মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা ও গণপিটুনি, সাংবাদিক নির্যাতন, সীমান্ত হত্যা ও নির্যাতন, বিচার-বহির্ভূত হত্যা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সংস্থার আজ বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধপরায়ণতা, সমাবেশকেন্দ্রিক সংঘর্ষ, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও দখলকে কেন্দ্র করে ৯১৪টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৩৩ জন নিহত এবং ৭ হাজার ৫১১ জন আহত হয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ৫৪টি নির্বাচনী সহিংসতায় ৩ জন নিহত ও ৪৯৪ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ২৯২টি মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় ১৬৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২৪৮ জন আহত হয়েছেন।
সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা আরও গুরুতর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ৩১৮টি হামলায় ৫৩৯ জন সাংবাদিক হত্যার, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩ জন নিহত, ২৭৩ জন আহত, ৫৭ জন লাঞ্ছিত, ৮৩ জন হুমকির মুখে পড়েছেন এবং ১৭ জন গ্রেফতার হয়েছেন। এছাড়া ৩৪টি মামলায় ১০৭ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর আওতায় ২৭টি মামলায় ২৪ জন গ্রেফতার এবং ৫৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ৪৭টি সভা-সমাবেশে বাধা, ১৪৪ ধারা জারি এবং সংঘর্ষে ৫১২ জন আহত ও ৩৬ জন গ্রেফতার হয়েছেন।
বিচার বহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থার উদ্বেগ রয়েছে। পুলিশি অভিযানে ৪০ জন নিহত হয়েছেন। পুলিশের ভয়ে পালাতে গিয়ে বা অসুস্থ হয়ে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া কারা হেফাজতে ৯২ জন (৩০ জন কয়েদী ও ৬২ জন হাজতি) অসুস্থতা, আত্মহত্যা ও নির্যাতনে মারা গেছেন।
নারী ও শিশু নির্যাতনও আশঙ্কাজনক। ২০২৫ সালে ২ হাজার ৪৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৮২৮ জন ধর্ষণের শিকার, যাদের মধ্যে ৪৭৪ জন শিশু। ১৭৯ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন, ধর্ষণের পর ২৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ১০ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়া ৪১৪ জন যৌন নিপীড়নের শিকার, ৩৫ জন যৌতুক নির্যাতনে নিহত এবং পারিবারিক সহিংসতায় ৩৮৩ জন মারা গেছেন। শিশু নির্যাতনের শিকার ১ হাজার ৩৭১ জন, যার মধ্যে ২৮৮ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছেন।
সীমান্তে সহিংসতাও ঘটেছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ৩০ জন নিহত, ২ জন পিটিয়ে হত্যা, ৩৯ জন আহত ও ৬৩ জন গ্রেফতার হয়েছেন। ৩৪৯৩ জনকে পুশইন করা হয়েছে এবং বঙ্গোপসাগর থেকে ১৪৩ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির গুলিতে ২ জন আহত, স্থলমাইন বিস্ফোরণে ১ জন নিহত ও ১২ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ২১টি ট্রলারসহ ১৭৬ জন জেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শ্রমিক নির্যাতনে ৯৬ জন নিহত এবং ১ হাজার ২১ জন আহত হয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ১৬৮ জন শ্রমিক মারা গেছেন।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেছেন, দেশে আইনের শাসন ও গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। মব সহিংসতা, হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাবে।
তিনি সরকারের প্রতি জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ করেছেন।

