দেশের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে আবারো উঠে এসেছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি বা বিআরটিএর নাম। এই খাতের সেবা নিতে গিয়ে ৬৩ দশমিক ২৯ শতাংশ নাগরিককে ঘুষ দিতে হয়েছে। দুর্নীতির তালিকায় বিআরটিএর পরেই রয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। এসব সংস্থার সেবা পেতে ৫৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ মানুষ ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
তালিকার পরের অবস্থানে রয়েছে পাসপোর্ট অফিস। এই দপ্তরের সেবা নিতে গিয়ে ৫৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ নাগরিককে ঘুষ দিতে হয়েছে। ঘুষ দেওয়ার দিক থেকে জেলা পর্যায়ে সবার শীর্ষে রয়েছে নোয়াখালী। এর পরেই অবস্থান কুমিল্লার। তৃতীয় অবস্থানে ফরিদপুর। বিপরীতে সবচেয়ে কম ঘুষ দেওয়ার জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। জরিপে দেখা গেছে, ঘুষ দেওয়ার ক্ষেত্রে ধনী শ্রেণির মানুষ তুলনামূলকভাবে এগিয়ে। এসব তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।
বিবিএস পরিচালিত সর্বশেষ সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে বা সিপিএসের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল বুধবার আগারগাঁওয়ের পরিসংখ্যান ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার। বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরিপে অংশ নেওয়া ৩১ দশমিক ৬৭ শতাংশ নাগরিক গত ১২ মাসে কোনো না কোনো সরকারি সেবা নিতে গিয়ে সরাসরি ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। পুরুষদের মধ্যে ঘুষ দেওয়ার হার ৩৮ দশমিক ৬২ শতাংশ। নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ২২ দশমিক ৭১ শতাংশ। ঘুষ হিসেবে প্রায় ৯৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ ক্ষেত্রেই টাকা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা।
জরিপে নাগরিকদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে নিরাপত্তা, সুশাসন, সরকারি সেবার মান, দুর্নীতি, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার এবং বৈষম্য—এসডিজি ১৬-এর ছয়টি সূচকের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয়েছে। জাতীয়ভাবে জরিপে অন্তর্ভুক্ত খানাগুলোর গড় সদস্যসংখ্যা ৪ জন। এর মধ্যে ৮১ দশমিক ৯৭ শতাংশ পরিবার পুরুষপ্রধান এবং ১৮ দশমিক ০৩ শতাংশ পরিবার নারীপ্রধান।
নিরাপত্তাবোধের চিত্রেও উঠে এসেছে ভিন্ন বাস্তবতা। জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৮৪ দশমিক ৮১ শতাংশ নাগরিক সন্ধ্যার পর নিজ বাসার আশপাশে একা চলাফেরা করতে নিরাপদ বোধ করেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৮৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ। নারীদের মধ্যে ৮০ দশমিক ৬৭ শতাংশ। সন্ধ্যার পর নিজ বাড়িতে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ বোধ করেন ৯২ দশমিক ৫৪ শতাংশ মানুষ।
তবে সরকারি সিদ্ধান্তে নাগরিকদের প্রভাব খুবই সীমিত। মাত্র ২৭ দশমিক ২৪ শতাংশ নাগরিক মনে করেন, তাঁরা সরকারি সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারেন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এই হার নেমে এসেছে ২১ দশমিক ৯৯ শতাংশে। জাতীয়ভাবে ২৪ দশমিক ৬২ শতাংশ মানুষ মনে করেন, দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সাড়াপ্রবণ। এই ধারণায় গ্রাম ও শহরের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই।
গত ১২ মাসে সরকারি সেবা গ্রহণের চিত্রও উঠে এসেছে জরিপে। জাতীয়ভাবে ৪৭ দশমিক ১২ শতাংশ মানুষ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন। ৪০ দশমিক ৯৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁদের অন্তত একটি সন্তান সরকারি প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। পরিচয়পত্র বা নাগরিক নিবন্ধনের মতো অন্যান্য সরকারি সেবা নিতে অন্তত একবার চেষ্টা করেছেন ৭৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ মানুষ। এসব সেবার মধ্যে স্বাস্থ্যসেবায় সন্তুষ্টির হার ৭২ দশমিক ৬৯ শতাংশ। প্রাথমিক শিক্ষায় ৮১ দশমিক ৫৬ শতাংশ। মাধ্যমিক শিক্ষায় ৭৮ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং অন্যান্য সরকারি সেবায় সন্তুষ্টির হার ৬৬ দশমিক ৯১ শতাংশ।
জেলা পর্যায়ে ঘুষ দেওয়ার হার জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক জায়গায় বেশি। সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা নাগরিকদের মধ্যে নোয়াখালীতে ৫৭ দশমিক ১৭ শতাংশ ঘুষ দিয়েছেন। কুমিল্লায় এই হার ৫৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ফরিদপুরে ৫১ দশমিক ৭০ শতাংশ। ভোলায় ৪৯ দশমিক ০১ শতাংশ এবং সিরাজগঞ্জে ৪৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এসব জেলায় ঘুষ প্রদানের হার জাতীয় গড়ের অনেক ওপরে।
অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঘুষ দেওয়ার হার মাত্র ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এরপর রয়েছে মাগুরা ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ, লালমনিরহাট ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ, গাজীপুর ১৫ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং সিলেট ১৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। এসব জেলায় ঘুষ দেওয়ার হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
আয়ভিত্তিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সবচেয়ে ধনী শ্রেণির ৩৫ দশমিক ১৬ শতাংশ মানুষ ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। সবচেয়ে দরিদ্র শ্রেণিতে এই হার ২৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। মধ্যম আয়ের ক্ষেত্রে ঘুষ দেওয়ার হার ৩২ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং উচ্চ-মধ্যম আয়ের ক্ষেত্রে ৩৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ আয়ের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুষ দেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই তথ্য প্রচলিত ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, দুর্নীতি শুধু দারিদ্র্যজনিত সমস্যা নয়। এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও আচরণগত সংকট।
জরিপে আরও দেখা গেছে, গত দুই বছরে দেশের ১৬ দশমিক ১৬ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো বিরোধের মুখে পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৮৩ দশমিক ৬০ শতাংশ আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ পেয়েছেন। ৪১ দশমিক ৩৪ শতাংশ আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান এবং ৬৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সেবা পেয়েছেন।
বৈষম্যের অভিজ্ঞতার কথাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। দেশের ১৯ দশমিক ৩১ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। বৈষম্যের প্রধান কারণ ছিল আর্থসামাজিক অবস্থা এবং লিঙ্গ। এসব ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে পরিবারের ভেতরে, গণপরিবহন বা উন্মুক্ত স্থানে এবং কর্মস্থলে। তবে মাত্র ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ ভুক্তভোগী এসব ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।
বিবিএস জানায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশের ৬৪ জেলার ৪৫ হাজার ৮৮৮টি খানার ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী ৮৪ হাজার ৮০৭ জন নারী ও পুরুষ এই জরিপে অংশ নেন। নাগরিকদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে এসডিজি ১৬-এর ছয়টি লক্ষ্যের অগ্রগতি মূল্যায়নে এই জরিপ পরিচালিত হয়।

