দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্তির পর ২০০৪ সালে বিচারপতি সুলতান হোসেন খানের নেতৃত্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যাত্রা শুরু করে। এর পর থেকে সাবেক সেনাপ্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরী, সাবেক সচিব গোলাম রহমান, মো. বদিউজ্জামান, ইকবাল মাহমুদ ও মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহর মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও দুদকের ভাবমূর্তিতে তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি।
বর্তমান কমিশন, ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বে, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করে। জুলাইয়ের অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ের সংকট উত্তরণে, আগের সরকারের দুর্নীতিবাজদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং দেশের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এই কমিশনের মূল দায়িত্ব হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে।
দুদক বর্তমানে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, অনুসন্ধান ও তদন্তে ব্যস্ত সময় পার করছে। এক বছরের মধ্যে কমিশন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য দেখিয়েছে। চলতি বছরে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ১২ হাজারের বেশি অভিযোগ দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৬৩টি অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া মামলা ও চার্জশিটে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ‘ভিআইপি’ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দুদকের জালে আটকা পড়েছেন। দুদকের এই কার্যক্রম দেশের দুর্নীতি মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং ভবিষ্যতে আরও ফলপ্রসূ হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় সব মন্ত্রী, সাবেক আমলা এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীর মালিকরা। ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশে তাদের প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার সম্পদ অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করা হয়েছে। অর্থাৎ, অসীম ক্ষমতার দুর্গে হানা দিয়ে বিদায়ী বছরে রেকর্ড সাফল্য দেখিয়েছে দুদক। তবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া অথবা দুদক সংস্কারে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার বিতর্ক থেকে সংস্থাটি এখনও মুক্ত হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন বলেছেন, “দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেওয়া ছাড়া রাষ্ট্রের জন্য অন্য কোনো বিকল্প নেই। দুর্নীতি দমন কমিশন সেই রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে গত এক বছরে তার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীবিশেষকে লক্ষ্য করে নয়; বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ সুরক্ষাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। সে কারণেই অনুসন্ধান, মামলা ও সম্পদ অবরুদ্ধ করার ক্ষেত্রে অতীতের তুলনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও আইনগত টেকসইতার পরীক্ষায় প্রতিটি পদক্ষেপকে উত্তীর্ণ করতে দুদক বদ্ধপরিকর।”
দুদকের জালে সাড়ে তিন হাজার ভিআইপি:
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরে জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৮৯০টি মামলা ও চার্জশিটে বিভিন্ন শ্রেণীর সাড়ে তিন হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। অধিকাংশ ভিআইপি পর্যায়ের আসামি রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী। এর মধ্যে দুই হাজার ২৯৭ জনের বিরুদ্ধে ৫৪১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সময়ে এক হাজার ২০৩ জনের বিরুদ্ধে ৩৪৯টি মামলায় অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে।
তদুপরি, দুদক আরও ১ হাজার ৬৩টি নতুন অনুসন্ধান শুরু করেছে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ৩৮২টি সম্পদ বিবরণী নোটিশ জারি করা হয়েছে। বিগত ১১ মাসে ২৩০ জনকে অব্যাহতি দিয়ে ৮২টি চূড়ান্ত প্রতিবেদন (এফআর) ও ৩৯টি পরিসমাপ্তি মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে। তুলনামূলকভাবে, ২০২৪ সালের প্রথম ১১ মাসে শুধুমাত্র ৪৩৯টি অভিযোগ অনুসন্ধানে নেওয়া হয়েছিল। ওই বছর ৩২৮টি মামলা করা হয়েছিল এবং ৩৪৫টি মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়েছিল। নভেম্বরে কোনো কমিশন না থাকায় নতুন অনুসন্ধান বা মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। এছাড়া ওই বছর ২২৭টি অভিযোগ নথিভুক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছিল এবং ৪৮টি মামলা থেকে আসামিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।
২০২৩ সালে অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে ৮৪৫টি অনুসন্ধান করা হয়েছিল। ওই সময় ৪০৪টি মামলা এবং ৩৬৩টি চার্জশিট দায়ের করা হয়েছিল। তবে ১৩ হাজার ৫৭৯টি অভিযোগ নথিভুক্ত বা অব্যাহতি দেওয়ার কারণে অনুসন্ধান বিভাগ প্রমাণ পাননি। তিন বছরের তুলনায় চলতি বছর দুদক মামলা, চার্জশিট ও অনুসন্ধানে অতীতের তুলনায় অনেক বেশি সফলতা দেখিয়েছে।
বিদায়ী বছরে দুদকের সাড়ে তিন হাজার আসামির তালিকায় রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহেনা, ছেলে সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোনের ছেলে রাদওয়া মুজিব, মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।
এর পাশাপাশি তালিকায় আছে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, এস আলম গ্রুপের মালিক শামসুল আলম, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, হাসানুল হক ইনু, আনিসুল হক, দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নাজমুল হাসান পাপন, টিপু মুনশি, গোলাম দস্তগীর গাজী, জাহিদ মালিক, নসরুল হামিদ বিপু, খালিদ মাহমুদ চৌধুরীসহ প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিরা। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের মধ্যে এস আলম গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নূরজাহার গ্রুপ, অ্যাননটেক্স গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও জেমকন গ্রুপের মালিকরা দুদকের জালে আটকা পড়েছেন।
দুদকের সম্পদ ক্রোক ও ফ্রিজে রেকর্ড:
বিগত ১১ মাসে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক এবং অবরুদ্ধকরণের ক্ষেত্রে রেকর্ড সাফল্য দেখিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে-বিদেশে দুর্নীতিবাজ, অর্থপাচারকারী, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎকারী এবং ঋণখেলাপিসহ প্রায় সাড়ে ৩০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ২৭ হাজার ৯৬০ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক ও ফ্রিজ করা হয়েছে।
তুলনামূলকভাবে, ২০২৪ সালের পুরো বছর ক্রোক ও অবরুদ্ধকৃত সম্পদের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৬১ কোটি টাকা। এছাড়া ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত পাঁচ বছরে মোট ক্রোক ও ফ্রিজ করা সম্পদ ছিল প্রায় তিন হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত ১১ মাসে দুদক সম্পদ ক্রোক ও ফ্রিজে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
আদালত ও দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের স্থাবর সম্পদ হিসেবে ৪ হাজার ২৯০ কোটি ৪০ লাখ ২১ হাজার ৬৯৪ টাকা ক্রোক করা হয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দেশে ২২ হাজার ৬২২ কোটি ৮ লাখ ৮৩ হাজার ৪৪৬ টাকা ফ্রিজ করা হয়েছে। বিদেশে স্থাবর সম্পদ হিসেবে ৯৬ কোটি ৫৩ লাখ ৮০ হাজার ২৫ টাকা এবং অস্থাবর হিসেবে ৯৪৪ কোটি ৫৮ লাখ ৩০ হাজার ৯১৬ টাকা ফ্রিজ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে-বিদেশে ৩৩৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ক্রোক ও ফ্রিজ করা হয়েছে।
এছাড়া, বিগত ১১ মাসে বিচারাধীন মামলার মধ্যে ২৪৯টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২৬টি মামলায় সাজা হয়েছে, ১২৩টি মামলায় খালাস দেওয়া হয়েছে। জরিমানা আদায় করা হয়েছে পাঁচ হাজার ৫৮ কোটি টাকা এবং বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে ৩২১ কোটি টাকা। একই সময়ে ১১ হাজার ৬৩০টি অভিযোগ দায়ের হলেও মাত্র ৯৬০টি অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা হয়েছে। এই সময়ে ৭৯৮টি এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। সংস্থাটি সম্প্রতি নতুন ৩ পরিচালকও নিয়োগ করেছে, যা দুদকের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
১১ বিশেষ টাস্কফোর্সে আলোচিত ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠী:
চলতি বছরে দুর্নীতি, অর্থপাচার, ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি ও বড় শিল্পগোষ্ঠীর অনিয়ম অনুসন্ধান করতে ১১টি বিশেষ ‘টাস্কফোর্স’ বা যৌথ তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। এই দলগুলোর দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে দেশের শীর্ষ ১০টি শিল্পগোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনিয়ম, পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, ব্যাংক ঋণ দুর্নীতি, কর ফাঁকিসহ অন্যান্য অভিযোগ তদন্ত করা।
শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে—এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ। এছাড়া সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান ও এইচ এম ইকবাল সংশ্লিষ্ট শিল্প প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি এবং শেখ পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হচ্ছে।
দুদকের যৌথ তদন্ত দল ইতোমধ্যে ১০৪টি মামলা দায়ের করেছে। এর মধ্যে ১৪টি মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং চারটি মামলায় আদালতের রায় প্রদান করা হয়েছে। অনুসন্ধান ও তদন্ত চলাকালীন দেশে ৫৫ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা এবং বিদেশে ১০ হাজার ৫০৮ কোটি টাকার সম্পদ ফ্রিজ ও ক্রোক করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে ও বিদেশে ৬৬ হাজার ১৪৬ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও ফ্রিজ করা হয়েছে। এছাড়া, বিদেশে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার করতে আইনি সহযোগিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে ২১টি মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে।
কাঠগড়ায় শেখ পরিবার:
চব্বিশের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণহত্যার দায়ে ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর পাশাপাশি দুদক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের দুর্নীতি ও অনিয়ম সংক্রান্ত মামলার তদন্তেও পিছিয়ে নেই।
গত এক বছরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ১৫টির বেশি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর পূর্বাচলে ৬০ কাঠা প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত মামলায় আদালত রায় ঘোষণা করেছে। রায়ে শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোন শেখ রেহানা, ভাগনি ও ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব সালাউদ্দিন এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ১৪ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এক বছরের ব্যবধানে শেখ পরিবারের সদস্য ও ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত উল্লেখযোগ্য মামলার মধ্যে রয়েছে—সেতুর টোলের ৩০৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ, সজীব ওয়াজেদ জয়ের ৬০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ, টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে গুলশানের প্লট দুর্নীতি, সূচনা ফাউন্ডেশনের নামে ৪৪৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ, সিআরআই-এর অনুদানের ৪৩৯ কোটি টাকার লেনদেনের অনিয়ম, রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের অবৈধ সম্পদ এবং তারিক আহমেদ সিদ্দিকের পরিবারের বিরুদ্ধে ৬২ কোটি টাকার দুর্নীতি।
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত এক বছরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পরিবারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি সংক্রান্ত অনুসন্ধান চলছে। অন্যদিকে, প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে শেখ মুজিবের জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ পালন এবং ১০ হাজারের বেশি ম্যুরাল ও ভাস্কর্য নির্মাণের অভিযোগে অর্থ অপচয় ও ক্ষতিসাধনের মামলা নিয়েও দুদকের অনুসন্ধান চলমান।
আলোচিত টিউলিপ সিদ্দিক:
চলতি বছরে দেশে আলোচিত কয়েকটি মামলা মধ্যে টিউলিপ সিদ্দিকের মামলা সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে। ব্রিটিশ এমপি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়ায় এই মামলাটি আইনি ছাড়াও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মাত্রা পেয়েছে।
২০২৫ সালের শুরুতে দুদক রাজধানীর রাজউকে প্লট গ্রহণ ও সম্পদ অর্জন সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানে পাওয়া প্রমাণ অনুযায়ী, ক্ষমতার প্রভাব এবং পারিবারিক পরিচয় ব্যবহার করে অনিয়মের মাধ্যমে প্লট ও সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
ঢাকার গুলশানের একটি প্লট ‘অবৈধভাবে হস্তান্তরের ব্যবস্থা’ করার বিনিময়ে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড থেকে ‘ঘুষ’ হিসেবে একটি ফ্ল্যাট নেওয়ার অভিযোগে টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এছাড়া, পূর্বাচলে মা শেখ রেহানা, ভাই রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও বোন আজমিনা সিদ্দিকসহ পরিবারের সদস্যদের নামে ৩০ কাঠা প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত মামলার রায়ে আদালত তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছে।
দুদকের মামলার ভিত্তিতে আদালত টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছিল। সাধারণত দেশীয় রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা সাধারণ ঘটনা হলেও একজন বিদেশি এমপি এবং ব্রিটিশ সরকারের সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণা হওয়া নজিরবিহীন। মামলার পর টিউলিপ সিদ্দিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দুদকের মামলা ও আদালতের রায়কে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ত্রুটিপূর্ণ ও প্রহসনমূলক” হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আলোচিত দুদক কর্মকর্তা শরীফের চাকরি পুনর্বহাল:
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বরখাস্ত হওয়া দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিনকে গত ৯ জুলাই হাইকোর্ট চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। রায়ে বলা হয়, ৩০ দিনের মধ্যে তাকে বকেয়া বেতন-ভাতাসহ সব সুযোগ-সুবিধা দিয়ে চাকরিতে যোগদানের সুযোগ দিতে হবে।
দুদক রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে ৯ নভেম্বর চেম্বার আদালতের রায়ও শরীফ উদ্দিনের পক্ষে যায়। সর্বশেষ ১২ নভেম্বর তিনি দুদক কর্তৃপক্ষের কাছে চাকরিতে যোগদানের অনুমতির আবেদন করেন। তবে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার কারণে তিনি এখনো সংস্থায় কাজে ফিরতে পারেননি। দীর্ঘ তিন বছর পর চাকরি ফিরে পাওয়ার এই রায় চলতি বছরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা।
২০২২ সালের ১৩ মার্চ শরীফ উদ্দিন চাকরি ফেরত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। তার পক্ষে ব্যারিস্টার মিয়া মোহাম্মদ ইশতিয়াক রিটটি দায়ের করেছিলেন। এর আগে ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহর সই করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তার বরখাস্ত করা হয়েছিল। অপসারণের পর সারা দেশে দুদকের কর্মকর্তারা নজিরবিহীন আন্দোলনে নেমেছিলেন। তবে সে সময় তার চাকরি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
দুদক সংস্কার কমিশন:
বিদায় নিতে যাওয়া ২০২৫ সালে আরও একটি আলোচিত ঘটনা হলো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন। ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানকে প্রধান করে আট সদস্যের কমিশন গঠন করা হয়।
দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এরপর ৮ ফেব্রুয়ারি সরকার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বিভিন্ন এজেন্সির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে আলাদা টাস্কফোর্স গঠন, সংস্থাটিকে ‘স্বাধীন’ ও ‘সাংবিধানিক’ স্বীকৃতি দেওয়া এবং দুদকের সংস্কারে ৪৭টি সুপারিশ করা হয়।
সংস্কার কমিশন সুপারিশ করেছিল, দুদককে কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে এবং সংস্থার আমূল সংস্কারে ক্ষমতার অপব্যবহার, আইন পরিবর্তনসহ ১০টি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন। এর মধ্যে বড় দুর্নীতির তদন্তে টাস্কফোর্স গঠনও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে ২৮ নভেম্বর ‘দুদক অধ্যাদেশ ২০২৫’-এ গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুপারিশ বাদ দেওয়ায় টিআইবি গভীর ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে। সংস্থার অভিযোগ, ক্ষমতাসীনদের ইঙ্গিতে দুদককে প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা বন্ধ করতে প্রস্তাবিত “বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি” ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “জন্মলগ্ন থেকেই দুদক জনআস্থার সংকটে ভুগছে। ক্ষমতাসীনদের সুরক্ষা দেওয়া ও প্রতিপক্ষকে হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ইতিহাস থেকে বেরিয়ে আসতে ‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত জরুরি ছিল। সরকার তা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।”

