জীবন বিমা মানুষের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য আর্থিক নিরাপত্তার আশ্বাস দেয়। কিন্তু সেই আশ্বাসই বহু গ্রাহকের কাছে পরিণত হয়েছে প্রতারণার ফাঁদে। গ্রাহকের দেওয়া প্রিমিয়ামে গঠিত লাইফ ফান্ড থেকেই মৃত্যুদাবি, মেয়াদপূর্তির অর্থ ও পেনশন পরিশোধ হওয়ার কথা। বাস্তবে সেই তহবিলেই বছরের পর বছর ধরে চলেছে লুটপাট।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজর এড়িয়ে দীর্ঘদিন যে তছরুপ চলেছে, তার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে একাধিক অডিট ও তদন্ত প্রতিবেদনে। এসব প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র তিনটি জীবন বিমা কোম্পানির লাইফ ফান্ড থেকেই আত্মসাৎ হয়েছে মোট ৩ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে এককভাবে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সেই লুট হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্সে আত্মসাৎ হয়েছে ৩৫৩ কোটি টাকা।
হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্সে উধাও হয়েছে ১০৪ কোটি টাকা। লাইফ ফান্ড থেকে অবৈধ ঋণ বিতরণ, ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, কাগুজে প্রকল্প এবং নিয়মনীতিবহির্ভূত ব্যয়ের মাধ্যমে এই অর্থ সরানো হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে গ্রাহকদের ওপর। দাবি পরিশোধের সময় অনেককেই ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। কাগজে-কলমে দেখানো মুনাফার আড়ালে চাপা পড়ে থাকছে খাতটির প্রকৃত আর্থিক সংকট। পাঁচ পর্বের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের আজ প্রকাশিত হচ্ছে দ্বিতীয় পর্ব।
বহু জীবন বিমা কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে শত শত কোটি টাকার সম্পদ দেখানো হয়। তালিকায় থাকে জমি, ভবন, শেয়ার ও বিভিন্ন বিনিয়োগ। কিন্তু তদন্তে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। অনেক সম্পদের মূল্য কাগজে ফুলিয়ে দেখানো হয়েছে। জমি ও প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে অবিক্রয়যোগ্য অবস্থায় পড়ে আছে। দাবি পরিশোধের সময় নগদ অর্থের তীব্র সংকট দেখা দেয়। কাগজে সম্পদ থাকলেও তা গ্রাহকের কোনো কাজে আসছে না।
গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফের কাগজে-কলমে সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয় ৩ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে এসব সম্পদের বড় অংশ নগদায়নের উপযোগী নয়। অনেক জমি ও ভবনের মূল্য কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। আবার বহু সম্পদ ব্যাংক দায়, মামলা ও বন্ধকী জটিলতায় আটকে আছে। ফলে সম্পদ থাকলেও তা বিক্রি করে গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের বাস্তব সক্ষমতা নেই।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত ও নিরীক্ষাভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটির তহবিলে জমা হয়েছিল প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। এতে ছিল গ্রাহকদের প্রিমিয়াম, বিনিয়োগ ও মুনাফার অর্থ। এই বিপুল তহবিল আত্মসাৎ করা হয়েছে মূলত তিনটি কৌশলে।
প্রথমত, বাজারমূল্যের তুলনায় ৩ থেকে ৫ গুণ বেশি দামে জমি কেনা দেখানো হতো। অতিরিক্ত অর্থ চলে যেত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পকেটে। উদাহরণ হিসেবে তোপখানা রোডের একটি জমি ও স্থাপনার কথা উঠে এসেছে। সেখানে ২০৭ কোটি টাকার লেনদেনে অন্তত ৪৫ কোটি টাকা সরাসরি আত্মসাৎ করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, গ্রাহকদের অর্থে গড়া ডিপোজিট ব্যাংকে বন্ধক রেখে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হতো। ঋণ কোম্পানির নামে হলেও সেই অর্থ চলে যেত ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে।
তৃতীয়ত, প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ফি, রক্ষণাবেক্ষণ ও ভুয়া বিলের নামে কাগজে-কলমে কোটি কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।
অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, ২ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা প্রমাণসহ আত্মসাৎ হয়েছে। আরও ৪৩২ কোটি টাকার হিসাবে অনিয়ম পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে কোম্পানিটির মোট দায় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি।
লুটের সহজ ভান্ডার:
লাইফ ফান্ড মূলত গ্রাহকের দেওয়া প্রিমিয়াম থেকে গঠিত একটি তহবিল। এই তহবিল থেকেই মৃত্যুদাবি, মেয়াদপূর্তির অর্থ ও পেনশন পরিশোধ হওয়ার কথা। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বহু জীবন বিমা কোম্পানিতে এই লাইফ ফান্ডই পরিণত হয়েছে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ ভান্ডারে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার একাধিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক কোম্পানি লাইফ ফান্ড থেকে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের নামে ঋণ দিয়েছে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ করা হয়েছে। কাগুজে প্রকল্পে অর্থ ঢালা হয়েছে। নিয়মনীতি উপেক্ষা করে দেখানো হয়েছে অতিরিক্ত ও অনিয়মিত প্রশাসনিক ব্যয়।
এর ফলে যে তহবিল দিয়ে গ্রাহকের দাবি পরিশোধ হওয়ার কথা ছিল, সেটিই ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গেছে। সময়মতো অর্থ না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন অসংখ্য গ্রাহক। লাইফ ফান্ডের এই অপব্যবহার জীবন বিমা খাতের নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
যেভাবে ফারইস্ট লাইফের ফান্ড ফাঁকা:
বিনিয়োগের নামে লাইফ ফান্ড ফাঁকা করার জন্য ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সে দফায় দফায় বোর্ড সভা ও সাব-কমিটির কার্যবিবরণী ও রেজুলেশন জালিয়াতি করা হয়েছিল। জমি ক্রয় ও উন্নয়নের নামে লাইফ ফান্ড থেকে অর্থ সরানো হয়েছে। এর বড় অংশই লেনদেন হয়েছে নগদে, যা বিমা আইন ও আর্থিক বিধি-বিধানের সরাসরি লঙ্ঘন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মিরপুরের গোড়ান চাটবাড়িতে মাত্র সাড়ে ১৪ কোটি টাকায় কেনা জমির কাগজে-কলমে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় আড়াইশ’ কোটি টাকা। প্রকৃত মূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি খরচ দেখিয়ে লাইফ ফান্ড থেকে অর্থ সরানোর সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ফারইস্ট ইসলামী লাইফের তৎকালীন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হেমায়েত উল্লাহ এই অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় সরাসরি যোগসাজশে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু সেই সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থা নির্বিকার থাকায় তদনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
সাড়ে ১৪ কোটি টাকার জমিতে ১৪২ কোটি টাকার বালু:
২০১৩ সালে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ এমপ্লয়ীজ কো-অপারেটিভ সোসাইটি ও প্রাইম ইসলামী লাইফ এমপ্লয়ীজ কো-অপারেটিভ সোসাইটির নামে যৌথভাবে মিরপুর, গোড়ান, চাটবাড়িতে প্রায় ৭৬৩ শতাংশ জমি কেনা হয়। দলিল অনুযায়ী জমির মূল্য ছিল মাত্র ১৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।
কিন্তু ওই জমিতে বালু ভরাট ও উন্নয়ন খরচ দেখানো হয়েছে ১৪২ কোটি ৩০ লাখ টাকা—যা মূল মূল্যের দশ গুণেরও বেশি। প্রতি শতক জমির দাম যেখানে দুই লাখ টাকার নিচে, সেখানে প্রতি শতকে উন্নয়ন ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ১৯ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি পরিকল্পিতভাবে লাইফ ফান্ড লুটের একটি বড় কৌশল।
অন্যদিকে জমি রেজিস্ট্রেশনের আনুমানিক খরচ যেখানে সর্বোচ্চ দুই কোটি টাকা হওয়ার কথা, সেখানে ‘বিবিধ খরচ’ দেখিয়ে প্রায় ৭০ কোটি টাকার বেশি উত্তোলন করা হয়েছে। নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রেজিস্ট্রেশন খরচ অতিরঞ্জিত দেখিয়ে অন্তত ৭০ কোটি টাকা লাইফ ফান্ড থেকে অতিরিক্তভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে।
জমি কিনেছে সোসাইটি, টাকা দিয়েছে লাইফ ফান্ড:
বিমা আইন অনুযায়ী জীবন বিমা কোম্পানি শুধুমাত্র কর্মীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির বিপরীতে সীমিত ঋণ দিতে পারে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র অনুমোদন এড়াতে হঠাৎ কর্মীদের নামে কো-অপারেটিভ সোসাইটি গঠন করে। এরপর সেই সোসাইটির নামে জমি কেনা হলেও খরচের বড় অংশ সরাসরি লাইফ ফান্ড থেকে মেটানো হয়।
জমির দাম বাড়িয়ে দেখাতে একাধিকবার ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড রিয়েল এস্টেট সাব-কমিটি এবং পরিচালনা পর্ষদের সভার কার্যবিবরণী পরিবর্তন করা হয়। একই বোর্ড সভার ভিন্ন ভিন্ন কার্যবিবরণীতে জমির পরিমাণ, দাম ও ব্যয়ের হিসাব সম্পূর্ণ আলাদা পাওয়া গেছে। আইডিআরএ’র অনুমোদন ছাড়া এই জমি ক্রয় করা হয়েছে বলেও নথিতে প্রমাণ রয়েছে। অনুমোদনে নগদ লেনদেন নিষিদ্ধ থাকলেও অধিকাংশ অর্থ নগদে পরিশোধ করা হয়েছে। এটি মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনসহ একাধিক আর্থিক বিধি লঙ্ঘনের মধ্যে পড়ে।
২০১৪ সালে আইডিআরএ তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৪২ কোটি টাকার উন্নয়ন ব্যয় ‘কিছুটা বেশি’ হলেও বড় কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি। কিন্তু ফারইস্ট লাইফের প্রকৃত সংকটের চিত্র পরে উঠে আসে বিশেষ অডিটে।
২০২১ সালের এপ্রিল মাসে আইডিআরএ বিশেষ অডিট পরিচালনার জন্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম শিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানিকে নিয়োগ দেয়। ২০২২ সালের মে মাসে অডিট প্রতিবেদন জমা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, কোম্পানি থেকে প্রায় ২ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। এছাড়া ৪৩২ কোটি টাকার হিসাব সংক্রান্ত অনিয়মও শনাক্ত হয়েছে।
অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে ফারইস্ট ইসলামীর সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হেমায়েত উল্লাহ, সাবেক পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়, মূলত দুটি কৌশলে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। একদিকে বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে জমি ক্রয়, অন্যদিকে কোম্পানির মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট রিসিপ্ট (এমটিডিআর) বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ নেওয়া হয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। একই সময়ে আইডিআরএ তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হেমায়েত উল্লাহকে বরখাস্ত করে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ফারইস্ট লাইফ ইনস্যুরেন্সের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। কিন্তু এত বড় সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের বিমা দাবি পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটি ব্যর্থ। অভিযোগ রয়েছে, এ পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যকর কোনও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে পারেনি।
আইডিআরএ’র মিডিয়া ও যোগাযোগ পরামর্শক সাইফুন্নাহার সুমি জানান, সম্প্রতি বিপুল পরিমাণ বিমা দাবি পরিশোধের জন্য কোম্পানির কাছে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা চাওয়া হলেও তারা তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, “কোম্পানিটিকে সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা মানা না হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, বর্তমান সংকট কাটাতে কোম্পানিটিকে ব্যবসা সম্প্রসারণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। “এই মুহূর্তে ব্যবসা সম্প্রসারণ কোম্পানিটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,” বলেন তিনি।
ব্যবসা প্রায় বন্ধ—স্বীকার কোম্পানির:
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের সচিব কলিম উদ্দিন স্বীকার করেছেন, কোম্পানির সবচেয়ে বড় সংকট এখন বকেয়া দাবি পরিশোধ। তার ভাষ্য, “বর্তমান আয়ের কাঠামো দিয়ে এই বকেয়া পরিশোধ সম্ভব নয়।” দীর্ঘদিন ধরে দাবি না দেওয়ায় নতুন পলিসি বিক্রি কার্যত বন্ধ রয়েছে। আয়ের উৎস শুকিয়ে গেছে।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আব্দুর রহিম ভূঁইয়া জানিয়েছেন, ২০২১ সালের পর থেকেই কোম্পানিটি টানা আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত সংকটে রয়েছে। সেই সময় থেকে প্রতিষ্ঠানটি কোনো বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে পারেনি।
তিনি বলেন, “আগের মালিকপক্ষ লাইফ ফান্ড থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ায় কোম্পানির সংকট আরও গভীর হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে।”
ভারপ্রাপ্ত সিইও আরও বলেন, “বর্তমানে কোম্পানির বড় সমস্যা হচ্ছে তারল্য সংকট। পর্যাপ্ত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সেগুলো বিক্রি করা যাচ্ছে না। বর্তমান রাজনৈতিক ও সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।” তবুও তিনি পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদী। তার ভাষ্য, “নির্বাচনের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সম্পদ বিক্রি করে ধাপে ধাপে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হবে।”
খরচ কমাতে গাড়ি বিক্রি, কয়েক’শ কর্মী ছাঁটাই ও অফিস একীভূতসহ নানা পদক্ষেপে সাশ্রয় হয়েছে মাত্র ৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা। অথচ গ্রাহকদের বকেয়া দাবি ২ হাজার ৮১৫ কোটির বেশি। অনেক বিশ্লেষক এই সাশ্রয়কে ‘ডুবতে থাকা জাহাজে পানি সেচে টিকে থাকার চেষ্টা’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
অডিট ও নথি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে একটি সংঘবদ্ধ আর্থিক সিন্ডিকেটের চিত্র। কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছেন সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, এম এ খালেক এবং সাবেক সিইও হেমায়েত উল্লাহ। তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিল ব্যাংক ও রিয়েল এস্টেট খাতের প্রভাবশালী গোষ্ঠী।
এই নেটওয়ার্কই গত দুই দশকে জীবন বিমা প্রতিষ্ঠানটিকে গ্রাহকের নিরাপত্তার জায়গা থেকে সরিয়ে এনে পরিণত করেছে একটি সংগঠিত লুটের বাজারে। তার দাম দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ—যাদের সঞ্চয়ের টাকা আজও আটকে আছে কাগুজে সম্পদের ফাঁদে।
২০২১ সালে দেশের বিমা ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ পায় ফারইস্ট ইসলামী লাইফে। তৎকালীন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম গ্রাহকের প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। কিন্তু এই বিপুল লুটপাটের পরও নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।
বরং সেকেন্ডারি রেগুলেটর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কোম্পানির বোর্ড বাতিল করে নতুন বোর্ড নিয়োগ দিয়েছে। অনুরূপ পরিস্থিতি দেখা গেছে সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্সেও। সেখানে গ্রাহক প্রিমিয়ামের ৩৫৩ কোটি টাকা অনিয়ম ও তছরুপের মধ্যে পড়লেও আইডিআরএ কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্সেও বড় অঙ্কের আত্মসাৎ:
সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস তার স্ত্রী, পুত্র, কন্যা ও জামাতাসহ সাতজনের নামে কোম্পানির তহবিল থেকে প্রায় ১৮৮ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে কোম্পানির ওপর পরিচালিত এক বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
আইডিআরএ’র নিয়োগ করা নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান হুদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় এই অর্থ তছরুপ হয়েছে।
মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি। তার বিরুদ্ধে সোনালী লাইফের তহবিল আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর আইডিআরএ কোম্পানিতে বিশেষ নিরীক্ষা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন এবং হুদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানিকে নিরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ভবনের নামেই ১৪১ কোটি টাকা:
রাজধানীর মালিবাগে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের মালিকানাধীন ‘ইম্পিরিয়াল ভবন’ সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্সের প্রধান কার্যালয়। ভবন কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে কোম্পানির তহবিল থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের চিত্র উঠে এসেছে।
নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান হুদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি ভবন ক্রয়সংক্রান্ত দুটি সমঝোতা চুক্তির কপি পায়। প্রথম চুক্তি হয় ২০২১ সালে, যেখানে ভবনের মূল্য ধরা হয় ৩৫০ কোটি টাকা। পরের বছর, ২০২২ সালে সম্পাদিত দ্বিতীয় চুক্তিতে একই ভবনের দাম দেখানো হয় মাত্র ১১০ কোটি ৩১ লাখ টাকা। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই দুটি চুক্তির কোনোটিই সোনালী লাইফের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া করা হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, জমি ও ভবন কেনার অগ্রিম হিসেবে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানকে সোনালী লাইফের লাইফ ফান্ড থেকে অবৈধভাবে ১৪১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এর বাইরে সোয়েটার ক্রয়, আপ্যায়ন ও ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ একই প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়েছে আরও ৭ কোটি ৮৫ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। এসব তথ্য আইডিআরএ সংশ্লিষ্ট চিঠিতে উল্লেখ করেছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ইম্পিরিয়াল ভবনের জমি ও ভবন নির্মাণসংক্রান্ত গুরুতর অনিয়মের কথাও উঠে এসেছে। জমির মূল দলিল, বায়া দলিল, খতিয়ান, নামজারি ও ভূমি কর পরিশোধের কোনও রসিদ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান পায়নি। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইডিআরএ জানিয়েছে, ৭ কাঠা জমির ওপর ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দপত্র, ইজারা চুক্তি ও নির্মাণ অনুমোদনের কোনও বৈধ নথি পাওয়া যায়নি।
কোম্পানির টাকায় পারিবারিক সাম্রাজ্য:
আইনে পরিচালকদের জন্য কেবল পর্ষদ বৈঠকে অংশগ্রহণের সম্মানী নির্ধারিত। কিন্তু সোনালী লাইফে সেই আইন উপেক্ষা করে গড়ে তোলা হয়েছে একটি পারিবারিক বেতনভিত্তিক সাম্রাজ্য। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস কোম্পানির পর্ষদকে ব্যবহার করে নিজের পরিবারকে নিয়মিত মাসিক বেতনের আওতায় নিয়ে কোম্পানির তহবিল লুট করেছেন।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস নিজে, তার স্ত্রী, এক ছেলে, দুই মেয়ে, এক জামাতা ও এক পুত্রবধূ—পরিবারের সাত সদস্য মাসে দুই লাখ টাকা করে বেতন পেয়েছেন। পরিবারের বাইরের পরিচালক নূর এ হাফজাও একই হারে বেতন পান। অর্থাৎ, আট পরিচালক ১৪ মাস ধরে মাসিক ১৪ লাখ টাকা করে তুলে নিয়েছেন, যার মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এই বেতন গ্রহণের কোনো আইনগত ভিত্তি বা পর্ষদের অনুমোদনের তথ্য পাওয়া যায়নি।
কোম্পানির তহবিল থেকে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় করে কেনা হয় একটি বিলাসবহুল অডি গাড়ি। আইডিআরএ’র প্রজ্ঞাপনে চেয়ারম্যানের জন্য গাড়ির সর্বোচ্চ মূল্যসীমা ৮৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ, নিয়ন্ত্রকের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে দ্বিগুণ দামে গাড়ি কেনা হয়েছে।
পরিচালকদের নামে অতিরিক্ত লভ্যাংশ ও ব্যক্তিগত ব্যয়ের তালিকাও চাঞ্চল্যকর। তারা ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা অতিরিক্ত লভ্যাংশ এবং শিক্ষা ও ভ্রমণ খরচের নামে আরও ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা নিয়েছেন। শেখ মোহাম্মদ ড্যানিয়েল গ্রুপ বিমা পলিসি থেকে অবৈধ কমিশন নিয়েছেন এবং পরিচালক না থাকা অবস্থায় ১১টি পর্ষদ বৈঠকে অংশ নিয়ে সম্মানী গ্রহণ করেছেন।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, পরিচালক না হয়েও শেখ মোহাম্মদ ড্যানিয়েল কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যৌথভাবে চেকে স্বাক্ষর করেছেন। এসব চেকের মাধ্যমে সোনালী লাইফের তহবিল থেকে ৩১ কোটি টাকা সরাসরি মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। কোরবানির গরু কেনা, পলিসি নবায়ন উপহার, ঋণ সমন্বয়, অনুদান, এসি ক্রয় এবং প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) খরচের নামে আরও ৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা তোলা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা বৈধ অনুমোদন ছিল না।
মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের মালিকানাধীন ড্রাগন আইটি, ড্রাগন সোয়েটার ও ড্রাগন স্পিনিং নামের প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কোম্পানির অর্থ প্রবাহ উদ্বেগজনক। ড্রাগন আইটিকে অফিস ভাড়ার নামে প্রায় ১২ কোটি টাকা দেওয়া হয়। অথচ পুরো ইম্পিরিয়াল ভবনের ইউটিলিটি বিল বাবদ ১ কোটি ৭২ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয় সোনালী লাইফের তহবিল থেকে। ড্রাগন সোয়েটার ও ড্রাগন স্পিনিংয়ের ১৪ লাখ টাকার করও বিমা কোম্পানির অর্থ দিয়ে পরিশোধ করা হয়েছে।
এই অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস, তার স্ত্রী পরিচালক ফজলুতুন নেসা’সহ পরিবারের সাত সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। তবে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি মারা গেছেন।
হোমল্যান্ড লাইফ থেকে ১০৪ কোটি টাকার আত্মসাত:
হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্সেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। তদন্তে দেখা গেছে, বোর্ড সভার কার্যবিবরণী জাল করা হয়েছে, ভুয়া ভাউচার তৈরি হয়েছে এবং কাগুজে খরচ দেখিয়ে কোম্পানি থেকে ১০৪ কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। লুটপাটে সরাসরি জড়িত ছিলেন মালিকপক্ষ। এই ঘটনাটি তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
জানা গেছে, ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত হোমল্যান্ড লাইফের ১৩১তম পরিচালনা পর্ষদ সভায় আত্মসাত হওয়া অর্থ উদ্ধারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, জমি কেনার নামে অন্তত ১৩ কোটি টাকা আত্মসাতের সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এই অনিয়ম ও আত্মসাতের ঘটনা ঘটে ২০০৩ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে। ওই সময় কোম্পানির পরিচালনায় ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান কাজী এনাম উদ্দিন আহমেদ, পরবর্তী চেয়ারম্যান আব্দুস শুক্কুর ও ফয়জুল হক। সেই সময়কার পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে জমি ক্রয়সহ বিভিন্ন খাতে মোট ১০৪ কোটি টাকা আত্মসাত ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার তদন্তের জন্য হাইকোর্টে রিট করা হয় এবং আদালত তদন্তের নির্দেশনাও দেন।
আইডিআরএ’র হিসাবে হোমল্যান্ড লাইফ থেকে আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ আরও বেশি—প্রায় ১৯৮ কোটি টাকা। আইডিআরএ’র তথ্যমতে, ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর নামে জমি ক্রয়, কমিশন, মাটি ভরাট, সার্ভিস সেন্টার (এজেন্ট অফিস) চালু, পারিবারিক বিমা কার্যক্রম এবং শেয়ার বাজারে বিনিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে এই অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আর্থিক অনিয়মের সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর। প্রতিনিয়ত তারা হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরও বহু গ্রাহক বছরের পর বছর ধরে বিমা দাবির অর্থ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোম্পানির তহবিল থেকে লুট হওয়া অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা করতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও চাপের মুখে পড়েন প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডল। একপর্যায়ে এই বিষয় কেন্দ্র করে তাকে চাকরি হারাতে হয়। ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডল জানান, ১০৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ বহু পুরোনো। এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
গ্রাহকের টাকা স্বদেশ লাইফের এমডির পকেটে:
স্বদেশ লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির একাধিক আর্থিক ও ব্যবস্থাপনা ত্রুটি, বিমা আইন লঙ্ঘন এবং অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে উঠেছে। কোম্পানির এসভিপি আলমগীর শেখ ৮ ডিসেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগের কপি আইডিআরএ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)সহ বিভিন্ন সংস্থায় পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. ইখতিয়ার উদ্দিন শাহীন গ্রাহকদের প্রিমিয়ামের ৬০ লাখ ৭০ হাজার ৭১৭ টাকা নিজের ব্যক্তিগত হিসাবে গ্রহণ করেছেন। এছাড়া নিয়মবহির্ভূতভাবে নেওয়া ইনসেনটিভ বোনাস বাবদ তিনি ৪১ লাখ ৫৬ হাজার ৫০৫ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। মোট ক্ষতি ধরা হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ ২৭ হাজার ২২২ টাকা।
আইডিআরএ ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর এই অর্থ কোম্পানির হিসাবের মধ্যে ফেরত দেওয়ার জন্য লিখিতভাবে নির্দেশ দেয়। কিন্তু দেড় বছর অতিক্রম করেও কোনো অর্থ ফেরত না দেওয়ায় ডিসেম্বর মাসে আইডিআরএ দ্বিতীয়বারও টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এ কে কাওসার বলেন, “অতি সম্প্রতি ইখতিয়ার উদ্দিন শাহীন সাহেবের কাছ থেকে কয়েক দফায় ইনসেনটিভ বোনাস ও গ্রাহকের টাকা আদায় করা হয়েছে।”
স্বদেশ ইসলামী লাইফে চাকরি প্রলোভন দেখিয়ে ৩১ লাখ টাকা প্রতারণার অভিযোগ:
স্বদেশ ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে সম্প্রতি আরও এক ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ১১ জন চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে মোট প্রায় ৩১ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ এসেছে। ভুক্তভোগীরা জানান, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, সাক্ষাৎকার ও নিয়োগপত্র সবকিছুই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাউকেই চাকরি দেওয়া হয়নি এবং আদায়কৃত টাকাও ফেরত পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তারা ইন্টারনেটে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে স্বদেশ ইসলামী লাইফে আবেদন করেন। এরপর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় এবং নিয়োগপত্রও দেওয়া হয়। তবে চাকরিতে যোগদানের আগে কোম্পানির কর্মকর্তারা শর্ত দেন—প্রত্যেককে বিমা পলিসি খুলতে হবে।
শর্তে রাজি হয়ে ১১ জন প্রার্থী কিস্তিতে মোট ৩০ লাখ ৯৯ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ মে থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে তাদের চাকরিতে যোগদানের কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও কাউকেই নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
ভুক্তভোগীরা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। এছাড়া অভিযোগের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর কাছে। ভুক্তভোগী আব্দুল মান্নান গত অক্টোবরে পল্টন মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
স্বদেশ ইসলামী লাইফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এ কে কাওসার বলেন, “এই ঘটনা আমি যোগদানের আগে ঘটেছে। তবে এটি স্বদেশ ইসলামী লাইফের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। একটি প্রতারক চক্র স্বদেশ ইসলামী লাইফের নাম ভাঙিয়ে এই প্রতারণা করেছে। ইতোমধ্যে ওই প্রতারক চক্রের কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছেন।”
পদ্মা ইসলামী লাইফে চাকরি প্রলোভন ও অতিরিক্ত ব্যয়:
জীবন বিমা খাতে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া নতুন ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো পুরোনো কৌশলের আরও সংগঠিত ও পরিকল্পিত রূপের ইঙ্গিত দেয়।
আইডিআরএতে দেওয়া একাধিক লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, কোম্পানির তৎকালীন ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাজ্জাদ হোসেন ও জেনারেল ম্যানেজার মো. জিল্লুর রহমান চাকরির বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নারীদের উচ্চ বেতনের ব্যবস্থাপনা পদে নিয়োগের আশ্বাস দেন। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল কমিশনভিত্তিক বিমা পলিসি বিক্রির ফাঁদ।
ভুক্তভোগীরা জানান, “সম্ভব” নামের একটি অ্যাপে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ও ইউনিট ম্যানেজার পদে নিয়োগ এবং মাসিক ৩০–৪০ হাজার টাকা ফিক্সড বেতনের কথা বলা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে প্রদত্ত ঠিকানায় গিয়ে তারা দেখতে পান, সেটি পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের প্রধান কার্যালয়।
ভুক্তভোগী শাহনাজ পারভীন জানান, তাকে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার পদে নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে দেড় লাখ টাকা নেওয়া হয়। নদীয়া আক্তারের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ২২ হাজার ২০০ টাকা এবং নিগার সুলতানার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৩২ হাজার টাকা। প্রাথমিক আলোচনায় ফিক্সড বেতনের কথা বলা হলেও টাকা দেওয়ার পর জানানো হয়, চাকরিটি কমিশনভিত্তিক, নির্দিষ্ট বেতন নেই এবং বড় অঙ্কের বিমা বিক্রির টার্গেট পূরণ করতে হবে।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, শর্তে অসম্মতি জানালে জোরপূর্বক তাদের হাতে বিমা পলিসির কাগজ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ চাকরির নামে নেওয়া নগদ অর্থ পরে বিমা পলিসির প্রিমিয়াম হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক মো. মাইন উদ্দিন বলেন, “কিছু বিমা কোম্পানির মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে আইডিআরএ তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে না। এই ধারণা থেকেই গ্রাহকের অর্থ অপব্যবহার ও চাকরির নামে প্রতারণা বৃদ্ধি পাচ্ছে।”
অনুমোদিত সীমার বাইরে ব্যবস্থাপনা ব্যয়:
২০২৪ সালে দেশের জীবন বিমা খাতের ৩৬টি কোম্পানির মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ কোম্পানি আইডিআরএ নির্ধারিত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা অতিক্রম করেছে। ২০টি কোম্পানি অনুমোদিত সীমার বাইরে মোট ১৫৯ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। গ্রাহক প্রিমিয়ামের অর্ধেকের বেশি অর্থ খরচ করেছে ১৯টি কোম্পানি।
বিমা আইন-২০১০ অনুযায়ী কোম্পানিগুলোকে নির্ধারিত ব্যয়সীমার মধ্যে পরিচালনা করতে হয়। আইডিআরএ’র নিয়ম অনুযায়ী গ্রাহকের অর্থ অপচয় করা যায় না। তবুও পদ্মা ইসলামী লাইফ ও সানলাইফ ইনস্যুরেন্স সীমার দ্বিগুণ ব্যয় করেছে। স্বদেশ লাইফ এমনকি প্রিমিয়ামের চেয়ে বেশি ব্যয় করেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে কমিশন, বেতন-ভাতা, অফিস ভাড়া ও অন্যান্য খাতে। ২০২৩ সালে বিধি লঙ্ঘনের কারণে অনেক কোম্পানিকে আইডিআরএ জরিমানা করেছিল। তবে কোম্পানিগুলো শিখছে না। বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এস আলম গ্রুপের ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স ৪৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ে শীর্ষে।
আইডিআরএ’র ২০২৪ বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পদ্মা ইসলামী লাইফ ১১৭ শতাংশ অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। সানলাইফ ইনস্যুরেন্সও ১০০ শতাংশের বেশি ব্যয় করেছে। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ৬২ শতাংশ, বায়রা লাইফ, হোমল্যান্ড লাইফ, এনআরবি ইসলামিক লাইফ ও স্বদেশ লাইফ ৫০ শতাংশের বেশি এবং সানফ্লাওয়ার লাইফ ৪৪ শতাংশ অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। অন্যদিকে ১৬টি কোম্পানি অনুমোদিত সীমার মধ্যে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করেছে। এর মধ্যে ন্যাশনাল লাইফ ইনস্যুরেন্স ৯০ কোটি টাকা ব্যয় কমিয়ে সবচেয়ে সক্রিয়ভাবে শৃঙ্খলা বজায় রেখেছে। এই ১৬ কোম্পানি মিলিয়ে প্রায় ১৬৬ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছে।
আইডিআরএ’র তথ্যমতে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৬টি জীবন বিমা কোম্পানি ব্যবস্থাপনা ব্যয় করেছে ৩ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের হিসাব অনুযায়ী তারা ব্যবস্থাপনা ব্যয় দেখিয়েছে ৯৮৮ কোটি টাকা।
১৫টি জীবন বিমা কোম্পানি ‘পরিচালনার অযোগ্য’:
গত বছরের ২ জুলাই আইডিআরএ-এর প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান ড. এম আসলাম আলম জানান, “দেশের জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১৫টি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে এবং কার্যত পরিচালনার অযোগ্য। আরও ১৫টি মধ্যম ঝুঁকিতে আছে। ভালো অবস্থানে রয়েছে মাত্র ছয়টি কোম্পানি।”
আইডিআরএ’র অভ্যন্তরীণ গ্রেডিং অনুযায়ী, ‘সবচেয়ে দুর্বল’ হিসেবে চিহ্নিত ১৫টি প্রতিষ্ঠান হলো— সানলাইফ, হোমল্যান্ড, পদ্মা ইসলামী, প্রোগ্রেসিভ, প্রোটেক্টিভ ইসলামী, বেস্ট লাইফ, প্রাইম ইসলামী, যমুনা, ডায়মন্ড, স্বদেশ, সানফ্লাওয়ার, ফারইস্ট ইসলামী, গোল্ডেন, বায়রা লাইফ ও এনআরবি ইসলামিক লাইফ ইনস্যুরেন্স।

