বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্য ও বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয় বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি। কথিত নির্যাতন ও বঞ্চনার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশের সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় দক্ষ ও মেধাবী ৫৭ সেনা কর্মকর্তা সহ ৭৪ জনকে।
অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর। মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ১৬ বছর পর কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ৪০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বহু অজানা ও স্পর্শকাতর তথ্য উঠে এসেছে, যা এতদিন পর্দার আড়ালে ছিল।
তদন্তে দেখা গেছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক এমপি ও সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসসহ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা, সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ, র্যাব, বিডিআর, এমনকি তৎকালীন মিডিয়ার কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। মোট প্রভাবশালী অর্ধশতাধিক ব্যক্তি তদন্তে চিহ্নিত হয়েছেন।
ঘাতকরা ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা দাবির জায়গা থেকে নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে পৈশাচিক উন্মত্ততায় মেতে ওঠে। তাদের নীলনকশা বাস্তবায়নের জন্য সাধারণ বিডিআর সদস্যদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়। বিডিআরের মহাপরিচালক থেকে শুরু করে একে একে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। শুধু সেনা অফিসাররাই নয়, তাদের পরিবারের অনেক সদস্যও নিহত হন। নারী ও শিশুর ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। অফিসারদের বাসায় লুট হয় অর্থ ও স্বর্ণালংকার। বিডিআর সদর দপ্তরের ২৫৩ একর জায়গার মনোরম পরিবেশ তখন মৃত্যুর বৃত্তে পরিণত হয়। তিনটি গণকবর খুঁড়ে লাশ গুম করা হয়।
ঘটনাস্থলে ৩৪ ঘণ্টা শ্বাসরুদ্ধকর নারকীয় তাণ্ডব চলে। ওই সময় রাজনৈতিক সমঝোতার নামে ঘটনা ঠেকানোর চেষ্টা করে আওয়ামী লীগ সরকার। অনভিজ্ঞ কয়েকজন দলীয় নেতাকে সরকারী প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হয়, যারা ঘাতকদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেন।
সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার:
দীর্ঘদিন ধরেই দেশ-বিদেশের স্বার্থান্বেষী কিছু মহল সুপরিকল্পিতভাবে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের হার্ভার্ড ইন্টারন্যাশনাল রিভিউতে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বাংলাদেশে ইসলামী উগ্রবাদের বিস্তারে সামরিক বাহিনীর ভূমিকার বিষয়ে দাবি করা হয়।
নিবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশে ইসলামী উগ্রবাদের উত্থান-দমন’, যা যৌথভাবে লেখা হয় মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা কার্ল জে সিওভাস্ত এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী শেখ হাসিনা পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের দ্বারা। ২০০৮ সালের ১৯ নভেম্বর প্রকাশিত নিবন্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দু’বছরের সময়কে সামরিক শাসনকাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। লেখা হয়, সামরিক বাহিনীতে ইসলামপন্থিদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ইসলামি জঙ্গিবাদ বিস্তার লাভ করছে। সেনাবাহিনীতে ঢোকার ভর্তি পরীক্ষায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে মাদরাসায়। নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক ও বিএনপি সরকারের আমলে গড়ে ওঠা এই ইসলামি জঙ্গিবাদ প্রতিহত করতে নির্বাচনের আগে ও পরে আওয়ামী লীগকে লড়াই করতে হবে।
প্রারম্ভে সজীব ওয়াজেদ জয়ের পরিচয় দেওয়া হয় শেখ হাসিনার উপদেষ্টা হিসেবে। তবে নিবন্ধটি সেনাবাহিনীর সদস্যদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আঘাত করেছে। এ নিবন্ধের সমালোচনা করে প্রখ্যাত কলামিস্ট ফরহাদ মজহার ২০০৮ সালের ২৫ নভেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্তে লেখেন, “বাংলাদেশের জনগণ ইসলামের দোষে দূষিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ও কার্ল সিওভাস্তো এই দোষ থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করার থিসিস দিয়েছেন। তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরিকল্পনা বটে।” তিনি আরও বলেন, “সেনাবাহিনীকে বিশেষভাবে টার্গেট করা ও আওয়ামী লীগকে জিতিয়ে সেনা পুনর্গঠনের পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত।”
সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অন্য একটি উদাহরণ ঘটেছে ২০০৮ সালের ২৬ আগস্ট। যুক্তরাজ্যে স্বেচ্ছা নির্বাসিত বিতর্কিত লেখক আব্দুল গাফফার চৌধুরী নিউ ইয়র্কে উদীচী যুক্তরাষ্ট্র শাখার সম্মেলনে সেনাবাহিনী সম্পর্কে অশালীন ও আপত্তিকর মন্তব্য করেন। তিনি সেনাবাহিনীকে দায়ী করেন প্রতিটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও বিশৃঙ্খলার জন্য এবং দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে। চৌধুরী সেনাবাহিনীকে পিতৃপরিচয়হীন, ভাড়াটিয়া ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে অভিহিত করেন।
পিলখানা হত্যাযজ্ঞের বেনিফিশিয়ারি ও উদ্দেশ্য
বিডিআর জওয়ানরা তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু দাবি আদায়ের জন্য এমন নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, লুটতরাজ ও সেনা পরিবারের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাতে পারে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। এমন হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা।
বিডিআর সদস্যদের কিছু দাবিদাওয়া সামনে এনে তাদের একটি অংশকে ক্ষিপ্ত করা হয়। বিদ্রোহের আড়ালে সেই অংশকে কৌশলে নৃশংসতার কাজে ব্যবহার করা হয়। পরিকল্পিত কিলিং মিশন নির্বিঘ্নে কাজ করে, তারপর নিরাপদে পিলখানা ত্যাগ করা হয়।
ঘটনাটি নিয়েও জাতীয় সংসদে তীব্র বিতর্ক হয়। প্রধানমন্ত্রীও তদন্তের আগে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের দিকে সন্দেহের তীর ছুঁড়ে দেন। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এই হত্যাযজ্ঞের মূল বেনিফিশিয়ারিরা কারা।
কেউ যে তখন সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করতে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে দেশ-বিদেশে অপপ্রচার চালাচ্ছিল, কেউ সেনানিবাসকে ছোটখাটো প্রহসনের মাধ্যমে হুমকি দিচ্ছিল জুনিয়র অফিসারদের প্রতি—এই প্রক্রিয়াগুলো স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে, হত্যাকারীদের উদ্দেশ্য ও সুবিধাভোগীদের পরিচয়।
সমঝোতা ও সাধারণ ক্ষমা: পিলখানার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত
বিডিআর বিদ্রোহ দমনে প্রয়োজনীয় সেনা প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন সময়ে সেনাবাহিনীকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। তাৎক্ষণিক সেনা অভিযান অনুমোদন দেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক সমঝোতার কথা বলে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহ দীর্ঘায়িত করা হয়। সহযোগিতা করতে ইচ্ছুক বিরোধী দলকেও জাতীয় সংকটে ডাকা হয়নি। উল্টো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তাদের তিরস্কার করেন।
এই সবকিছু সরকারের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ঘটনাটি পরিকল্পিত ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে দায়ভার এড়ানোর চেষ্টা করা হয়। নিহত সেনা অফিসারদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে প্রধানমন্ত্রী সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। সেনা সদরের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রীর এই ভুল সিদ্ধান্তের কারণে মেধাবী অফিসারদের প্রাণ হারাতে হয়।
সেনা বিদ্রোহকে রাজনৈতিকভাবে দমন করার পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর কাছে কে দিয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বিদ্রোহ শুরু হওয়ার মুহূর্তে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছিলেন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল। সেনাবাহিনী পাঠানোর কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা শেখ রেহানার দেবর মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং রাজনৈতিক উপদেষ্টা ড. আলাউদ্দিনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের সম্পর্কে।
বিদ্রোহ সরকারের বিরুদ্ধে নয়, এটি বিডিআর জওয়ানদের পক্ষ থেকে—এ নিশ্চিত হওয়ার পরই সরকার রাজনৈতিক সমঝোতার পন্থা বেছে নেন। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করে এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং হুইপ মির্জা আজমকে পাঠানো হয় পিলখানায় সমঝোতার জন্য। তারা ১৪ জন বিদ্রোহীকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন যমুনায় বৈঠকে যান। বিকালে দুই ঘণ্টা বৈঠক হয়।
তবে সেনা অফিসারদের অবস্থান জানার আগে প্রধানমন্ত্রী সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে অস্ত্র সমর্পণের নির্দেশ দেন। বৈঠকের পরও বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণ না করে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যায়। বৈঠকের আগে ১৪ জন বিদ্রোহীর নামও এন্ট্রি করা হয়নি, তাদের দেহও তল্লাশি করা হয়নি। বৈঠকে সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর প্রধানসহ কোনো পদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাকে অনুমতি দেওয়া হয়নি।
প্রশ্ন ওঠে, ১৪ জন বিদ্রোহী কীভাবে নির্বাচিত হলো এবং কীভাবে এত বড় হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপদে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আবার পিলখানায় ফিরে গেল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাতের আঁধারে বুলেটপ্রুফ গাড়ি নিয়ে পিলখানায় প্রবেশ করেন, অথচ সেনা অফিসারদের খবর নেননি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—৩৪ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির পর কারা পিলখানার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে ১০ হাজার বিডিআর সিপাহিকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিল? সরকারি আদেশ ছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য ফজলে নূর তাপস কেন মাইকিং করে পিলখানার তিন কিলোমিটার এলাকা থেকে স্থানীয়দের সরিয়ে দিতে বললেন? এলাকা খালি হওয়ার সুযোগেই অস্ত্রসহ বিদ্রোহীরা পালিয়ে যায়। হত্যাকাণ্ডের দুদিন পর বিমানবন্দর দিয়ে তারা কীভাবে বিদেশে পাড়ি জমাল, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।
গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা ও অজানা প্রশ্ন
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ ঘটনা আগেভাগে আঁচ করতে না পারা দেশের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বড় ধরনের ব্যর্থতা বলে মনে করা হচ্ছে। এমন একটি স্পর্শকাতর ঘটনার আগে কোনো কার্যকর সতর্কতা ছিল না।
ঘটনার প্রেক্ষাপটে সেনা সদরে প্রধানমন্ত্রীকে একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। প্রশ্ন ওঠে, বিডিআর সদর দপ্তরে ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজে অংশ নেওয়ার কর্মসূচি ২২ ফেব্রুয়ারি কারা এবং কেন বাতিল করেছিল। একই সঙ্গে আলোচনায় আসে, ঘটনার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে সুধা সদন থেকে নিরাপত্তার অজুহাতে তড়িঘড়ি করে প্রধানমন্ত্রীকে যমুনায় ওঠার পরামর্শ দেওয়ার কারণ।
হত্যাকাণ্ডের পর এ ঘটনায় পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি কাজ করে। তবে অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক অভিসন্ধি থেকে স্মরণকালের এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের নায়কদের আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ১৬ বছর পরে হলেও জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। দেশবাসীর প্রত্যাশা, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। উন্মোচিত হবে ষড়যন্ত্রকারী ও নীলনকশাকারীদের মুখোশ।
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক এবং জনগণের শেষ ভরসাস্থল সেনাবাহিনীকে নিয়ে বিতর্ক নয়, বরং মূল ঘাতকদের সর্বোচ্চ শাস্তিই চায় দেশবাসী।

