র্যাবে নিয়মিত টহল ও তথাকথিত ‘এনকাউন্টার’-এর পাশাপাশি একটি গোপন অভিযান চলত, যা ‘গলফ অপারেশন’ নামে পরিচিত ছিল। এই অভিযানে চোখ ও হাত বাঁধা, নোংরা ও দুর্বল পোশাক পরা আটক ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে খুব কাছ থেকে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হতো। একাধিক ঘটনায় লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান (পরে মেজর জেনারেল) নিজে গুলি করতেন এবং হত্যার পর উপস্থিত সদস্যদের ‘কীভাবে এই কাজ করতে হয়’ শেখাতেন। নিহতরা সবাই তরুণ বয়সী মনে হতো। তাদের চেহারা দেখে বোঝা যেত দীর্ঘদিন ধরে তারা আটক ও নির্যাতিত ছিলেন।
হত্যার পর প্রমাণ মুছে ফেলতে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করা হতো। কখনো লাশ রেললাইনে ফেলে দুর্ঘটনার মতো দেখানো হতো, কখনো সেতু বা ট্রলার থেকে নদীতে ফেলা হতো। আবার কখনো সিমেন্টের বস্তায় ভরে বুড়িগঙ্গায় নিক্ষেপ করা হতো। শব্দ কমানোর জন্য মাথায় পিস্তল চাপানো হতো, গভীর পানিতে ফেলার আগে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে দেওয়া হতো, কুশনের ভেতর দিয়ে গুলি বা পেট কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করা হতো।
এসব ঘটনা গুম-সংক্রান্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। শতাধিক গুম-খুনের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যালে শুরু হয়েছে।
এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, একাধিক অভিযানে এক রাতেই ধারাবাহিকভাবে বহু মানুষ হত্যা করা হয়েছে। লাশ গোপনে সরানোর সময় নির্মম ও পদ্ধতিগত কৌশল ব্যবহার করা হতো। এসব কাজকে র্যাবে ‘দায়িত্ব’ বা ‘দক্ষতা’ হিসেবে দেখানো হতো। যারা দ্বিধা দেখাত, তাদের ভর্ৎসনা করা হতো বা অপদস্থ করা হতো। এসব অপারেশনে অংশ নেওয়া অনেক সদস্যের মধ্যে মানসিক বিপর্যয় ও ট্রমার চিহ্ন দেখা গেছে।
এক ঘটনা বর্ণনা করে তিনি বলেন, একজন আটক ব্যক্তিকে মাইক্রোবাস থেকে নামানো হয়। চোখ ও হাত বাঁধা, পোশাক নোংরা। তাকে একটি ব্রিজের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জিয়াউল আহসান নিজ হাতে গুলি করেন। পরে চোখের পট্টি ও হাতের বাঁধন খুলে ব্রিজের রেলিং থেকে নিচে ফেলে দেন। এ সময় র্যাব ইন্টেলিজেন্সের অন্য সদস্যরা সহযোগিতা করেন। হত্যার পর জিয়াউল আহসান উপস্থিতদের তীব্র ভর্ৎসনা করেন এবং বলেন, “তোমরা কাপুরুষ। র্যাবে দায়িত্ব পালনের অযোগ্য। তোমরা সেনাবাহিনীর কলঙ্ক। শেখো কীভাবে কাজ করতে হয়।”
প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, নিহতদের সবকেই চোখ ও হাত বাঁধা ছিল। সবাই তরুণ ও দুর্বল দেখাচ্ছিল। পোশাক নোংরা ছিল এবং দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনপ্রাপ্ত মনে হচ্ছিল। তিনি আরও বলেন, একদিন তাকে গাড়ির পেছনের ট্রাংক খুলতে বলা হয়। চারপাশে অন্ধকার ও শীত। হাত ঢুকিয়ে তিনি দেখতে পান ঠান্ডা একটি লাশ। প্রথমে ভয়ে মনে হয় সাপ হতে পারে। পরে বুঝতে পারেন এটি একজন মানুষের লাশ। শরীরে হাফ হাতা গেঞ্জি ছিল। দৃশ্য দেখে তিনি আতঙ্কিত হয়ে যান।
লাশটি রেললাইনের পাশে রেখে গাড়িতে ওঠা হয়। সেখানে অন্যরা লাশটি টেনে রেললাইনের ওপর রাখে। ট্রেন এসে লাশটি কেটে যাওয়ার পর তারা সেখান থেকে চলে যান। প্রত্যক্ষদর্শী জানান, এরপর পাঁচ থেকে সাত দিন তিনি খেতে বা ঘুমাতে পারেননি। বারবার ভাবতেন, তিনি কী করেছেন এবং কীভাবে এর সঙ্গে মানিয়ে নেবেন।
আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়, জিয়াউল আহসান ও মেজর নওশাদ আলাদা লক্ষ্যবস্তু নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করেন। এক টার্গেটকে নগ্ন করে ব্রিজ থেকে পানিতে ফেলা হয়। সিগন্যাল অনুযায়ী র্যাবের চার সদস্য অতিরিক্ত সাহায্য করেন। একজন আগে থেকেই সিমেন্টের বস্তা বেঁধে রাখেন, একজন কুশনের মাধ্যমে মাথায় গুলি করেন, তৃতীয়জন পেট কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করেন এবং চতুর্থজন গভীরতা পরীক্ষা করেন। এরপর দেহ পানিতে ফেলা হয়।

