ঋণের নামে জনতা ব্যাংকের ২ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, তার ভাই ও গ্রুপের চেয়ারম্যান সোহেল এফ রহমান এবং তাদের দুই ছেলেসহ মোট ৯৪ জনকে আসামি করে চারটি মামলার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
আজ বৃহস্পতিবার দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন মামলাগুলোর অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। সালমান এফ রহমান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি, শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান। তার ভাই সোহেল এফ রহমান গ্রুপটির চেয়ারম্যান। সালমানের ছেলে শায়ান ফজলুর রহমান এবং সোহেলের ছেলে আহমেদ শাহরিয়ার রহমানও গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বে রয়েছেন। দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে সুবিধা নেওয়ার জন্য বেক্সিমকো গ্রুপ ২৪টি কোম্পানি খুলে।
এর মধ্যে চারটি কোম্পানির নামে ঢাকায় জনতা ব্যাংকের লোকাল অফিস থেকে ঋণ ও ইডিএফ সুবিধা নিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে চারটি মামলা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর আগে জনতা ব্যাংকের ১ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে গত নভেম্বরে সালমান এফ রহমান ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা করেছিল দুদক।
দুদকের নথি অনুযায়ী, প্রথম মামলায় ইয়েলো অ্যাপারেলস লিমিটেডের নামে ৪৮ কোটি ৯ লাখ ৭৮ হাজার মার্কিন ডলার আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২১–২২ অর্থবছরের গড় বিনিময় হার অনুযায়ী, ডলারপ্রতি ৮৫ টাকা হিসাবে এ অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১৬ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
দ্বিতীয় মামলায় পিংক মেকার গার্মেন্টস লিমিটেডের নামে ৭৯ কোটি ৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। টাকায় এর পরিমাণ প্রায় ৬৭৫ কোটি ৩২ লাখ।
তৃতীয় মামলায় এ্যাপোলো অ্যাপারেলস লিমিটেডের নামে ৮৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৭১৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।
চতুর্থ মামলায় বে সিটি অ্যাপারেলস লিমিটেডের নামে সর্বাধিক ১২৩ কোটি ১ লাখ ডলার আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। টাকায় এর পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৪৭ কোটি।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার ও পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণা এবং জালিয়াতির মাধ্যমে জনতা ব্যাংকের লোকাল অফিস থেকে কয়েকটি নবসৃষ্ট ও অভিজ্ঞতাহীন পোশাক কারখানার নামে ইডিএফ ও বিবি এলসি সুবিধা অনুমোদন ও বিতরণ করা হয়। পরে এসব কোম্পানি নিজেদের মধ্যে ভুয়া আমদানি ও রপ্তানি দেখিয়ে অ্যাকোমোডেশন বিল তৈরি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা উত্তোলন ও আত্মসাৎ করে।
দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, আত্মসাত করা অর্থ নিজেদের মধ্যে হস্তান্তর, রূপান্তর ও স্তরায়নের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা দায়িত্বে থেকেও জেনেশুনে এসব অনিয়ম অনুমোদন করেন। এতে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ হয় এবং এর একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়।
ইয়েলো অ্যাপারেলস লিমিটেড:
ইয়েলো অ্যাপারেলস লিমিটেডের নামে ইডিএফ ও বিবি এলসি সুবিধা নিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আসামি করা হচ্ছে সালমান এফ রহমান, সোহেল এফ রহমান, সালমানের ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান এবং সোহেলের ছেলে আহমেদ শাহরিয়ার রহমানকে।
এ মামলায় আরও আসামি হচ্ছেন বেক্সিমকো লিমিটেডের পরিচালক ইকবাল আহমেদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওসমান কায়সার চৌধুরী, পরিচালক এ বি সিদ্দিকুর রহমান, মাসুদ ইকরামুল্লাহ খান, শাহ মঞ্জুরুল হক ও রীম এইচ শামসুদ্দোহা। ইয়েলো অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাকসুদুর রহমান এবং পরিচালক আইরিন আখতারও মামলার আসামি।
এ ছাড়া জনতা ব্যাংকের সাবেক সিইও আব্দুছ ছালাম আজাদ, সাবেক ডেপুটি এমডি আব্দুল জব্বার, সাবেক মহাব্যবস্থাপক মো. শহিদুল হক, সাবেক উপ-মহাব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান, সাবেক ডিজিএম মো. মমতাজুল ইসলাম ও মো. আব্দুর রহিম, সাবেক এজিএম মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, তৎকালীন ম্যানেজার মো. সালেহ আহমেদ এবং সিনিয়র অফিসার রফিকুল ইসলামকেও আসামি করা হয়েছে।
পিংক মেকার গার্মেন্টস লিমিটেড:
পিংক মেকার গার্মেন্টস লিমিটেডের নামে ঋণ ও ইডিএফ সুবিধা নিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের মামলায় আসামি করা হচ্ছে সালমান এফ রহমান, সোহেল এফ রহমান এবং তাদের দুই ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান ও আহমেদ শাহরিয়ার রহমানকে।
এ মামলায় বেক্সিমকো লিমিটেডের পরিচালক ইকবাল আহমেদ, ওসমান কায়সার চৌধুরী, এ বি সিদ্দিকুর রহমান, মাসুদ ইকরামুল্লাহ খান, শাহ মঞ্জুরুল হক ও রীম এইচ শামসুদ্দোহার নাম রয়েছে। পিংক মেকার গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুম্মান মোহাম্মদ ফাহীম খান এবং পরিচালক কাজী উম্মে কুলসুম মৈত্রীর নামও আসামির তালিকায় রয়েছে। এ ছাড়া জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান, মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, মো. আব্দুর রহিম, শ. ম. মাহাতাব হোসাইন বাদশা, মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, আবু নাঈম মাহমুদ সালেহিন এবং মোস্তাফিজুর রহমান তানভীরকে আসামি করা হয়েছে।
এ্যাপোলো অ্যাপারেলস লিমিটেড:
এ্যাপোলো অ্যাপারেলস লিমিটেডের নামে অর্থ আত্মসাতের মামলায় সালমান এফ রহমান, সোহেল এফ রহমান এবং তাদের দুই ছেলে আসামি হচ্ছেন। এ ছাড়া বেক্সিমকো লিমিটেডের পরিচালক ইকবাল আহমেদ, ওসমান কায়সার চৌধুরী, এ বি সিদ্দিকুর রহমান, মাসুদ ইকরামুল্লাহ খান, শাহ মঞ্জুরুল হক ও রীম এইচ শামসুদ্দোহার নাম রয়েছে। এ্যাপোলো অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ ফরিদুজ্জামান এবং পরিচালক কামরুন নাহার নাসিমাও এ মামলার আসামি। জনতা ব্যাংকের সাবেক সিইও আব্দুছ ছালাম আজাদ, সাবেক ডেপুটি এমডি ইসমাইল হোসেন, সাবেক মহাব্যবস্থাপক মো. শহিদুল হকসহ একাধিক কর্মকর্তা এ মামলায় এজাহারভুক্ত হয়েছেন।
বে সিটি অ্যাপারেলস লিমিটেড:
বে সিটি অ্যাপারেলস লিমিটেডের নামে সর্বাধিক অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের মামলায়ও সালমান এফ রহমান, সোহেল এফ রহমান এবং তাদের দুই ছেলেকে আসামি করা হয়েছে। বেক্সিমকো লিমিটেডের পরিচালক ইকবাল আহমেদ, ওসমান কায়সার চৌধুরী, এ বি সিদ্দিকুর রহমান, মাসুদ ইকরামুল্লাহ খান, শাহ মঞ্জুরুল হক ও রীম এইচ শামসুদ্দোহার নাম এ মামলাতেও রয়েছে। বে সিটি অ্যাপারেলসের পরিচালক হাসান মাহমুদ সানাউল হক ও নূসরাৎ হায়দারও আসামি। এ ছাড়া জনতা ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা মিলিয়ে আরও ১৬ জনকে এ মামলায় আসামি করা হয়েছে।

