ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে (আইবিএ) একাধিক আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। রুটিন একাডেমিক কাজকে ওভারলোড দেখিয়ে অতিরিক্ত সম্মানী নেওয়া হয়েছে। আবার লিফট মেরামত ও ভবন সংস্কারের নামে বারবার টাকা খরচ দেখানো হলেও অনেক বিল ও ভাউচার নিরীক্ষায় দেখানো হয়নি। এসব অনিয়মে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩ কোটি ৫৭ লাখ ৭৭ হাজার ৩০২ টাকা।
শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩–২৪ অর্থবছরের অডিট শেষ করেছে। নিরীক্ষায় দেখা গেছে, সাজানো কোটেশনের মাধ্যমে লিফট ও ভবন মেরামত করা হয়েছে। ওভারলোড কোর্সের নামে শিক্ষকদের অর্থ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকে সঞ্চিত বিপুল আয় বাজেটে দেখানো হয়নি। নির্ধারিত ওভারহেড চার্জও কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা দেওয়া হয়নি। এছাড়া ক্রয় প্রক্রিয়ায়ও নানা ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আইবিএর পরিচালক অধ্যাপক শাকিল হুদা বলেন, যে সময়কার অনিয়মের কথা বলা হচ্ছে তখন তিনি আইবিএতে ছিলেন না। তিনি জানান, অডিট আপত্তির জবাব ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। এখন আপত্তি নিষ্পত্তি হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেবে অডিট অধিদপ্তর।
অডিট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. কামরুল আলম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিট আপত্তিগুলো নিয়ে কাজ চলছে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইবিএর বিবিএ ও এমবিএ প্রোগ্রামের নিয়মিত পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, ইনভিজিলেশন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের মতো কাজের জন্য কোনো অনুমোদিত নীতিমালা ছাড়াই ২২ লাখ ৮০ হাজার ৭৮৭ টাকা সম্মানী দেওয়া হয়েছে। অথচ এসব কাজ শিক্ষকদের নিয়মিত দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। জেনারেল ফিন্যান্সিয়াল রুলস (জিএফআর)-১০ ও ১১ অনুযায়ী সরকারি অর্থ ব্যয়ে মিতব্যয়িতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা অনুসরণ বাধ্যতামূলক হলেও তা মানা হয়নি।
এছাড়া এমবিএ ও বিবিএ প্রোগ্রামের স্প্রিং ও ফল সেমিস্টারে ওভারলোড কোর্সের নামে শিক্ষকদের প্রতি কোর্সে ১ লাখ ১১ হাজার ১১১ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এতে মোট ব্যয় হয়েছে ৩৪ লাখ ৭ হাজার ৭৭৫ টাকা। কিন্তু কোন নীতিমালার ভিত্তিতে এই ওভারলোড নির্ধারণ করা হয়েছে, তার কোনো নথি দেখানো হয়নি।
আইবিএ ভবনে নতুন একটি লিফট স্থাপনের ক্ষেত্রেও বড় অনিয়ম ধরা পড়েছে। আরএফকিউ পদ্ধতিতে একই ঠিকাদারকে ভাগ ভাগ করে কার্যাদেশ দিয়ে ১৮ লাখ ৭১ হাজার ৭০৩ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। তবে প্রথম ও চতুর্থ ধাপের বিল নিরীক্ষায় দেখানো হয়নি। ফলে মোট ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায়নি। অথচ এ ধরনের কাজের জন্য ওপেন টেন্ডার মেথড (ওটিএম) অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক ছিল।
আইবিএ ভবনের ছাদ মেরামতেও একই ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে। একই ঠিকাদারকে ছয় ধাপে কাজ দিয়ে ১৪ লাখ ৯৬ হাজার ১০০ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও তিন ধাপের কোনো বিল-ভাউচার পাওয়া যায়নি। কাজের স্পেসিফিকেশন, প্রাক্কলিত মূল্য কিংবা প্রকৌশল অনুমোদনের নথিও সংরক্ষণ করা হয়নি। যা পিপিএ-২০০৬ ও পিপিআর-২০০৮ অনুযায়ী বাধ্যতামূলক।
সবচেয়ে বড় অনিয়ম হিসেবে ধরা পড়েছে আইবিএর ব্যাংক হিসাবের আয় বাজেটে না দেখানোর বিষয়টি। নিরীক্ষায় দেখা যায়, বিভিন্ন ব্যাংকে সংরক্ষিত ১৫টি এফডিআরসহ মোট ২৬ কোটি ১৫ লাখ ৫৭ হাজার ৯৬৮ টাকা আয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে প্রদর্শন করা হয়নি। ইউজিসির নির্দেশনা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আয় কেন্দ্রীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করার কথা থাকলেও তা মানা হয়নি।
অডিট প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আইবিএ রিক্রুইটমেন্ট টেস্ট অ্যান্ড প্রজেক্ট এবং অন্যান্য কার্যক্রম থেকে ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ১৮ কোটি ৭৫ লাখ ৭৯ হাজার ২৯ টাকা আয় করেছে। কিন্তু এর ওপর নির্ধারিত ৩০ শতাংশ ওভারহেড চার্জ কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা দেওয়া হয়নি। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি হয়েছে ৫ কোটি ৬২ লাখ ৭৩ হাজার ৭০৮ টাকা।
ক্রয় প্রক্রিয়ায়ও একাধিক অনিয়ম ধরা পড়েছে। আরএফকিউ পদ্ধতিতে বছরে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের অনুমতি থাকলেও আইবিএ প্রায় ৮৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এতে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৪ লাখ ৮৯ হাজার ২৫১ টাকা।
এছাড়া কেনা ল্যাপটপ ও আসবাবপত্রের কোনো স্টক বা সম্পদ রেজিস্টার সংরক্ষণ করা হয়নি। ১৮ জন শিক্ষকের জন্য কেনা ১৮টি ল্যাপটপেরও কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। এতে ৩৪ লাখ ১০ টাকা আর্থিক ক্ষতির দায় নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারবেন না। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রো-ভিসিকে (প্রশাসন)। লিখিত আবেদন করলে সেখান থেকে উত্তর দেওয়া হবে।
প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর জানিয়েছে, ধারাবাহিকভাবে আর্থিক বিধিমালা লঙ্ঘনের মাধ্যমে আইবিএতে আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধানদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

