শেরপুরের মুদি দোকানি মনির হাসান নিজের তিন বছরের কন্যার জন্য খাদ্যদ্রব্য কিনে থাকেন শহরের একটি “উন্নত” ডিপার্টমেন্ট-স্টোর থেকে। যদিও তার দোকানে সব ধরনের পণ্য পাওয়া যায়, মনির বিশ্বাস, ব্রান্ডেড বা পরিচিত ব্র্যান্ডের খাদ্য শিশুদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর। দাম বেশি হলেও তিনি সন্তানের জন্য গুঁড়া দুধ, চকলেট, চিপসসহ অন্যান্য খাবার সেই দোকান থেকে কেনেন।
পরীবাগের বাসিন্দা সালেহা চৌধুরীও একই কথা জানান। তিনি বলেন, বাচ্চারা চকলেট ও চিপস পছন্দ করে। তাই একটু বেশি খরচ করেও মানসম্পন্ন ব্র্যান্ডের খাবার কেনেন।
তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, এতবার বাবা-মার “নিরাপদ” বলে কেনা পণ্যের মধ্যেও ক্ষতিকর ও ভেজাল উপাদান পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের প্রিয় গুঁড়া দুধ এখন ভেজাল ‘হয়ে পাউডার’ দিয়ে তৈরি হচ্ছে। সম্প্রতি ল্যাব পরীক্ষায় দেখা গেছে, বাজারের জনপ্রিয় গোয়ালিনী ডেইলি ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার-এ দুগ্ধ উপাদানের পরিমাণ মাত্র ১৭ শতাংশ, বাকি ৬৭ শতাংশ ভেজাল উপাদান।
ভেজাল উপাদান মিশিয়ে চকচকে মোড়কে বাজারজাত করা হচ্ছে বাহারি মিল্ক পাউডার। আদালতে প্রমাণ হওয়ার পরও প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতাদের উপর কার্যকর শাস্তি কার্যত নেই। সাধারণ ক্রেতারা সহজেই বুঝতে পারছে না যে, তারা বাচ্চাদের ‘হয়ে পাউডার’ খাওয়াচ্ছেন।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, শুধু গোয়ালিনী নয়, আসলাম টি কোম্পানি, ডানো, ড্যানিশ, নেসলে, স্টারশিপসহ আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডের গুঁড়া দুধ ল্যাব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি। এসব পণ্যের আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে মামলা করা হলেও, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই নিয়ন্ত্রণহীন থাকছে।
ডিএসসিসির খাদ্য পরিদর্শকরা কয়েক মাস আগে গোয়ালিনী ডেইলি ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার পরীক্ষা করেন।
-
দুগ্ধ উপাদান: ১৭.০৮% (প্রাকৃতিক থাকা উচিত ৭৬%)
-
দুগ্ধ চর্বি: ৭.৫৮% (নির্ধারিত: ৪২%)
-
দুগ্ধ প্রোটিন: ৯.৫০% (নির্ধারিত: ৩৪%)
-
অমøতা: ১৩.১৪% (নির্ধারিত: ১৮%)
-
আর্দ্রতা: ৪.১১% (নির্ধারিত: ৫%)
রিপোর্টে দেখা গেছে, প্যাকেটে থাকা পুষ্টি তালিকা ও স্ট্যান্ডার্ড মানের সঙ্গে কোনো মিল নেই। আদালতের নির্দেশে কিছু প্যাকেট ধ্বংস করা হয়েছে এবং ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
শিশুদের প্রিয় কিটক্যাট চকলেট-এও ভেজাল উপাদান ধরা পড়েছে। রাজধানীর ফকিরাপুল থেকে সংগ্রহ করা নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, পণ্য মানসম্মত নয়। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানদের বিরুদ্ধে নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ অনুযায়ী মামলা করা হয়েছে।
এছাড়া কোকোলা ওয়েফারসহ অন্যান্য শিশুখাদ্যও ভেজাল প্রমাণিত হওয়ায় আদালতের নির্দেশে বাজার থেকে সরানো হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদের উপপরিচালক ডা. মো. আকতার ইমাম বলেন, ভেজাল খাদ্য শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এতে কিডনি সমস্যা, শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা, এমনকি ব্রেইন ডেভেলপমেন্টে সমস্যা হতে পারে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া (অতিরিক্ত সচিব) বলেন, শিশু খাদ্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। মাঠ পর্যায়ে তারা নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার মাধ্যমে তদারকি করছেন। সুনির্দিষ্ট ল্যাব সক্ষমতা বাড়াতে নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভেজাল সন্দেহযুক্ত পণ্যের ক্ষেত্রে অভিযান চালানো হয়। এমনকি ভালো ব্র্যান্ডের প্যাকেজেও ভেজাল পাওয়া যেতে পারে। গোপন কারখানা বা সন্দেহজনক পণ্য থাকলে প্রশাসনকে অবহিত করতে হবে।

