কুপ্রবৃত্তির অনুসরণে মনুষ্যত্বের বিনাশ” — এ নীতিকথা এখনও আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত। লোভ, প্রতারণা ও ধোঁকাবাজির বশবর্তী মানুষ প্রায়ই এমন কর্মকাণ্ড করে যা অন্য কোনো জীবের মধ্যে দেখা যায় না। পশু-পাখি একে অন্যকে হত্যা করে শুধুমাত্র উদরপূর্তির জন্য বা অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। কিন্তু মানুষই একমাত্র প্রাণী, যারা স্বজাতির ক্ষতি করে নিছক ব্যক্তিস্বার্থে। এখানে বাস্তুসংস্থান বা প্রাকৃতিক ভারসাম্যের কোনো প্রশ্ন থাকে না। থাকে শুধু লোভ, লিপ্সা এবং স্বার্থপরতা।
বহু সময় দেখা যায়, এক শ্রেণির মানুষ অন্যদের এমনভাবে ক্ষতিসাধন করে যা সম্পূর্ণভাবে মনুষ্যত্ববর্জিত। যেমন প্রবাদে বলা হয়, “দো পেয়ে দৈত্য” — মানুষের হাতেই মানুষের ক্ষতি ঘটে।
পত্রিকায় প্রায়শই চোখে পড়ে ‘পার্টি কালচার’ সংক্রান্ত নানা কাহিনী। বিশেষ কিছু পার্টি যেমন অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি প্রতিদিন অনেক যাত্রীকে সর্বস্বান্ত করছে। এ পার্টির সদস্যদের দৌরাত্ম্য বহু পুরনো। তারা নৌ, সড়ক এবং রেলপথে নানা কৌশলে সক্রিয় থাকে। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট এবং পঞ্চগড়-ঢাকা রেলরুটে তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, স্টেশনগুলোতে এই পার্টির সদস্যরা ওত পেতে বসে থাকে। ট্রেন ছাড়ার পর তারা যাত্রীদের সঙ্গে প্রথমে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে, গল্প শুরু করে। এরপর চকলেট, শরবত, আচার বা ডাব খাওয়ায় যাত্রীদের অচেতন করে ফেলে। এর পর যা হয়, তাই ঘটে — যাত্রীর সর্বস্ব কাড়ে নেয় তারা। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন রুটে অনেক যাত্রী এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের সুকৌশলপূর্ণ কথাবার্তা এবং বিনয়ী আচরণ যাত্রীদের বশে আনে এবং ক্ষতি করে।
ট্রেন আমাদের যাত্রাপথের অন্যতম প্রধান বাহন। সুবিধা ও সাশ্রয়ী ভাড়ার কারণে বিপুলসংখ্যক যাত্রী প্রতিদিন ট্রেনে ভ্রমণ করে। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে রেল পুলিশ পার্টির অপতৎপরতা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক যাত্রীও যথেষ্ট সচেতন নয়। এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে অজ্ঞান ও মলম পার্টি। পুলিশ বারবার যাত্রীদের অন্যের দেওয়া খাবার গ্রহণ না করতে সতর্ক করছে। তবুও অনেক যাত্রী ভুলবশত খাবার গ্রহণ করে ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
ডিজিটাল যুগেও পার্টি কালচারের এ অপতৎপরতা অজানা নয়। পুলিশ জানাচ্ছে, ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ কম করে। তাই মানুষকে নিজের নিরাপত্তায় সচেতন হওয়া এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
উন্নত দেশে এমন পার্টি কালচার অকল্পনীয়। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে এটি যেন ‘চিরস্থায়ী প্রবণতা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রেল, সড়ক এবং নৌপথে পার্টির সদস্যরা সক্রিয়। উৎসবের সময় তারা আরও তৎপর হয়। আসন্ন রমজানের পর পবিত্র ঈদুল ফিতরে নতুনভাবে তারা ছক কষছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাদের নিয়ন্ত্রণে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে, নজরদারি বাড়াতে হবে। সবশেষে, যাত্রীদের সচেতনতা এ অপসংস্কৃতি বন্ধ করার একমাত্র উপায়।

