এস আলম গ্রুপকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত ব্যাংকিং দুর্নীতির অভিযোগসমূহ বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ ও বহুমাত্রিক সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই কেলেঙ্কারির ব্যাপ্তি কেবল অর্থ আত্মসাৎ বা ঋণ খেলাপিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক দখল, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অপব্যবহার, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার ম্যানিপুলেশন, সংগঠিত অর্থ পাচার এবং রাষ্ট্রীয় আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর আঘাত। অনুসন্ধান ও মামলার নথি অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম, তাঁর স্ত্রী, সন্তান, ভাইসহ পরিবারের একাধিক সদস্য এবং বিভিন্ন ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা এই কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে অভিযোগ আনা হয়েছে।
এই প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, জনতা ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংকে সংঘটিত অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের পদ্ধতি, আইনি লঙ্ঘন, এবং এর সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবকে একটি সুসংহত কাঠামোয় উপস্থাপন করা হয়েছে।
এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের একটি মৌলিক স্তম্ভ হলো ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ ও দখলের প্রক্রিয়া। অভিযোগ অনুযায়ী, গ্রুপটি ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করে ১৯টিরও বেশি বেনামী বা প্রক্সি কোম্পানির মাধ্যমে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকসহ অন্তত ছয়টি শরীয়াহ-ভিত্তিক ব্যাংকের প্রায় অর্ধেক শেয়ার গোপনে অধিগ্রহণ করে। রাজনৈতিক প্রভাব ও বিশেষ অনুমতির অপব্যবহারের মাধ্যমে এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ প্রক্রিয়াকে নিজেদের স্বার্থানুকূলভাবে পরিচালিত করা হয়।
এই নিয়ন্ত্রণের ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর ঋণের একটি অস্বাভাবিকভাবে বড় অংশ এস আলম গ্রুপ ও তাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে মোট ঋণের প্রায় ৫৬ শতাংশ গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বিতরণ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ে এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে যায়।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, বৃহত্তম অর্থ আত্মসাৎ ও আইটি ম্যানিপুলেশন:
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডকে কেন্দ্র করে আনা অভিযোগগুলো পরিমাণ ও কাঠামোর দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ। অভিযোগ অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর বিনিয়োগ কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম সংঘটিত হয়। ভুয়া বা অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ প্রস্তাব তৈরি, জাল কাগজপত্র ব্যবহার এবং ব্যাংকের আইটি সফটওয়্যার ‘টর্চ’-এ ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে অনুমোদন ছাড়াই ঋণসীমা বৃদ্ধি, মেয়াদ পরিবর্তন ও বিনিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়।
এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯ হাজার ২৮৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে, যা সুদ ও লভ্যাংশসহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৪৭৯ কোটি ৬২ লাখ টাকায়। পরিমাণের বিচারে এটি দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ দুর্নীতির মামলা হিসেবে চিহ্নিত। তদন্তে দেখা যায়, ২০২০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণসীমা ব্যাংকের মূলধনের ৩৫ শতাংশেরও বেশি বাড়ানো হয়, যা একক ঋণগ্রহীতার সীমা সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন।
আইটি বিভাগে সাবেক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নেতৃত্বে সফটওয়্যার ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে প্রায় ৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকা অনুমোদনবিহীনভাবে স্থানান্তর করা হয়। ১৩৪টি পৃথক লেনদেনের মাধ্যমে নামসর্বস্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অর্থ পাঠিয়ে পরে তা গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট শেল কোম্পানিতে সরিয়ে নেওয়া হয়। এর একটি অংশ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সিঙ্গাপুরের একটি অফশোর অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়, যা অর্থ পাচারের সুস্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
এই ঘটনায় দণ্ডবিধি, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের একাধিক ধারায় ৬৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে গ্রুপের চেয়ারম্যান, তাঁর স্ত্রী, ভাই, ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত।
জনতা ব্যাংক, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ জালিয়াতির কাঠামো:
জনতা ব্যাংককে ঘিরে অভিযোগগুলো সময়কাল ও কাঠামোর দিক থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন। এস আলম ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড, এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিল মিলস এবং এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেডের নামে বিভিন্ন সময়ে ঋণ নিয়ে মোট ৬ হাজার ২৪৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রথম মামলায় ২০০৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ভেজিটেবল অয়েল কোম্পানির নামে প্রায় ২ হাজার ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে, যেখানে প্রধান আসামি হিসেবে প্রতিষ্ঠানের পরিচালককে দেখানো হয়েছে এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ২৮ জন ব্যাংক কর্মকর্তা অভিযুক্ত। দ্বিতীয় মামলায় কোল্ড রোল্ড স্টিল মিলসের নামে ২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রায় ২ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। তৃতীয় মামলায় ট্রেডিং কোম্পানির নামে একই ধরনের পদ্ধতিতে প্রায় ১ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
এই ঋণগুলো পর্যাপ্ত জামানত ছাড়া, বিদ্যমান ঋণসীমা লঙ্ঘন করে এবং ব্যাংকিং নীতিমালা উপেক্ষা করে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে এসব অর্থ বিভিন্ন শেল কোম্পানিতে স্থানান্তর করে প্রকৃত ব্যবহার আড়াল করা হয়।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও অন্যান্য শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক:
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে একাধিক মামলা হয়েছে। এই ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে গ্রুপটির প্রভাবাধীন ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ পোর্টফোলিওতে অস্বাভাবিক ঝুঁকি জমা হয় এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকসহ মোট ছয়টি ব্যাংকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন ঋণ প্রদান সীমিত বা বন্ধ করার নির্দেশ দেয়, কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।
অর্থ পাচার, বিদেশে সম্পদ ও নাগরিকত্ব:
অভিযোগ অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপ ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করেছে। ওভার-ইনভয়েসিং, হুন্ডি এবং আইটি ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে এই অর্থ সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সাইপ্রাস ও অন্যান্য দেশে স্থানান্তর করা হয়। পাচারকৃত অর্থ দিয়ে বিদেশে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে এবং একাধিক কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। গ্রুপের চেয়ারম্যান ২০১৩ সালে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন।
আইনি পদক্ষেপ, সম্পদ জব্দ ও অর্থনৈতিক প্রভাব:
এই কেলেঙ্কারির প্রেক্ষিতে শতাধিক ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা, শেয়ার ও সম্পদ জব্দ এবং নিলাম প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার শেয়ার ও বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি জব্দের আদেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে একীভূত কয়েকটি ব্যাংকের শেয়ারের অভিহিত মূল্য শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে, যার ফলে মালিকানা কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এই ঘটনার সামষ্টিক প্রভাব হিসেবে ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট, তারল্য চাপ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এস আলম গ্রুপের ব্যাংকিং দুর্নীতি কেবল একটি করপোরেট অপরাধ নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক অর্থনীতির জটিল সম্পর্কের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ, যার পরিণতি বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন অনুভূত হবে।
আইনভিত্তিক বিশ্লেষণ, দণ্ডবিধি, ব্যাংক কোম্পানি আইন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন:
এস আলম গ্রুপকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগসমূহ বাংলাদেশের বিদ্যমান ফৌজদারি, আর্থিক ও নিয়ন্ত্রণমূলক আইনের একাধিক গুরুতর লঙ্ঘনের ইঙ্গিত দেয়। দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুযায়ী, সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তহবিলের ওপর বিশ্বস্ততার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের দ্বারা অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি ও প্রতারণা সংঘটিত হলে তা গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। অভিযোগে উল্লিখিত প্রতারণামূলক ঋণ অনুমোদন, জাল দলিল ব্যবহার, ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে লেনদেন এবং সংগঠিতভাবে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাগুলো দণ্ডবিধির বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা, জালিয়াতি ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত ধারার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর দৃষ্টিকোণ থেকে এই কেলেঙ্কারি আরও গভীর তাৎপর্য বহন করে। একক ঋণগ্রহীতার সীমা লঙ্ঘন, পর্যাপ্ত জামানত ছাড়া ঋণ বিতরণ, পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঋণ অনুমোদন এবং প্রক্সি শেয়ারের মাধ্যমে ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ—এসব কার্যক্রম ব্যাংক কোম্পানি আইনের মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার নীতির পরিপন্থী। বিশেষ করে ব্যাংকের মূলধনের একটি বড় অংশ একক গ্রুপের কাছে কেন্দ্রীভূত হওয়া আইনের মৌলিক কাঠামোকেই অকার্যকর করে তোলে।
মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর আওতায় অর্থ পাচারের অভিযোগগুলো আরও গুরুতর। ভুয়া বাণিজ্যিক লেনদেন, ওভার-ইনভয়েসিং, আইটি সিস্টেম ম্যানিপুলেশন এবং অফশোর অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বৈধ রূপ দেওয়ার চেষ্টা এই আইনের মূল অপরাধ কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ‘জেনে-বুঝে সহায়তা’ বা ‘উদ্দেশ্যমূলক অবহেলা’ প্রশ্নটি আইনি দায় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নীতিগত সংস্কার প্রস্তাব, নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর পুনর্গঠন:
এই কেলেঙ্কারি থেকে উদ্ভূত শিক্ষা হলো—শুধু আইন থাকা যথেষ্ট নয়; কার্যকর প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা অপরিহার্য। প্রথমত, ব্যাংকের শেয়ার মালিকানা ও প্রকৃত উপকারভোগী (Beneficial Ownership) প্রকাশের বাধ্যবাধকতা আরও কঠোর করতে হবে, যাতে প্রক্সি কোম্পানির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ না থাকে। দ্বিতীয়ত, একক ঋণগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের ঋণ সীমা বাস্তব সময়ে পর্যবেক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ের স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, ব্যাংকের আইটি অবকাঠামোকে আইনগতভাবে ‘ক্রিটিক্যাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ হিসেবে চিহ্নিত করে সফটওয়্যার পরিবর্তন ও অ্যাক্সেস নিয়ন্ত্রণে বহুপক্ষীয় অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা উচিত। চতুর্থত, ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস ও স্বাধীন পরিচালক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিশ্লেষণ, অর্থনীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা:
এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট কেলেঙ্কারির দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি কেবল অতীত ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা দুর্বল করে, যার ফলে ভবিষ্যতে ঋণ প্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এতে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে বিনিয়োগ ব্যাহত হয়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হতে পারে।
একই সঙ্গে বড় ব্যাংকগুলোর প্রতি আস্থাহীনতা আমানতকারীদের আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে, যা তারল্য ঝুঁকি বাড়ায়। যদি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো সংস্কার না হয়, তবে একই ধরনের গ্রুপভিত্তিক ঝুঁকি ভবিষ্যতেও পুনরাবৃত্ত হতে পারে। ফলে এই কেলেঙ্কারি বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্ক সংকেত—যেখানে আইন প্রয়োগ, নীতিগত সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা একসঙ্গে কার্যকর না হলে আর্থিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।

