শত বছরের ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজার দেশের সর্ববৃহৎ ভোগ্যপণ্যের বাজার হলেও বর্তমানে চরম আস্থাহীনতার মধ্যে রয়েছে। পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর গড়ে ওঠা এই মোকাম এখন বিপুল প্রতারণার কারণে ভীত ও অসহায়।
গত ১৬ বছরে অন্তত ৩০ জন বড় ব্যবসায়ী এই বাজার থেকে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে দেশ ছেড়ে গেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনা না ঘটলেও বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি দুই থেকে তিন বছর অন্তর বড় প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জৌলুস হারানো এ বাজার এখন মামলার স্তূপ ও হতাশার চিহ্নে ভরা। আমদানিকারক ও পাইকারদের মধ্যে ব্যাংক কেলেঙ্কারি, খেলাপি ঋণ, ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) ও সিøপ বাণিজ্যের আড়ালে বড় অঙ্কের জালিয়াতি ঘটেছে। এর ফলে কয়েকশ ব্যবসায়ী পথে বসেছেন, যা দেশের ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। আনুমানিক ৬০–৭০ শতাংশ ব্যবসায়ী পুরোপুরি ব্যবসা বন্ধ করেছেন। ২০–২৫ শতাংশ সীমিত পরিসরে পুনরায় ব্যবসা শুরু করেছেন। ৫–১০ শতাংশ পেশা পরিবর্তন করেছেন।
এক সময়ের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী মনোরঞ্জন সাহা এখন ব্রোকার হিসেবে চট্টগ্রামের অলিগলিতে কাজ করছেন। পণ্য বিক্রির পাওনা ১৫ কোটি টাকা ফেরত না পেলেও ৯ কোটি টাকার দেনা শোধ করতে নিজের বহুতল ভবন বিক্রি করতে হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন সততার সঙ্গে ব্যবসা করে গড়ে তোলা সম্পদ এক প্রতারণার কারণে শেষ হয়ে গেছে।
আরেক ভুক্তভোগী আবু সাঈদ চৌধুরী সম্রাট জানান, পদ্মা স্টোরের মালিক নুরুল আবছার তার ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। আদালত এক বছরের সাজা এবং তিনগুণ টাকা ফেরতের নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু আদায় হয়নি। মোহাম্মদ ইউনুচ জানান, আয়ান ট্রেডিংয়ের ৬০ কোটি টাকা আত্মসাতের কারণে তিনি নিঃস্ব হয়ে গেছেন।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন ও ভুক্তভোগীদের তথ্যমতে, গত ১৬ বছরে বাজার থেকে প্রতারণা করে পালানো ব্যবসায়ীদের তালিকা ভয়াবহ। ইয়াসিন এন্টারপ্রাইজের মালিক মোজাহের হোসেন প্রায় ৪০০ কোটি টাকা হাতিয়ে বর্তমানে কানাডায় বিলাসী জীবনযাপন করছেন।
নুরজাহান গ্রুপও খাতুনগঞ্জ থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়েছে। ব্যাংক ঋণ নেওয়ার জন্য নতুন কোম্পানি খুলে কয়েক বছরের মধ্যে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির উদ্দিন রতন ৬ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণের মামলার পর গ্রেপ্তার হয়েছেন ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর।
নূর ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী নাজিম উদ্দিন প্রায় ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। চৌধুরী ব্রাদার্সও ডিও বাণিজ্যের নামে ১০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। পদ্মা স্টোর মালিক নুরুল আবছার ৬৪ কোটি, আয়ান ট্রেডিং মালিক সরওয়ার ৬০ কোটি, শফি ট্রেডার্সের জামাল উদ্দিন ৫৫ কোটি, মা ট্রেডিংয়ের জগন্নাথ মিত্র ৫০ কোটি, শাহজাহান ট্রেডার্স ২৫ কোটি, এয়াকুব অ্যান্ড সন্স ২৫ কোটি, ফরহাদ ব্রাদার্স ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে পালিয়েছে। এছাড়া অন্তত ৩০টি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানও এই লুণ্ঠনে জড়িত।
সূত্র অনুযায়ী, ২০০৮–২০২৪ পর্যন্ত সম্ভাব্য ক্ষতি ১ হাজার ২০০–১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে। ৩০–৪০ শতাংশ পুরনো ব্যবসায়ী দীর্ঘ সুনাম ব্যবহার করে বড় অঙ্কের ডিও নিয়েছেন। নতুন ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী রেফারেন্সে দ্রুত লেনদেনে ঢুকেছেন।
খাতুনগঞ্জে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। চাল, ডাল, তেল, চিনির মতো পণ্যের মূল হাতিয়ার হলো ডিও। তবে গত ১৫ বছরে এর অপব্যবহার বেড়েছে। অনেক ব্যবসায়ী কেবল কাগজের ডিও বিক্রি করে প্রতারণা করেছেন। তারা প্রথমে নগদ লেনদেনে আস্থা অর্জন করে, পরে বৃহৎ অঙ্কের বাকি নিয়ে চেক পাসের আগে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে পালিয়ে যান।
প্রতারণার পেছনে আইনি কাঠামোর দুর্বলতা, ব্যাংক ও কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাব, ব্যবসায়ী সংগঠনের দ্বৈত ভূমিকা এবং দ্রুত মুনাফার লোভ দায়ী। বিকল্প নিরাপদ ট্রেডিং মডেলের অভাবও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার কল্যাণ সমিতির সহসভাপতি মো. খোরশেদ আলম বলেন, ডিওভিত্তিক ব্যবসায় অনেকেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। মুহাম্মদ আলতাফ এ গাফ্ফার জানান, অসাধু ব্যবসায়ীরা পরিকল্পিতভাবে প্রতারণা চালান।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আমিনুর রহমান বলেন, নুরজাহান গ্রুপ, চৌধুরী ব্রাদার্স, পদ্মা স্টোর, আয়ান ট্রেডিংসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান শতকোটি টাকা নিয়ে পলাতক। কিছু টাকা পরিশোধ হলেও কমিটিতেও অনিয়ম হয়েছে। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, অনেক মামলা হয়েছে কিন্তু দৃশ্যমান বিচার হয়নি। রায় পেলেও টাকা ফেরত পাননি।

