কাঁটাতারের বেড়া সাধারণত সীমান্ত চিহ্নিত করে কিন্তু ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি সেই কাঁটাতার চিহ্নিত করেছিল সভ্যতার সীমা। ১৫ বছরের এক কিশোরীর দেহ ঝুলছিল সেখানে।
রাষ্ট্রের বন্দুকের সামনে নিথর শরীরটি পাঁচ ঘণ্টা ধরে ঝুলে থাকল। কেউ নামাল না, ঢেকে দিল না। যেন এটি কোনো লাশ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় বার্তা। ছবি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে, কিন্তু কোনো ক্যাপশন ছিল না। বিচারও হয়নি। ফেলানী খাতুন কোনো একক হত্যাকাণ্ডের নাম নয়। তিনি সীমান্তে মানবাধিকারের লঙ্ঘনের প্রতীক। দুই রাষ্ট্রের সম্পর্কের নৈতিক মানদণ্ড মাপার এক নির্মম পরীক্ষা।
ঢাকার কূটনৈতিক এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘ফেলানী এভিনিউ’ নামকরণ করা হয়। এটি নিছক স্মরণ নয়। এটি রাষ্ট্রের নীরব স্বীকারোক্তি—যেন বলছে, এই ক্ষত ঢাকা যায় না।
সেই ভোরে ফেলানী বাবার হাতে ধরে দেশে ফিরছিল। ভারতের আসাম রাজ্যের কুচবিহার থেকে বিয়ের প্রস্তুতির জন্য মেয়েকে নিয়ে ফেরার পথে তারা আনন্তপুর-দিনহাটা সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার চেষ্টা করছিল।
কোনো অস্ত্র ছিল না, কোনো হুমকি ছিল না। শুধু ভয় আর তাড়াহুড়া। মই বেয়ে ওঠার সময় ফেলানীর কাপড় আটকে যায়। সে চিৎকার করলে মানবিক সাড়া আসে না। এসেছে গুলি। একটিমাত্র গুলি শেষ করে দেয় ফেলানীর জীবন।

গুলিটি ছোড়া হয়েছিল ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সদস্য অমিয়া ঘোষের অস্ত্র থেকে। মৃত্যুর পরও ফেলানীর প্রতি ন্যূনতম মানবিকতা দেখানো হয়নি। তার দেহ ঝুলে থাকল সীমান্তের কাঁটাতারে। যেন এটি কোনো মানুষের নয়, বরং ভয় দেখানোর উপকরণ।
ফেলানী হত্যার পর শুরু হয় বিচার নামের দীর্ঘ নাটক। ২০১৩ সালে বিএসএফের অভ্যন্তরীণ আদালত অভিযুক্ত অমিয়া ঘোষকে খালাস দেয়। আন্তর্জাতিক জনমত ও মানবাধিকার সংস্থার চাপে পুনর্বিচারের নির্দেশ আসে কিন্তু বাস্তবে কোনো অগ্রগতি হয়নি। কলকাতা হাইকোর্ট ও ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মামলা এখনও ঝুলে আছে। ন্যায়বিচার কূটনৈতিক অস্বস্তির বিষয় হয়ে গেছে।
ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। বাস্তবায়ন হয়নি। বরং নিহত কিশোরীর পরিবারকে দোষারোপ করা হয়েছে। সীমান্ত পার হওয়ার দায় চাপানো হয়েছে শিশুটির ওপর। ১৫ বছর পেরিয়ে গেছে। হত্যার দায়ে কাউকে দণ্ডিত করা হয়নি। রাষ্ট্রীয় বন্দুকের সামনে শিশু মারা গেলে তা প্রশাসনিক ভুলে পরিণত হয়—ফেলানী তার নির্মম উদাহরণ।
সময় পেরলেও ফেলানীর পরিবারের চোখের পানি শুকায়নি। বাবার চোখের সামনে মেয়েকে হত্যা করা হয়েছিল। সেই দৃশ্য আজও নুরুল ইসলামের ঘুম কেড়ে নেয়। মা জাহানারা আজও প্রশ্ন করেন—আইন থাকলেও কাউকে হত্যা করার অধিকার কারো নেই। উত্তর কেউ দেয়নি। কূটনীতির ভাষায় হয়তো নীরবতা।
এই শোক থেকে জন্ম নেয় ব্যতিক্রমী প্রতিজ্ঞা। ফেলানীর ছোট ভাই আরফান হোসেন সীমান্তে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। যেন আর কোনো কিশোরী এমনভাবে ঝুলে না থাকে। তিনি বিজিবির নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেন, উত্তীর্ণ হয়ে যোগ্যতায় যোগ দেন।
এটি শুধু চাকরি নয়। এটি এক নীরব প্রতিরোধ। সীমান্তে মানবিকতার জীবন্ত ঘোষণা। হত্যার পর থেকেই ফেলানীর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে বিজিবি। দাফন, জীবিকা সহায়তা, নিয়মিত খোঁজখবর, পারিবারিক যোগাযোগ—সবকিছুতে পাশে থেকেছে। আরফানের স্বপ্ন বাস্তবায়নেও তারা সহায়তা করেছে। সীমান্ত রক্ষার পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়ানো বিজিবিকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে। যেখানে বন্দুক কথা বলেছিল, সেখানে বিজিবি নীরবে মানুষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ফেলানীকে স্মরণ করার সবচেয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ এসেছে ফেলানী এভিনিউ নামকরণের মাধ্যমে। গুলশান-২ থেকে প্রগতি সরণি পর্যন্ত এই সড়ক শুধু রাজধানীর ব্যস্ত পথ নয়। এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা নীরব প্রশ্ন—কেন হত্যার বিচার হয়নি?
আজও দাবিগুলো একই—হত্যার বিচার চাই, সীমান্তে নিরস্ত্র মানুষ হত্যা বন্ধের নীতি চাই, ক্ষতিপূরণ বাস্তবায়ন চাই। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিসরে মামলা আরও দৃঢ়ভাবে তুলতে হবে। ফেলানী আজ একটি নামের চেয়েও বেশি। তিনি অসমাপ্ত ন্যায়বিচারের প্রতীক।
কাঁটাতারে ঝুলে থাকা দেহ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যতদিন বিচার হবে না, ক্ষত শুকাবে না। ফেলানী এভিনিউ তখনই সত্যিকার অর্থে ন্যায়বিচারের সড়ক হবে, যেদিন সীমান্তে আর কোনো দেহ ঝুলবে না।

