তুলনায় আরও স্পষ্ট। অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে ৮৪৫টি অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ৪০৪টি মামলা ও ৩৬৩টি চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিসমাপ্তি বা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে ১৩ হাজার ৫৭৯টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছিল। অর্থাৎ ওই সব অভিযোগে দুর্নীতি পাওয়া যায়নি।
দুদকের কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী বলেন,“দুদকের দন্ত ও নখ রয়েছে। আরও তীক্ষ্ণ করার প্রয়োজন আছে। দুদক যথার্থ আইনী শক্তিতে সমৃদ্ধ। বিচারকাজে গতিশীলতা আনার জন্য আরও বিশেষ আদালত দরকার।”
দুদকের সাড়ে ৩ হাজার আসামির তালিকায় রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহেনা, ছেলে সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোনের ছেলে রাদওয়ান মুজিব, মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকসহ শেখ পরিবারের অন্যান্য সদস্য।
এছাড়া তালিকায় আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, এস আলম গ্রুপের মালিক শামসুল আলম, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়েদুল কাদের, সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, হাসানুল হক ইনু, আনিসুল হক, দীপু মনি, রাশেদ খান মেনন, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নাজমুল হাসান পাপন, টিপু মুনশি, গোলাম দস্তগীর গাজী, জাহিদ মালিক, নসরুল হামিদ বিপু, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও আরও অনেক প্রভাবশালী মন্ত্রী ও এমপি।আসামির তালিকায় রয়েছে বড় বড় ব্যবসায়ীরা এবং গ্রুপগুলো—এস আলম গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নূরজাহার গ্রুপ, অ্যাননটেক্স গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও জেমকন গ্রুপ।
সম্পদ অবরুদ্ধ ও ক্রোকেও দুদকের রেকর্ড সাফল্য:
গত ১১ মাসে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধে রেকর্ড সাফল্য অর্জন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ও বিদেশে দুর্নীতিবাজ, অর্থপাচারকারী, সরকারি লোপাটকারী এবং ঋণখেলাপিসহ তিন শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৬ হাজার ১৩ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
তুলনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের পুরো বছরে ক্রোক ও অবরুদ্ধের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৬১ কোটি টাকা। পাঁচ বছরের হিসাব করলে—২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত—ক্রোক ও অবরুদ্ধ সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত ১১ মাসে দুদক নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে।
আদালত ও দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩ হাজার ৪৫৭ কোটি ৮৩ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ক্রোক করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ২২ হাজার ২২৬ কোটি ৭৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা এবং বিদেশে ৩২৮ কোটি ৩৮ লাখ ১৩ হাজার টাকা ফ্রিজ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে–বিদেশে মোট ২৬ হাজার ১৩ কোটি ২ লাখ ৯৩ হাজার টাকা সম্পদ ক্রোক ও ফ্রিজ করা হয়েছে।
একই সময়ে বিচারাধীন মামলার মধ্যে ২৪৯টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১২৬টি মামলায় সাজা হয়েছে, ১২৩টি মামলায় খালাস দেওয়া হয়েছে। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৫ হাজার ৫৮ কোটি টাকা এবং বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে ৩২১ কোটি টাকা। এ সময় মোট ১১ হাজার ৬৩০টি অভিযোগ আসে, যার মধ্যে মাত্র ৯৬০টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ৭৯৮টি এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।

