সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) নিজস্ব ডাটা সেন্টার নির্মাণে রাষ্ট্রের প্রায় ৭৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ক্ষতিসাধনের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ উদ্যোগ নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে আলাদা ডাটা সেন্টার নির্মাণের মাধ্যমে অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ নষ্ট করা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের প্রায় ৭৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে কমিশনের ধারণা। এ ঘটনায় ডেসকোর সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কাউসার আমীর আলী এবং প্রধান প্রকৌশলী শামীম আহসান চৌধুরীকে দায়ী করা হয়েছে। গত ২২ জানুয়ারি দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে তাদের আসামি করে মামলা দায়ের করেন দুদকের উপসহকারী পরিচালক হাবিবুর রহমান।
দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন এ বিষয়ে ঢাকা পোস্টকে বলেন, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। তারা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রজ্ঞাপন অমান্য করেন। সরকারি নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা ছিল, আইসিটি বিভাগের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো মন্ত্রণালয় বা সংস্থা নতুন করে আলাদা ডাটা সেন্টার নির্মাণ করতে পারবে না। একই সঙ্গে সব সরকারি তথ্য সরকারের সেন্ট্রাল ডাটা সেন্টারে সংরক্ষণ করতে হবে। এসব নির্দেশনা অমান্য করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অনুসন্ধানে প্রমাণ মিলেছে। এ কারণেই কমিশনের অনুমোদনক্রমে মামলা করা হয়েছে।
অনুসন্ধান প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, সরকারের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ডেসকো নিজস্ব ডাটা সেন্টার নির্মাণে প্রায় ৭১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রথমে দরপত্র আহ্বান করে। ২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় সিদ্ধান্ত হয়, কোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা সংস্থা নতুন প্রকল্পে ডাটা সেন্টার নির্মাণ করতে পারবে না। যেসব প্রকল্পে এ খাতে বাজেট বরাদ্দ রয়েছে, তা ফেরত দিতে হবে। সব সরকারি ডাটা সরকার পরিচালিত সেন্ট্রাল ডাটা সেন্টারে সংরক্ষণ করতে হবে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ২০২১ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রজ্ঞাপন জারি করে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের লক্ষ্যে ২০২০ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ‘বাংলাদেশ ডাটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড (বিডিসিসিএল)’ নামে সরকারের নিজস্ব সেন্ট্রাল ডাটা সেন্টার চালু করা হয়। তবে এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করে ডেসকো ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিল নিজস্ব ডাটা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। সে সময় প্রায় ৭১ কোটি ৭৮ লাখ ৪ হাজার ৮৮৬ টাকা ব্যয়ে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে অসন্তোষ সৃষ্টি হলে ২০২২ সালের ৮ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে কালিয়াকৈরের জাতীয় ডাটা সেন্টারে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ওই সভায় সরকারি প্রজ্ঞাপন অমান্য করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ডাটা সেন্টার নির্মাণের প্রবণতা নিয়ে আলোচনা হয়। পরে ২০২২ সালের ১২ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ই-গভর্নেন্স-১ অধিশাখা থেকে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিবদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে পুনরায় নির্দেশনা দেওয়া হয়, আইসিটি বিভাগের পূর্বানুমোদন ছাড়া কোনো সংস্থা নতুন করে ডাটা সেন্টার নির্মাণ করতে পারবে না।
দুদকের মতে, ডেসকোর এই দরপত্র সরকারি সিদ্ধান্তের সরাসরি লঙ্ঘন। এর ফলে সরকারি অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ নষ্ট হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের ৭৪ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯২ টাকা ক্ষতিসাধন হয়েছে। এ ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

