ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ততই বাড়ছে সাইবার অপরাধ ও অপতথ্য। বিশেষ করে নারী প্রার্থীদের লক্ষ্য করে ছড়ানো হচ্ছে ভুয়া ছবি, এআই–তৈরি ভিডিও এবং মনগড়া গল্প। এতে প্রশ্নের মুখে পড়ছে নারীদের সম্মান, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে ভুয়া ছবি, বিকৃত ভিডিও ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে নারী প্রার্থীদের হেয় করা হচ্ছে। এই অপপ্রচারের নেপথ্যের চিত্র জানতে ৩০টি অনলাইন কনটেন্ট বিশ্লেষণ করেছে চ্যানেল ২৪।
জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। চ্যানেল 24–এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি ফেসবুক পেজ ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে নির্বাচনকেন্দ্রিক ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
‘ইমাম উদ্দিন’ নামের একটি ভুয়া আইডি থেকে চ্যানেল ২৪–এর নাম ব্যবহার করে একাধিক ফটোকার্ড ছড়ানো হয়। এর একটিতে দাবি করা হয়, বিকাশে টাকা পাঠানো মানুষের ভিড় তাসনিম জারার বাড়িতে। একই পেজে প্রকাশিত আরেকটি ভিডিওতে দেখানো হয়, ভোটের জন্য নৃত্য করছে জামায়াতের নারীরা। তবে ফ্যাক্ট চেকিংয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি।
‘মিয়া সিমান’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট করা আরেকটি ফটোকার্ডে বলা হয়, ঝালকাঠি-১ আসনে এনসিপির প্রার্থী ডা. মাহমুদা মিতু রাতে বাসায় ফেরার সময় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। যাচাই করে দেখা গেছে, এই তথ্যের কোনো সত্যতা নেই।
এ ছাড়া ‘ভোলা খবর কণ্ঠ’ নামের একটি পেজ থেকে জুবাঈদা রহমানের নামে একটি এআই ভিডিও পোস্ট করা হয়। সেখানে ভোটের বিনিময়ে বিকাশে টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়। ‘মো. মাহমুদ মিরন’ নামের আরেকটি পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দাবি করা হয়, রাজশাহীর এক যুবদল নেতা এক বয়স্ক নারীকে থাপ্পড় দিচ্ছেন। ফ্যাক্ট চেকিংয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি ভারতের একটি পুরোনো ঘটনার।
অনলাইনে ভুয়া তথ্য নিয়ে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে রিউমার স্ক্যানার। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে শনাক্ত হয়েছে ৪ হাজার ১৯৫টি ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য। এর মধ্যে ৩০৯টি নির্বাচন সংশ্লিষ্ট এবং ২ হাজার ২৮১টি রাজনৈতিক অপতথ্য।
রিউমার স্ক্যানারের সিনিয়র ফ্যাক্টচেকার তানভীর মাহতাব আবীর বলেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, রাজনৈতিক স্বার্থে কিছু রাজনীতিবিদ ও কর্মী পরিকল্পিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও সম্মানহানির কুৎসিত রাজনীতি চালান।
তিনি আরও বলেন, এআই কনটেন্টে সাধারণত রাজনীতিবিদ ও পরিচিত ব্যক্তিদেরই বেশি টার্গেট করা হয়। কারণ তারা নিয়মিত গণমাধ্যমে কথা বলেন। কেউ যদি একই সময়ে একটি ভিডিওতে কারও বক্তব্য ছড়াতে দেখেন, তাহলে সেটি কোনো গণমাধ্যমে এসেছে কি না যাচাই করা জরুরি। যেহেতু তারা পাবলিক ফিগার, তাদের বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার কথা। যদি না পাওয়া যায়, তাহলে সেটি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অপপ্রচারের উদ্দেশ্য শুধু ভোটের ফল প্রভাবিত করা নয়। এর মাধ্যমে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, আত্মবিশ্বাস এবং জনপরিসরে তাদের উপস্থিতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, নারীদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ তুলনামূলক বেশি হয়। তাদের হেয় করতে অ্যাডাল্ট বা মানহানিকর কনটেন্ট ছড়ানো হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর, যা নারীদের দুর্বল করে দেয়।

