দেশের বড় ১২৬টি প্রতিষ্ঠান গত পাঁচ বছরে ১ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। তথ্যটি এসেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের ছয় মাসের তদন্ত থেকে। তদন্তে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলো রেজিস্ট্রার খাতায় এবং কম্পিউটারে আলাদা হিসাব রাখত। প্রকৃত বিক্রি লুকিয়ে কম বিক্রি দেখানো হতো।
ভ্যাট গোয়েন্দারা বিনা নোটিশে প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভিযান চালিয়ে উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যাংক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করেন। ফরেনসিক ল্যাবে কম্পিউটারের প্রকৃত হিসাবও উদ্ধার করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বকেয়া ভ্যাট না পরিশোধ করলে মামলা, ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং ব্যবসা চিহ্নিতকরণ নম্বর (বিন) স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান নির্দেশ দিয়েছেন, ১২৬ প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট পরিশোধ ও বেচাকেনার তথ্য খতিয়ে দেখা হোক। তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলো পাওনা ভ্যাট পরিশোধের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন অজুহাতে তা পরিশোধ করছে না। গত ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) তদন্তে এই ফাঁকির বিষয় ধরা পড়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে বারবার সময় বেঁধে দেওয়া হলেও অধিকাংশ এক টাকাও পরিশোধ করেনি। কিছু প্রতিষ্ঠান সামান্য অর্থ দিয়ে বাকি বকেয়া পরিশোধে সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে। এনবিআর কয়েক দফা সময় বাড়ানোর পর আর সময় না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ১২৬ প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের এনবিআরে তলব করা হয়। কেউ নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেনি।
নানা পদক্ষেপের পরও ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এখন পর্যন্ত ৫৮ কোটি ৮২ লাখ ৮২ হাজার ৬৩৭ টাকা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। বাকি ভ্যাট আদায়ের জন্য সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বকেয়া ভ্যাট না দিলে মামলা, ব্যাংক হিসাব জব্দ ও বিন নম্বর স্থগিতের মতো ব্যবস্থা হবে।
চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান জানান, দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান ভ্যাট পরিশোধে সক্ষম হলেও তা করছে না। অনেকে অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধনও করেননি। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভ্যাট ফাঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। এবার ফাঁকি দেওয়া ভ্যাট আদায় করা হবে।
ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ছয় মাসের তদন্তে শতাধিক প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট ফাঁকি উদঘাটন করা হয়েছে। কিছু অর্থ আদায় করা সম্ভব হয়েছে, বাকিটা আদায়ে কাজ চলছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, ভ্যাট রাজস্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। তারা কোনো দলের নয়, সুবিধাবাদী। কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে দিয়ে সহজে ফাঁকি দিয়েছে। ফাঁকির অর্থ আদায় হলে এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি কমবে।
তদন্তে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলো দুই ধরনের হিসাব রেখেছে। একটি প্রকৃত বিক্রি, অন্যটি কম দেখানো বিক্রি। সঠিক হিসাব প্রকাশ না করে মিথ্যা হিসাব দেখানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় সংক্রান্ত হিসাব আলাদা রাখা হয়েছে।
ভ্যাট গোয়েন্দারা বিনা নোটিশে হাজির হয়ে উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যাংক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করেছেন। ফরেনসিক ল্যাবে কম্পিউটারের প্রকৃত হিসাব উদ্ধার করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও ব্যাংক লেনদেন খতিয়ে দেখা হয়েছে। এভাবে নিশ্চিত হয়েছে, ১২৬ প্রতিষ্ঠান ১,৫৮৬ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে।
১২৬ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভ্যাট ফাঁকির বড় অংকের কিছু উদাহরণ:
- সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, ৭৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা
- আহমেদ ফুটওয়ার লিমিটেড, ১০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা
- ইয়ঙ্গওয়ান হাইটেক স্পোর্টসওয়ার লিমিটেড, ৪০ কোটি ১৮ লাখ টাকা
- এশিয়া অ্যালায়েন্স কমিউনিকেশন লিমিটেড, ৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা
- ওয়াটা কেমিক্যাল লিমিটেড, ৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা
- সিটি ব্যাংক এন এ, ৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা
- আল-আকসা ডেভেলপার্স লিমিটেড, ৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা
- লিরা পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা
- আলিবাবা ডোর অ্যান্ড ফার্নিচার, ১০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা
- হামজা টেক্সটাইল লিমিটেড, ১২ কোটি ৯ লাখ টাকা
- পারফরমেন্স মোটরস লিমিটেড, ৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা
- ডিবি টেক্স লিমিটেড, ২৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা
- সামিট অয়েল অ্যান্ড শিপিং কোম্পানি লিমিটেড, ২৫০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা

