বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখের নাম নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। বাজারের অস্থিরতা যেন এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কোথাও কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। দ্রব্যমূল্য কার্যত সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি।
অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত দেড় বছরে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। নিত্যপণ্যের দাম মানুষের স্বস্তি ফেরাতে পারেনি। বরং স্বল্প আয়ের মানুষের কষ্ট আরও বেড়েছে। আগের সরকারের আমলে যে বাজার সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল, তা ভাঙার কোনো দৃশ্যমান আলামত এখনো পাওয়া যায়নি।
এরই মধ্যে ডিম ও মুরগির বাজারে সিন্ডিকেটের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। সরকার এ খাতকে অগ্রাধিকার দিলেও বাজারে নিয়ন্ত্রণ আসেনি। বাজারের তথ্য বলছে, ডিম, মুরগি, সবজি, কাঁচা মরিচ, ভোজ্য তেল ও চিনিসহ বেশ কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে ডিম ও পেঁয়াজের বাজার।
দু-একটি পণ্যের দাম সামান্য কমলেও প্রধান খাদ্যশস্য চালের দাম বরং আরও কিছুটা বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতির প্রধান কারণ বাজার সিন্ডিকেট। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিজেদের মতো করে দাম বাড়াচ্ছে।
প্রায় প্রতিটি সরকার আমলেই একটি শক্তিশালী বাজার সিন্ডিকেট দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে। চিনির বাজার অস্থিতিশীল করা, পেঁয়াজ ও আলুর দৌরাত্ম্য তার উদাহরণ। প্রশ্ন হলো, এত আইন থাকার পরও এই সিন্ডিকেট কেন ভাঙা যাচ্ছে না। কেন বন্ধ হচ্ছে না বাজারের চাঁদাবাজি। কেন পণ্য পরিবহন সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য থামানো যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১০ শতাংশের বেশি। কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো বাজারজাতকরণ। এই পর্যায়েই সক্রিয় হয়ে ওঠে মধ্যস্বত্বভোগীরা। ফড়িয়া ও আড়তদাররাই মূলত এই শ্রেণির অংশ। তারা কৃষকের কাছ থেকে নামমাত্র দামে পণ্য কিনে দ্বিগুণ বা তিনগুণ দামে বিক্রি করে। এতে একদিকে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়ছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, কৃষিপণ্যের মুনাফার প্রায় ৮০ শতাংশই ভোগ করে মধ্যস্বত্বভোগীরা। অথচ অতিরিক্ত মুনাফা, মজুতদারি ও ভেজালের বিরুদ্ধে একাধিক আইন রয়েছে। বাস্তবে এসব আইনের কার্যকর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে সরকার পণ্যের দাম নির্ধারণ করলেও কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। দেশে কোনো কারণ ছাড়াই নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর প্রবণতা দীর্ঘদিনের। রোজা, ঈদ বা বাজেটকে অজুহাত বানিয়ে দাম বাড়ানো যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এখন সেই প্রবণতা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
বর্তমানে নিত্যপণ্যের বাজারে অর্থনীতির নিয়মের চেয়ে সিন্ডিকেটের বিধিই বেশি কার্যকর। সাধারণ মানুষ জিম্মি হলেও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো কার্যত অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে।
এর মধ্যেই সামনে রমজান। এই সময় ঘিরে সিন্ডিকেট চক্র আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিই তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। রমজান শুরুর আগেই রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সবজির দাম চড়া। সরবরাহ ঘাটতির অজুহাতে কাঁচা মরিচ, শসা, টম্যাটো, ফুলকপি ও শিমের দাম বেড়েছে। কাঁচা মরিচ কেজিতে ১২০ টাকা, শসা ১১০ থেকে ১২০ টাকা, টম্যাটো ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহেই অনেক সবজির দাম ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
মুরগির বাজারেও একই চিত্র। ডিমের দাম আপাতত স্থিতিশীল থাকলেও ব্রয়লার, দেশি ও পাকিস্তানি মুরগির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। রমজানে প্রোটিনের প্রধান উৎস হওয়ায় মুরগির চাহিদা বাড়ে। এখনই দাম বাড়তে থাকলে রমজানে তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এবারের রমজান আসছে জাতীয় নির্বাচনের ঠিক পরপরই। নির্বাচন নিয়ে প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গন ব্যস্ত থাকবে। এই সুযোগে যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়, সে বিষয়ে এখন থেকেই সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। নির্বাচন ও রমজান—দুটিই মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। সামান্য অব্যবস্থাপনাও বড় সামাজিক অসন্তোষ তৈরি করতে পারে।
ইতোমধ্যে পাইকারি বাজারেও দাম বাড়ার আলামত মিলেছে। রমজান সামনে রেখে এক সপ্তাহের ব্যবধানে তেল, চিনি, ছোলা ও ডালের দাম কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজারে এই প্রভাব স্পষ্ট। দেশি পেঁয়াজ কেজিতে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, ভারতীয় পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। রসুনের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩০ টাকা। আদা বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১১৫ টাকায়। ছোলার দাম বেড়ে কেজিতে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা হয়েছে। অ্যাংকর ডালের দাম বেড়ে ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা।
পাইকারি পর্যায়ে চিনি ও পাম অয়েলের দামও বেড়েছে। প্রতি মণ চিনি বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৫০০ টাকায়। পাম অয়েলের দাম ৫ হাজার ৯৯০ টাকা। সেমাইয়ের দামও বেড়ে মণপ্রতি ১ হাজার ৯৫০ থেকে ২ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এই মূল্যবৃদ্ধির বড় কারণ চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে জটিলতা। বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়া চ্যানেলে শতাধিক জাহাজ আটকা পড়ে আছে। বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এসব জাহাজে ৪৫ লাখ টনের বেশি ভোগ্যপণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি জাহাজে প্রায় ১২ লাখ টন রমজান-সংশ্লিষ্ট খাদ্যপণ্য আছে। আরও পাঁচটি জাহাজে রয়েছে দুই লাখ টনের বেশি চিনি।
স্বাভাবিক সময়ে সাত থেকে ১০ দিনে পণ্য খালাস সম্ভব হলেও লাইটার জাহাজের সংকটে এখন সময় লাগছে ২০ থেকে ৩০ দিন। অনেক জাহাজ দিনের পর দিন খালাস শুরুই করতে পারছে না। ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল জানায়, চাহিদার তুলনায় লাইটার জাহাজের সংখ্যা অনেক কম। এখানেও সিন্ডিকেটের সক্রিয়তার অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় এসব সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাই বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে প্রয়োজন শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও কঠোর বাস্তবায়ন।

