২০২৪ সালে ইউরোপে কাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন নরসিংদীর হাবিব খান নাসির। সে স্বপ্ন পূরণে ‘আর কনসালট্যান্সি এয়ার অ্যান্ড ওয়েভ প্রাইভেট লিমিটেড’ নামের একটি এজেন্সির সঙ্গে তিনি ১৮ লাখ টাকার লিখিত চুক্তি করেন। প্রতিশ্রুতি ছিল ইউরোপের দেশ উত্তর মেসিডোনিয়া ও আলবেনিয়ার শ্রম ভিসা দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। গত বছরের জুনে আলবেনিয়ার দুটি শ্রম ভিসা হাতে পেয়ে তিনি নরসিংদীর জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে যান। সেখানে যাচাইয়ে জানা যায় ভিসাগুলো ভুয়া। ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যায় মুহূর্তেই। ১৮ লাখ টাকা হারিয়ে আজ নিঃস্ব নাসির। তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা প্রতিবেদন।
নাসির একা নন। এমন প্রতারণার শিকার অভিবাসন প্রত্যাশীর সংখ্যা এখন হাজার ছাড়িয়েছে। কেউ বিদেশে গিয়ে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ পাননি। কেউ কাজ পেলেও বেতন পাননি। আবার অনেকেই ইকামা না পেয়ে অবৈধ হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। দিন দিন বাড়ছে এমন ভুক্তভোগীর সংখ্যা।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট শাখার তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে প্রবাসীদের ৪ হাজার ৭০৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ২ হাজার ৫৪টি। হার মাত্র ৪৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। বাকি ৫৬ দশমিক ৩২ শতাংশ অভিযোগ বছর শেষে অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। নিষ্পন্ন অভিযোগের বিপরীতে আদায় হয়েছে মোট ৯ কোটি ৯২ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।
অভিবাসন খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগ নিষ্পত্তির ধীরগতি দালাল ও অসাধু এজেন্সিগুলোকে আরও বেপরোয়া করছে। বিএমইটিতে স্থায়ী লিগ্যাল সেল নেই। দক্ষ লোকবল ও আইনজীবীরও ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেক সময় দুই পক্ষের সমঝোতার পথে যেতে হয়। এতে লাভবান হয় এজেন্সিগুলো। এই প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীরা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হন। অভিযোগ সেল শক্তিশালী না হলে প্রতারিত কর্মীদের ন্যায়বিচার পাওয়া আরও কঠিন হবে বলে মনে করেন তারা।
বিএমইটির অভিযোগের মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণেও ধীরগতির চিত্র স্পষ্ট। গত বছরের জানুয়ারিতে জমা পড়ে ৫৮২টি অভিযোগ। নিষ্পত্তি হয় মাত্র ৬০টি। ফেব্রুয়ারিতে অভিযোগ বেড়ে দাঁড়ায় ৬০৯টিতে। নিষ্পত্তি হয় ২০৭টি। মার্চে ৩৩২টি অভিযোগের বিপরীতে নিষ্পত্তি ৭৩টি। এপ্রিলে ২৭৭টির বিপরীতে ৯৩টি। মে মাসে ৩৮৭টি অভিযোগের মধ্যে ২০৮টি নিষ্পত্তি হয়। জুনে ২১৮টির বিপরীতে নিষ্পত্তি হয় ১৬১টি।
বছরের দ্বিতীয়ার্ধে জুলাইয়ে ৪২৩টি ও আগস্টে ৪৫২টি অভিযোগ জমা পড়ে। জুলাইয়ে নিষ্পত্তি হয় ১৭৬টি। আগস্টে সর্বোচ্চ ২৯০টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়। সেপ্টেম্বরে ৪৩১টি অভিযোগের বিপরীতে নিষ্পত্তি হয় ১৭২টি। অক্টোবরে ৩৫৬টির বিপরীতে ১৭৪টি। নভেম্বরে ৩৪৫টির বিপরীতে নিষ্পত্তি হয় ২০৭টি। বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে ২৯১টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে ২৩৩টি নিষ্পত্তি হয়। তবুও হাজার হাজার প্রবাসী শ্রমিক এখনো তাদের পাওনা টাকার আশায় দিন গুনছেন।
প্রতারণার শিকার হাবিব খান নাসির বলেন, ভুয়া ভিসার বিষয়টি জানার পর তিনি সংশ্লিষ্ট এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। শুরুতে তারা ভুয়া ভিসার কথা অস্বীকার করে। পরে অন্য দেশের ভিসা বা টাকা ফেরতের আশ্বাস দেয়। কিন্তু আজ নয় কাল বলে মাসের পর মাস সময়ক্ষেপণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তিনি বিএমইটিতে লিখিত অভিযোগ দেন। এখনো সেই অভিযোগের শুনানি চলছে। কোনো সমাধান হয়নি।
বিএমইটি সূত্র জানায়, অভিযোগ নিষ্পত্তিকে আরও শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করতে প্রথমবারের মতো অভিযোগ ব্যবস্থাপনা বিধিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এতদিন নির্দিষ্ট কোনো বিধিমালা ছিল না। অফিস আদেশ ও নির্দেশিকার ভিত্তিতেই তদন্ত চলত। নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে পুরো প্রক্রিয়া স্থায়ী আইনি কাঠামো পাবে। এতে অভিবাসীদের অধিকার সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ বিধিমালার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তদন্তের সময়সীমা নির্ধারণ। অভিযোগ জমার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা কতদিনের মধ্যে কাজ শেষ করবেন তা নির্দিষ্ট করা হবে। এতে দীর্ঘসূত্রতা কমবে। কর্মকর্তাদের জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি তদন্ত প্রতিবেদনে কোনো পক্ষ অসন্তুষ্ট হলে ‘নারাজি’ দেওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে। আগে এমন সুযোগ ছিল না।
বর্তমানে অভিযোগ গ্রহণ পুরোপুরি ম্যানুয়াল হওয়ায় একই ব্যক্তি বিএমইটি, জেলা জনশক্তি অফিস ও মন্ত্রণালয়ে আলাদাভাবে অভিযোগ করেন। এতে একই অভিযোগ বারবার নথিভুক্ত হচ্ছে বলে জানান বিএমইটির মহাপরিচালক সালেহ আহমদ মোজাফফর। তিনি বলেন, গত বছর রেকর্ডসংখ্যক অভিযোগ নিষ্পত্তি ও অর্থ আদায় হয়েছে। একই সঙ্গে দেশে এসেছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স। প্রবাসীদের সুরক্ষায় অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য আলাদা সেল গঠন করা হয়েছে। দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তিই এর লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণার বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যারা বিদেশে যেতে আগ্রহী তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রয়োজনীয় তথ্য জানা সম্ভব হচ্ছে। প্রতারণার ঝুঁকিও কমছে।
তবে অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা তাসনিম সিদ্দিকী মনে করেন, সমস্যা শুধু নিষ্পত্তির হার নয়। নিষ্পত্তির ধরনই বড় প্রশ্ন। তার মতে, দক্ষ লোকবল ও আইনজীবীর অভাব বড় বাধা। বিএমইটিতে স্থায়ী লিগ্যাল সেল নেই। অধিকাংশ সময় কর্মকর্তারাই সালিশি করেন। অনেকেরই পর্যাপ্ত আইনি প্রশিক্ষণ নেই। ফলে নেগোসিয়েশন সঠিকভাবে হয় না। অনেক ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সির পক্ষে সমঝোতা হয়। কর্মীরা ন্যায্য পাওনার বদলে সামান্য অর্থে রফা করতে বাধ্য হন। এই প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা দরকার বলে তিনি মনে করেন।
অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সহজ করতে রামরুর সহায়তায় একটি আধুনিক অনলাইন ট্র্যাকিং সিস্টেম পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, জালিয়াতির অভিযোগই সবচেয়ে বেশি আসে। এক কাজের কথা বলে অন্য কাজ দেওয়া হয়। ইকামা দেওয়া হয় না। অনেককে কাজ না পেয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই দেশে ফিরতে হয়। ফেরত আসার অভিযোগই সংখ্যায় বেশি।
২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত রামরুর সহায়তায় একটি অনলাইন সিস্টেম চালু ছিল। পরে আইএলওর একটি প্রকল্পের কারণে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। নতুন উদ্যোগও সফল হয়নি। এখন আবার সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে রামরুর কারিগরি সহায়তায় সিস্টেমটি সচল করার কাজ চলছে। এই ব্যবস্থায় কর্মীরা ঘরে বসেই অভিযোগ করতে পারবেন। একই সঙ্গে জানতে পারবেন তাদের অভিযোগ কোন পর্যায়ে আছে।

