সরকারি তদন্তে প্রকাশ, বিশ্বব্যাংকের ঋণে বাস্তবায়নাধীন গ্রামীণ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্পে নকশা অমান্য, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, অকার্যকর স্থাপনা নির্মাণ এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় চরম গাফিলতি ধরা পড়েছে।
উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ গত ৬ জানুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদনসহ একটি চিঠি পাঠিয়েছে। কিন্তু ডিপিএইচই কর্তৃপক্ষ এখনও অভিযুক্তদের শাস্তির দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়নি, জানিয়েছেন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা।
প্রকল্প সূত্র জানায়, গত জুন পর্যন্ত সারা দেশে ৩২২টি টয়লেট নির্মাণ শেষ হয়েছে, ব্যয় হয়েছে ৬৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ছোট স্কিমের আওতায় পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের জন্য ২ হাজার ৮২৪টি স্কিম বাস্তবায়িত হয়েছে, ব্যয় হয়েছে ৩৩৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা। বড় স্কিমে ব্যয় হয়েছে ১০৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
ডিপিএইচই প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়াল বলেন, ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সময় হলেই বিস্তারিত জানানো হবে। তবে তিনি টেলিফোনে এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারছেন না।
সরকার স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের পরিচালক মো. আনোয়ার ইমাম ও ভৌত অবকাঠামো বিভাগের উপ-প্রধান প্রিয়াংকা দত্ত।
তদন্তে দেখা গেছে, জনগণের জন্য নির্মিত টয়লেটগুলো ব্যবহারযোগ্য নয়। অনেক টয়লেট এমন জায়গায়, যেখানে সাধারণ মানুষ পৌঁছাতে পারে না। কিছু টয়লেট পরিত্যক্ত ভবনের পেছনে, কিছু অফিস ভবনের আড়ালে। বাগেরহাট, মানিকগঞ্জসহ একাধিক জেলায় এমন টয়লেট পাওয়া গেছে। প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্মিত র্যাম্প ৪৫–৬০ ডিগ্রি ঢালু, যা সুস্থ মানুষের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। দরজা ভাঙা, র্যাম্প ত্রুটিপূর্ণ, সামনে রাস্তা নেই। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত টয়লেটগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
প্রকল্পের হাত ধোয়ার স্টেশনও জনবিচ্ছিন্ন জায়গায় নির্মিত হয়েছে। অনেক স্টেশনের কল চুরি বা ভাঙা, কোথাও সাবান নেই, কোথাও পানির পাম্প মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে। স্থানীয় প্রতিনিধি ও ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বললেও হিজলা ও মৌলভীবাজারে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
পানি সরবরাহ প্রকল্পে নকশা ও কারিগরি লঙ্ঘন হয়েছে ফেনী, চাঁদপুর, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ ও বরিশালের বিভিন্ন স্কিমে। পাইপ মাটির তিন ফুট নিচে বসানোর কথা থাকলেও কোথাও তিন ইঞ্চি, কোথাও মাটির ওপর। নিচে বালির বেড থাকার কথা থাকলেও কিছু স্কিমে তা নেই। নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার করা হয়েছে, ফলে পাইপ ফেটে পানি বের হচ্ছে। অধিকাংশ স্কিমে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, মিটারও পাওয়া যায়নি।
ময়মনসিংহে চারটি ছোট স্কিম পরিদর্শন করা হয়, সবই বর্তমানে বন্ধ। নির্মাণ ত্রুটির কারণে ল্যান্ডিং স্টেশন ভেঙে গেছে, পিলারেও ত্রুটি দেখা দিয়েছে। চাঁদপুরে একটি বড় স্কিমের জন্য জলাশয় ভরাট করা হয়েছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঠিকাদার বা প্রকল্প কর্তৃপক্ষ স্থানীয় কমিটিকে নকশা বা কাজের মান সম্পর্কে জানাননি। সব অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রেক্ষিতে প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদার বলেন, তিনি তদন্ত প্রতিবেদন এখনও পাননি। তবে যে অনিয়মের কথা বলা হয়েছে, তার জবাব তার কাছে আছে। তিনি বলেছেন, “এটি বিশ্ব ব্যাংকের প্রকল্প। এখানে কোয়ালিটি মেইনটেইন করে কাজ করা হয়।”

