চলন্ত বাস, ট্রেন, হাসপাতালসহ বিভিন্ন জনসমাগমপূর্ণ স্থানে ধর্ষণের ঘটনা বাংলাদেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি, সমাজের গভীরে প্রোথিত নারীবিদ্বেষী মানসিকতা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকার অভাব।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে অন্তত ৭,০৬৮টি ধর্ষণ মামলা দায়ের হয়েছে, যেখানে ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫,৫৭০টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আরও বিস্তৃত চিত্র সামনে আসে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরের সময়টি দেখলে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৯,১৪৩টি ধর্ষণ মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
২০২৫ সালে মাসভিত্তিক ধর্ষণ মামলার সংখ্যা ছিল—
-
জানুয়ারি: ৪৭৩
-
ফেব্রুয়ারি: ৪৩৭
-
মার্চ: ৬২০
-
এপ্রিল: ৬৮৪
-
মে: ৬৩৬
-
জুন: ৬৩৪
-
জুলাই: ৬৮৮
-
আগস্ট: ৫৮৯
-
সেপ্টেম্বর: ৬৬৪
-
অক্টোবর: ৬৬৪
-
নভেম্বর: ৫৭৮
-
ডিসেম্বর: ৪০১
অন্যদিকে, ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল—
-
জানুয়ারি: ৩৬৫
-
ফেব্রুয়ারি: ৪৫৫
-
মার্চ: ৪৭৭
-
এপ্রিল: ৪৯৭
-
মে: ৫৯০
-
জুন: ৫৪৯
-
জুলাই: ৫৫৮
-
আগস্ট: ৩২৪
-
সেপ্টেম্বর: ৪৭৮
-
অক্টোবর: ৪৯৮
-
নভেম্বর: ৪১৬
-
ডিসেম্বর: ৩৬৩
সংখ্যাগুলো স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয়—সমস্যাটি শুধু রয়ে যায়নি, বরং আরও গভীর হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK) পত্রিকা ও নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ৭৪৯ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যেখানে ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪০১।
ASK-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ৭৪৯ জন ভুক্তভোগীর অন্তত ৩৭০ জনই ছিল ১৮ বছরের নিচে—যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার কথা। সামাজিক কলঙ্ক, ভয়, মামলা পরিচালনার দীর্ঘসূত্রতা—এসব কারণে বহু ভুক্তভোগী থানায় যেতে সাহস পান না।
১৫ জানুয়ারি ভোররাতে সভার থেকে আশুলিয়ার উদ্দেশে রওনা দেওয়া একটি বাসে ২৬ বছর বয়সী এক নারী ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন। পুলিশ জানিয়েছে, রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি সভার পরিবহনের বাসটিতে ওঠেন। তখন বাসে আরও দুজন যাত্রী ছিলেন।
অন্য যাত্রীরা নেমে যাওয়ার পর, বাসের চালক ও তার সহযোগীরা ওই নারীকে বাসের ভেতর আটকে রাখে। তারা তার স্বর্ণালংকার, টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। এরপর বাসটি বিভিন্ন এলাকায় ঘোরানো হয় এবং রাতভর তাকে ভয় দেখিয়ে বারবার নির্যাতন করা হয়। পুরো ঘটনার কিছু অংশ মোবাইলে ধারণ করার অভিযোগও উঠে এসেছে।
১২ জানুয়ারি ভোরে মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ থেকে আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়ার পথে অটোরিকশার ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে তিনি ও তার স্বামী হাসপাতালে আশ্রয় নেন।
সেখানে দায়িত্বরত দুই আনসার সদস্য সহায়তার আশ্বাস দিয়ে দম্পতিকে ভেতরে নেন। পরে স্বামীকে নিচে রেখে কিশোরীকে হাসপাতালের নতুন ভবনে নিয়ে গিয়ে ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন,
“দায়মুক্তির সংস্কৃতি, নারীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সরকারি সংস্থাগুলোর উদাসীনতাই ধর্ষণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ।”
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নারীবিদ্বেষী প্রচার বেড়েছে, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এর বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সম্মানীয় অধ্যাপক এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন,
“রাষ্ট্রের অরাজক পরিস্থিতি, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক শিক্ষা ধর্ষণ সংস্কৃতিকে উসকে দিচ্ছে।”
তিনি নারীবান্ধব পুলিশ ব্যবস্থা ও কার্যকর বিচার ব্যবস্থার ওপর জোর দেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিতি সঞ্জনা বলেন,
“নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামলার চাপে ন্যুব্জ। বিচার বিলম্বিত হওয়ায় অপরাধীরা সাহস পাচ্ছে।”
পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম দাবি করেন,
“ধর্ষণের ঘটনা বেশি মনে হচ্ছে কারণ এখন রিপোর্টিং বেড়েছে।”
তিনি আরও বলেন,
“সব মামলা পরবর্তীতে প্রচলিত ধর্ষণ হিসেবে প্রমাণিত হয় না।”
তবে মানবাধিকারকর্মীরা এই বক্তব্যকে বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন।
২০২৫ সালের মার্চে মাগুরায় আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলন হয়।
১৭ মে ২০২৫, ওই ঘটনায় প্রধান আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল।
তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—
একটির পর একটি ঘটনা, হাজারো মামলা, আন্দোলন, প্রতিবেদন—সবকিছুর পরও নারীরা কেন নিরাপদ নন?
আইনজীবী মিতি সঞ্জনার কথায়,
“নারীর প্রতি সহিংসতায় শূন্য সহনশীলতা ও নাগরিক সমতা নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।”

