দেশে গুম ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এটি কোনও উদ্দীপিত ব্যক্তি বা কর্মকর্তা একার কাজও নয়। জোরপূর্বক নিখোঁজ রাখা, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় সেনা ও নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে পরিকল্পিত, সমন্বিত এবং দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রাখা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কাজ করেছে। গুমসংক্রান্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
কমিশনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই অপরাধের দায় শুধু মাঠ পর্যায়ের সেনাসদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং অপারেশনাল ইউনিট, মধ্যম পর্যায়ের কমান্ড, গোয়েন্দা নেতৃত্ব এবং সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্মকর্তারা—সবার ওপর এই দায়িত্ব বর্তেছে।
গত ৪ জানুয়ারি গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গুমের প্রথম ধাপ ছিল চোখ বেঁধে তুলে নেওয়া, অজ্ঞাত স্থানে নেওয়া এবং আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তার দেখানো ছাড়াই আটক রাখা। এই কাজগুলো মাঠ পর্যায়ের সেনা ও নিরাপত্তা সদস্যরাই বাস্তবায়ন করেছেন।
মাঠ পর্যায়ের এই সদস্যরা সরাসরি অপরাধে যুক্ত ছিলেন। তারা জানতেন যে গ্রেপ্তারের কোনো আইনি কাগজ নেই, আটক ব্যক্তির অবস্থান গোপন রাখা হচ্ছে, এবং পরিবার ও আদালতও অন্ধকারে। এ কারণে কমিশন মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের দায় প্রাথমিক ও প্রত্যক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কমিশন বলছে, গুমের অপরাধ কেবল মাঠ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। ইউনিট কমান্ডার ও মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তারা আটক সেল সম্পর্কে জানতেন। তারা নিয়মিত রোল কল ও প্রস্তুতির নির্দেশ দিতেন। পরিদর্শনের সময় আটক ব্যক্তিদের সেলও দেখতেন। সৈনিকদের সাক্ষ্যে এসেছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঈদের দিনও আটক সেল পরিদর্শনে গিয়েছেন। কমিশনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই স্তরের কর্মকর্তারা শুধু বিষয়টি জানতেন না, বরং অননুমোদিত আটক রাখার কার্যক্রম চলমান রাখতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাই তাদের দায় ছিল ইচ্ছাকৃত সহায়তা ও অনুমোদনের।
কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিভিন্ন ইউনিটে চোখ বাঁধার ধরন, আটক রাখার পরিবেশ, জিজ্ঞাসাবাদের কৌশল এবং মুক্তির পর মামলা দেওয়ার ধারা প্রায় একই রকম ছিল। এক ইউনিট থেকে আরেক ইউনিটে আটক ব্যক্তিদের হস্তান্তরও পদ্ধতিগতভাবে সমন্বিত ছিল। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছে, ডিজিএফআই এবং র্যাবের আলাদা সরঞ্জাম ও ভিন্ন ব্যবস্থাপনা ছিল। এই ধরনের সমন্বয় পরিকল্পনা ছাড়া সম্ভব নয়। তাই গোয়েন্দা ও বিশেষ ইউনিটগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক দায় স্পষ্ট।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাওয়ার সময় সেনা কর্মকর্তাদের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অজুহাত ছিল“তারা জানতেন না।” কমিশন এই দাবি তিনটি কারণে বাতিল করেছে। আটক রাখার সেলগুলো ছিল কমান্ডিং অফিসারের অফিসের কাছেই। একই ভবন, সিঁড়ি ও লিফট ব্যবহার করে এবং অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি দৃষ্টিসীমার মধ্যে ছিল। শব্দরোধী ব্যবস্থা না থাকায় নির্যাতনের শব্দও শোনা যেত। এমন অবস্থায় অজ্ঞতার দাবি বাস্তবতাবিরোধী।
অনুসন্ধানে কমিশনের সামনে ডিজিএফআইয়ের সাবেক ডিজি লেফটেন্যান্ট জেনারেল আকবর স্বীকার করেছেন, হুম্মাম কাদেরের গুম নিয়ে তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করেছেন। সিটিআইবি ও র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, আটকদের বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা হতো। এছাড়া জেআইসি ও টিএফআই পরিদর্শন করা হয়েছে, যা সর্বোচ্চ সেনা নেতৃত্বের অবগত থাকার প্রমাণ দেয়।
কমিশন উল্লেখ করেছে, গুম একটি চলমান অপরাধ। একজন ব্যক্তিকে অবৈধভাবে আটক রাখা এবং তার অবস্থান গোপন রাখার যতক্ষণ থাকে, অপরাধ ততক্ষণ চলতে থাকে। এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় ব্রিগেডিয়ার আজমি গুমের ঘটনায়। সেনাবাহিনীর নিজস্ব কোর্ট অব ইনকোয়ারির রিপোর্টে বলা হয়েছে, শুধু প্রাথমিক অনুমোদনদাতার নয়, পরবর্তী ডিরেক্টর জেনারেলরাও দায়ী। কারণ, তারা অননুমোদিত আটকের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।
কমিশন বলছে, গুমকে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ বা ‘সন্ত্রাস দমন’-এর অজুহাতে বৈধ দেখানোর চেষ্টা হয়েছিল। তবে কমিশন এটি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে, জরুরি অবস্থা বা যুদ্ধকালেও জোরপূর্বক নিখোঁজ রাখা বৈধ নয়। তথ্য অনুযায়ী, গুমের শিকারদের বড় অংশ ছিলেন রাজনৈতিক বিরোধী বা সমালোচক। তাই এটি নিরাপত্তার কাজ নয়, বরং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের ঘটনায় সেনা আইনের আওতায় বিচার চাওয়া হয়েছে, যা বাস্তবে দায় এড়ানোর কৌশল। সেনা আইনে গুম অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত নয় এবং কমান্ড দায়ের সুস্পষ্ট বিধান নেই। ব্রিগেডিয়ার আজমির ঘটনায় কোর্ট অব ইনকোয়ারির সুপারিশও বাস্তবায়িত হয়নি। র্যাব ও ইলিয়াস আলী গুম তদন্ত বোর্ডের বিপুল প্রমাণ ‘অনুপলব্ধ’ হয়ে গেছে। এটি প্রাতিষ্ঠানিক বাধা এবং দায় আড়াল করার নজির তৈরি করেছে।
কমিশনের সামগ্রিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, দেশে গুমের ঘটনা ছিল ইচ্ছাকৃত, পরিকল্পিত এবং সেনা-নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। এতে মাঠ পর্যায়ের সেনাসদস্য, ইউনিট, মধ্যম পর্যায়ের কমান্ডার, গোয়েন্দা ও বিশেষ ইউনিটের নেতৃত্ব এবং সর্বোচ্চ সেনা কমান্ড—সবার দায় রয়েছে। সরাসরি জড়িত বা নীরবতার মাধ্যমে—সব স্তরই এই অপরাধ সম্ভব করেছে।

