বছরজুড়ে দেশে আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছিল ‘মব সন্ত্রাস’। বিদায়ী ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তে এসেও এর ভয়াবহতা কমেনি। জানুয়ারি থেকে নভেম্বর—এই ১১ মাসে সারা দেশে মব সন্ত্রাসের ঘটনায় অন্তত ১৮৪ জনের প্রাণ গেছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য এ চিত্র তুলে ধরেছে।
এর বাইরে বছরজুড়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটেছে একের পর এক নির্মম ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড। প্রতিটি ঘটনাই সমাজে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
গত ৯ জুলাই পুরান ঢাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী মো. সোহাগ ওরফে লাল চাঁদকে প্রকাশ্যে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা হয়। ঘটনার সময় বিকৃত উল্লাস পুরো দেশকে স্তম্ভিত করে। একইভাবে ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় সংখ্যালঘু যুবক দিপু চন্দ্র দাসকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যার পর তাঁর মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
বছরের বিভিন্ন সময়ে এমন আরও অনেক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। তবে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ বিন ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড সাধারণ মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সম্মুখ সারির এই নেতার মৃত্যু দলমত নির্বিশেষে মানুষকে কাঁদিয়েছে। দেশজুড়ে শুরু হয় প্রতিবাদ ও আন্দোলন। হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে এখনো সোচ্চার ইনকিলাব মঞ্চ।
এদিকে বছরের বিভিন্ন সময়ে বাউলদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনাও ঘটেছে। রাজবাড়ীতে কবর থেকে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার লাশ তুলে ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে বিকৃত উল্লাস করা হয়। এসব বর্বরোচিত ঘটনায় সামাজিক উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
হাদি হত্যাকাণ্ডের জেরে বিভিন্ন ব্যানারে মব তৈরি করে দেশের প্রথম সারির দুটি পত্রিকার কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এই নজিরবিহীন সহিংসতা দেশ-বিদেশে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। একইভাবে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ও উদীচী ভবনেও হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
গত বছরের মতো ২০২৫ সালেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে একাধিকবার ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আরও গভীর হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সরকার নানা ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ বরাবরই উঠে এসেছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, খুন, ছিনতাই ও ডাকাতি রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ভীতি ও অস্থিরতা তৈরি করে। বিশেষ করে মব সন্ত্রাস ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণে সরকারের অর্জনগুলো ম্লান হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, যেভাবে অসহিষ্ণুতা প্রকাশ পেয়েছে এবং যে মাত্রায় ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণনাশ হয়েছে, তা তিনি কখনো প্রত্যাশা করেননি। তাঁর ভাষায়, কোনো অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকতে পারে, কিন্তু আইনশৃঙ্খলার এমন বিপর্যয় খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো শক্ত পদক্ষেপ দেখা যায়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দক্ষতা ও পেশাদারত্বের ঘাটতি স্পষ্ট। পুলিশের মনোবল ও কর্মদক্ষতা বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগও ছিল না। সব মিলিয়ে এতে অন্তর্বর্তী সরকারের গ্রহণযোগ্যতা কমেছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে মব সন্ত্রাসের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৮৪ জন। এর মধ্যে ঢাকায় সর্বোচ্চ ৭৮ জন। চট্টগ্রামে নিহত ৩২ জন। খুলনায় ১৯ জন। বরিশালে ১৫ জন। রাজশাহীতে ১৪ জন। রংপুরে ১২ জন। ময়মনসিংহে ১০ জন এবং সিলেটে ৪ জন নিহত হন। ডিসেম্বরের তথ্য এখনো হালনাগাদ না হলেও এই মাসেও হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, একই সময়ে সারা দেশে রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে ৩৮৩টি। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৯৮ জন। আহত হয়েছেন ৪ হাজার ৪৭৬ জন। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাত সবচেয়ে বেশি হয়েছে বিএনপিতে। আহত ও নিহত নেতা-কর্মীর সংখ্যাও দলটিতে বেশি। পাশাপাশি ২০২৫ সালের এই ১১ মাসে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ৬৫ বার।
সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, বছরজুড়েই সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা কাজ করেছে। পুলিশ যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল, সেখানে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা এবং জবাবদিহির অভাবের সুযোগে ধারাবাহিকভাবে মব সন্ত্রাস হয়েছে। একই কারণে পেশাদার অপরাধীদের প্রকাশ্য তৎপরতা ও খুনোখুনি বেড়েছে। তাঁর মতে, পুরো বছরটাই কেটেছে এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, বিদায়ী বছরজুড়ে উচ্ছৃঙ্খল জনতা ও বিভিন্ন ব্যানারে সংঘটিত মব সন্ত্রাস মানুষের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এসব ঘটনা মানবাধিকার ও নাগরিক নিরাপত্তাকে বারবার হুমকির মুখে ফেলেছে। রাজনৈতিক প্ররোচনা বা সামাজিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এসব সহিংসতায় বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।

