মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত ‘লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন (লেইস)’ প্রকল্পে অর্থ আত্মসাত ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) মো. আসাদুজ্জামান (অ্যাডমিন অ্যান্ড ফাইন্যান্স) ও সহকারী প্রকল্প পরিচালক (এপিডি) বুলবুল আহমেদ।
লেইস প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং শিক্ষার হার বৃদ্ধি করা। কিন্তু প্রকল্পের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যদি দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তবে তা সরকারের স্বচ্ছতা নীতির পরিপন্থি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পের মধ্যে ৫ আগস্টের ঘটনা ডিপিডি ও এপিডির জীবন ঘুরিয়ে দিয়েছে। অভিযোগ অনুসারে তারা কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করেছেন। এই অর্থ রাজধানীতে নামে-বেনামে জায়গা, জমি ও ফ্ল্যাটে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
পুলিশি বা প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, ৫ আগস্টের পর আসাদ-বুলবুল সিন্ডিকেট সরকার বিরোধী রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সখ্য দেখিয়ে প্রকল্পে দাপট দেখাতে শুরু করে। অভিযোগ রয়েছে, তারা ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই করেন না। প্রকল্পের টেন্ডারগুলোও তাদের অবৈধ আয়ের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষার বিভিন্ন দপ্তর ও টিটিসির জন্য ল্যাপটপ, কম্পিউটার কেনায় প্রায় ৪২ কোটি টাকা, এসি কেনায় দেড় কোটি টাকা, ফটোকপি, রাউটার, এক্সেস কন্ট্রোল কেনায় আড়াই কোটি টাকা, ফার্নিচার ৫০ লাখ টাকা এবং সফটওয়্যার ২০ লাখ টাকার টেন্ডারে ৫–১০ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে কাজ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আসাদ দীর্ঘদিন ধরে এসইডিপি প্রজেক্টে ছিলেন। তার দীর্ঘ স্থায়িত্বের পেছনে ছিল উত্তরবঙ্গের এক মন্ত্রীর প্রভাব। আসাদ নিজেকে আওয়ামী লীগের সন্তান হিসেবে পরিচয় করতেন। বুলবুলও ১৫ বছর ধরে শিক্ষা ভবনে আওয়ামী লীগের প্রভাব দেখিয়ে চাকরি করেছে।
অফিস সরঞ্জাম ক্রয়, প্রশিক্ষণ ভাতা প্রদান এবং বিভিন্ন ইভেন্ট আয়োজনের মাধ্যমে তারা ব্যক্তিগত সম্পদ গড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি বুলবুলের একটি ফ্ল্যাট কেনার খবর ফাঁস হওয়ার পর প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি বেতন ও সুবিধার সঙ্গে মিলিয়ে এত বড় ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব নয়। বুলবুল বর্তমানে রাজধানীর রামপুরার বনশ্রীতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ফ্ল্যাট ক্রয় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তের দাবি রাখে। দুদক যদি তাদের সম্পদের উৎস এবং প্রকল্পের আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখে, আরও বড় ধরনের অনিয়ম প্রকাশ পেতে পারে।
প্রকল্পে আসাদ-বুলবুলের সিন্ডিকেট এত শক্তিশালী যে, প্রকল্প পরিচালকসহ কেউ তাদের ভয়ে মুখ খুলতে চায় না। সাবেক সরকারের আমলে পদায়নকৃত হওয়ায় অন্য কর্মকর্তারা বদলির ভয় দেখিয়ে তাদের অবৈধ কাজের সুযোগ দিয়ে যাচ্ছেন।
ডিপিডি আসাদ ও এপিডি বুলবুলের শাসনের হাতেখড়ি শুরু হয় সাবেক ডিপিডি বিজয় কুমার ঘোষের রেখে যাওয়া অসম্পূর্ণ আউটসোর্সিং দরপত্র থেকে। আটটি পদের মধ্যে পাঁচটিতে তারা নিজেদের লোক নিয়োগ দিয়েছেন। প্রত্যেক নিয়োগের জন্য পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। টেন্ডার দেওয়াও মূলত তাদের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
প্রকল্পের এক কর্মকর্তা জানান, বুলবুল গর্ব করে বলেন, ‘আমি বিশ্বব্যাংকের এজেন্ট। আমার থেকে পিপিআর এই শিক্ষা ভবনে কেউ বোঝে না। আমি যাকে নেগেটিভ করব, তাকে আর কেউ পজিটিভ করতে পারবে না। আমি না থাকলে এই প্রজেক্ট চলবে না।’
অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সাবেক ছাত্রদল ও বিএনপির নেতারা কোনো প্রতিকার পাননি। প্রকল্পের বড় টেন্ডার থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ ব্যাগ কেনা, আরএফকিউ পর্যন্ত সব ক্রয় আসাদ-বুলবুলের নিয়ন্ত্রণে। প্রশিক্ষণার্থীদের স্বাক্ষরের মাধ্যমে ব্যাগের টাকা উত্তোলন হলেও প্রকৃত ব্যাগ সরবরাহ হয় ঢাকা থেকে।
এই অভিযোগের বিষয়ে বুলবুল আহমেদ বলেন, তিনি লেইস প্রকল্পের কেনাকাটায় কোনো অবৈধ সুবিধা পাননি। বৈধ টাকায়ও কোনো ফ্ল্যাট বা জমি কিনতে পারেননি। আসাদুজ্জামান জানান, তিনি একা কোনো কেনাকাটা অনুমোদন দেন না। সব কাজ বিশ্বব্যাংকের তত্ত্বাবধানে হয়। অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

