জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা, সাধারণ ভোটারদের বিভ্রান্ত করে অজনপ্রিয় প্রার্থীদের জনপ্রিয় দেখানোর নানা চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। ভোটের দিন কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই তৎপরতা বেড়েই চলেছে। এতে শুধু প্রার্থীরাই নয়, বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন সরকারের দায়িত্বশীলরা ও বিভিন্ন বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও।
এ ধরনের অপতৎপরতা চালানো হয় বট বাহিনী ব্যবহার করে। বট মানে একাধিক স্বয়ংক্রিয় রোবট, যেগুলো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ব্যবহৃত হয়। সাধারণত সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানো, নির্দিষ্ট মত প্রচার বা ওয়েব প্রতিক্রিয়া ম্যানিপুলেট করতে বট ব্যবহার করা হয়।
সম্প্রতি একটি ভিডিওতে দাবি করা হয়, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলের ১৩ শীর্ষ নেতার মনোনয়ন বাতিল হয়েছে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই ঘোষণা করেছেন। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, এই তথ্য মিথ্যা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন এমন কোনো ঘোষণা দেননি। ভিডিওটি সাংবাদিক মাসুদ কামাল ও আইনজীবী মনিরুল ইসলামের আলাদা ভিডিও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছিল। তারপর বট বাহিনী ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে দিয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে আরও একটি পোস্টে দাবি করা হয়, মঞ্জুর মুন্সীর প্রার্থিতা আপিলে বাতিল হলে তার স্ত্রী নির্বাচনে অংশ নেবেন। তদন্তে দেখা যায়, এটি অসত্য। কুমিল্লা-৪ আসনে মোট আটজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। তফসিল অনুসারে প্রাথমিকভাবে মঞ্জুর মুন্সীসহ ছয়জনের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়। মঞ্জুর মুন্সীর প্রার্থিতা বাতিল হলে তাঁর স্ত্রীর নাম তালিকায় ছিল না।
কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের আরেক প্রার্থী জামায়াত-এনসিপি জোটের হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছাত্রনেতা। তাই মঞ্জুর মুন্সীকে কেন্দ্র করে পোস্টটি ভাইরাল হয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকের বক্তব্য দাবি করে একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, ইসলামী আন্দোলন জোটে আসতে চাইলেও আর নেবে না। কিন্তু এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফটোকার্ডটি ভুয়া। ফ্যামিলি কার্ডের নামে জনগণের এনআইডি সংগ্রহ করছে বিএনপি–এ ধরনের একটি ভিডিওও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। খোঁজে দেখা যায়, এটি অসত্য। আসলে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য সংগ্রহ ফর্ম বিতরণের ভিডিওকে বিকৃতভাবে দেখানো হয়েছে। গত ১০ দিনে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া বা বানোয়াট তথ্য ও ভিডিওগুলোর মধ্যে এগুলো উল্লেখযোগ্য।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর তানভীর হাসান জোহা বলেন, “বট শব্দটি রোবট থেকে এসেছে। রোবট স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে, বটও তাই। এটি প্রোগ্রাম অনুযায়ী কমেন্ট দেয়, লাইক/ডিসলাইক করে। ভোটের আগে এর প্রভাব মারাত্মক। বটের কারণে একজন প্রার্থীর জন্য বাস্তবের বাইরে ইতিবাচক বা নেতিবাচক আবহ তৈরি হতে পারে। সাধারণ ভোটার এতে প্রভাবিত বা বিভ্রান্ত হতে পারেন।”
তিনি আরও বলেন, “একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট সাধারণত একজন মানুষের। কিন্তু বটের অ্যাকাউন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। ভোটের আগে এসব আগ্রাসন বেড়ে যায়।”
বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, “একজনের নিয়ন্ত্রণে হাজার হাজার বট অ্যাকাউন্ট থাকতে পারে। নির্বাচনের সময় তারা প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে এবং অজনপ্রিয় প্রার্থীদের জনপ্রিয় দেখায়। এগুলোতে কোনো হিউম্যান টাচ থাকে না। সাধারণ ব্যবহারকারীদের এগুলো ব্লক করা উচিত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোরও আরও তৎপর হওয়া প্রয়োজন।”
মাঠ পর্যায়ে নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা তরুণ রাজনৈতিক কর্মীরাও এসব অপতথ্য সামলান। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ওমর ফারুক বলেন, “ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, বট বাহিনীর আগ্রাসন তত বাড়ছে। বিষয়গুলো বহুমাত্রিক। এটা শুধু রাজনৈতিক বা ধর্মীয় সীমাবদ্ধ নয়, সাধারণ জনগণও প্রভাবিত হচ্ছে। আগেভাগে প্রতিরোধ করলে অনেক ক্ষতি ঠেকানো সম্ভব। অপপ্রচার দেশভিত্তিক ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ঝুঁকি শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।”
তানভীর হাসান জোহা বলেন, ভোট যত ঘনিয়ে আসবে, বট বাহিনীর অপপ্রচার তত সংঘবদ্ধ ও আক্রমণাত্মক হবে। মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন রিয়েল-টাইম ফ্যাক্ট-চেকিং, সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় মনিটরিং ও স্বচ্ছ এনফোর্সমেন্ট। পাশাপাশি নাগরিকদের ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানোই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অপতথ্যের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আস্থার সংকট বাড়বে। নিয়ন্ত্রণহীন সোশ্যাল মিডিয়া নির্বাচন ও গণতন্ত্রকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বট বাহিনী ঠেকানোর সরাসরি কোনো মন্ত্র নেই। এআইভিত্তিক গুজব ভোটের সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠছে।

