বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা মব কালচারের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৭১ সালের জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা রক্ত দিয়ে দেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করেছে। তাদের এই অবদান জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে।
স্বৈরশাসনের পতনের পর সবাই আশা করেছিল শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ফিরে পড়াশোনায় মনোযোগী হবে কিন্তু বাস্তবে তেমন হয়নি। গত ১৬ মাসে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
মব সন্ত্রাস, মারামারি ও হানাহানিতে শিক্ষার পরিস্থিতি বেহাল। বিভিন্ন দাবিতে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনই আন্দোলন করছে। এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। পরীক্ষা না দিয়ে অটোপাসের জন্য সচিবালয় ঘেরাও করছে। শিক্ষককে অপসারণের জন্যও মব তৈরি হচ্ছে। সব মিলিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ এখন শূন্য।
গত বছরের ৫ আগস্টের পর শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি মবের শিকার হয়েছেন। তাদের অপমান ও অপদস্ত করে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা চলমান। মন্ত্রণালয় এ ধরনের কার্যকলাপ বন্ধ করার কথা বললেও এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষকের লাগাতার মর্যাদাহানির প্রভাব দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘকাল বিরাজ করবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, মবের রাজত্ব:
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মব সহিংসতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে ছয়জন ডিনকে দায়িত্ব থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। ২০২৩ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব নেওয়া ডিনদের মেয়াদ শেষ হয় ১৭ ডিসেম্বর। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন ডিন নির্বাচন সম্ভব না হওয়ায় ১১ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ১২টি অনুষদের ডিনের মেয়াদ বাড়ায়।
ছয়জন ডিনকে ‘আওয়ামীপন্থী শিক্ষক’ আখ্যা দিয়ে পদত্যাগের জন্য সময় বেঁধে দেন রাকসুর জিএস। শুধু সময় বেঁধে দিয়েই ক্ষান্ত হননি। ২১ ডিসেম্বর তিনি নিজে পদত্যাগপত্র লিখে ডিনদের ফোন করেন। এরপর একদল শিক্ষার্থী প্রশাসন ভবনের সব দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রবিবার সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠকে বসেন উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব। সেখানে ডিনরা লিখিতভাবে তাদের দায়িত্ব পালনে অপারগতা জানিয়ে পদত্যাগপত্র দেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা গত ১৬ মাসের মব সহিংসতার ধারাবাহিক অংশ। গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের লাঞ্ছনা ও জোরপূর্বক পদত্যাগের ঘটনা ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষকদের সুরক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নিজেদেরকে আইনকানুনের ঊর্ধ্বে মনে করছে।
চট্টগ্রাম ও অন্যান্য জায়গায় ঘটছে পুনরাবৃত্তি:
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারি হাজি তোবারক আলী উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কান্তি লাল আচার্যকে মব তৈরি করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতা প্রধান শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মবের মাধ্যমে শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে কলেজ, স্কুল ও প্রাথমিক বিদ্যালয় সর্বত্র ঘটছে। শিক্ষকরা মারধর ও মামলা থেকেও রেহাই পাননি। প্রথমে ছাত্রদের মাধ্যমে ঘটনা ঘটলেও পরে নানা রাজনৈতিক ও স্বার্থান্বেষীমহল সরাসরি যুক্ত হয়।
কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এখনও চাকরিতে থাকলেও ক্লাস নিতে পারেন না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ পর্যন্ত অন্তত দুই হাজার শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮০০ শিক্ষক আদালতে চাকরি ফিরে পেতে লড়াই করছেন। শুধু ঢাকাতেই দুই শতাধিক শিক্ষক পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। বেতনও পাননি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাবে না, তাদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া হতে পারে।
শিক্ষার্থী সংঘর্ষ ও অস্থিরতা:
২৬ অক্টোবর ঢাকার আশুলিয়া খাগান এলাকায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও সিটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে সংঘর্ষ হয়। পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, বাসে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে অন্তত দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ৭৮৩টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিরাজ করছে চরম বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা।

