বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দী-সোনাতলা) সংসদীয় আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও ওকে গ্রুপের চেয়ারম্যান কাজী রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ ঋণখেলাপির অভিযোগ উঠেছে। দলীয় সূত্র ও ব্যাংক-নথি অনুযায়ী, তিনি ও তার মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বেসরকারি তিন ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধ না করায় খেলাপির পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার বেশি।
এর মধ্যে শুধু এক্সিম ব্যাংকে ওকে গ্রুপের তিনটি কোম্পানির নামে ৫২৩ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি রয়েছে। অন্য দুই ব্যাংকে তার খেলাপি ঋণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। একই সময়ে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর একটি সূত্র জানায়, গত বুধবার বিকালে ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য কাজী রফিকুল ইসলামের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)-এর সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার ওকে গ্রুপকে ব্যবহার করে নিজের ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ পাস করিয়ে নিজের অর্ধেক অংশ নিয়েছেন। ফলে ওকে গ্রুপের ঋণ আবেদন সাধারণত সহজেই অনুমোদিত হতো। জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে নাসা গ্রুপ ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার গ্রেফতার হন। তবু বিএনপি নেতা হওয়ার সুবাদে কাজী রফিকুল ইসলাম প্রভাব খাটিয়ে ঋণ ফেরত না দিয়ে, বিচারাধীন ঋণ থাকলেও, বগুড়া-১ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হন।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের মতে, কাজী রফিকুল ইসলাম এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ায় শুরুতে দলের কর্মীদের মধ্যে উৎসাহ ছিল। কিন্তু ঋণখেলাপির তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় সেই উৎসাহ দ্রুত কমতে শুরু করেছে। অনেক নেতাকর্মীর অভিযোগ, বিপুল ঋণখেলাপির বিষয়টি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন না করেই তিনি মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কাজী রফিকুল ইসলামের মালিকানাধীন তিন প্রতিষ্ঠান—ওকে এন্টারপ্রাইজ, ওকে ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ও ওকে প্রোপার্টিজ—এর নামে এক্সিম ব্যাংকে সুদসহ ৫২৩ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই ঋণ পরিশোধ করছেন না তিনি।
তাছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকেও ওই তিন প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি আছে। সদ্য একীভূত সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকেও একই প্রতিষ্ঠানের ২০০ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি রয়েছে। ব্যাংক সূত্র জানায়, এসব ঋণের সুদ ও অন্যান্য চার্জ যোগ হয়ে মোট দায় ৮০০ কোটি টাকার বেশি হয়ে গেছে।
ব্যাংকিং বিধি অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না হলে ঋণগ্রহীতাকে খেলাপি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর ব্যাংকরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক একাধিক মামলা দায়ের করেছে, তবে পুনঃতফসিল বা সমঝোতার মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তি হয়নি। শুধু হাইকোর্ট থেকে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা (স্টে অর্ডার) পাওয়া হলেও, ব্যাংক কর্তৃপক্ষের খেলাপি ঘোষণা ও আদালতে মামলা থাকলে ঋণগ্রহীতা ঋণখেলাপি হিসেবে গণ্য হন।
অতীতের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে ওকে গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজী রফিকুল ইসলাম ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকার ঋণ নেন, যা পরিশোধ না হওয়ায় সুদ বাড়তে থাকে। একই ব্যাংকের গুলশান শাখায় তিনি আরও একটি বড় ঋণ নেন। এক্সিম ব্যাংকের ঋণ একজন প্রয়াত আবদুল মান্নানের নামে নেওয়া হলেও, কাজী রফিকুল ইসলাম গ্যারান্টার হিসেবে যুক্ত ছিলেন। ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা, যা দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি রয়েছে। বর্তমানে এই ঋণের পুনঃতফসিলের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) ডাটাবেসেও নেতিবাচকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
বগুড়া জেলা বিএনপির একাধিক নেতা, নাম প্রকাশ না করার শর্তে, মন্তব্য করেছেন যে নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এ ধরনের বিতর্ক দলকে বিব্রত করতে পারে। তারা আশঙ্কা করছেন, ঋণখেলাপি কারণে দল সাংগঠনিক ও কৌশলগতভাবে বড় ধাক্কা খেতে পারে। নির্বাচনী কৌশল ও দলীয় ভাবমূর্তির জন্য এই অভিযোগ অবহেলা করা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বগুড়া-১ আসনে বিএনপি প্রার্থীর বিপুল ঋণখেলাপি অভিযোগ শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এটি দলীয় রাজনীতি ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক পরীক্ষা। নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও আইনি যোগ্যতা নিয়ে কঠোর অবস্থান নিলে ভোটারদের কাছে প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে। তবে বিতর্কিত প্রার্থীকে মাঠে নামালে দলীয় ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বড় অঙ্কের ঋণখেলাপি থাকা সত্ত্বেও কাজী রফিকুল ইসলাম তার নির্বাচনী হলফনামায় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ২৬১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং এক্সিম ব্যাংকে ৪৮৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা দায় উল্লেখ করেছেন। বার্ষিক আয় হিসেবে তিনি জানিয়েছেন ৪ কোটি ৮১ লাখ ১৮ হাজার ২০৩ টাকা। ব্যবসা ও বাড়ি ভাড়া থেকে ব্যক্তিগত আয় হিসেবে ৩০ লাখ টাকা উল্লেখ করেছেন।
এই বিষয়ে কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, “ওকে গ্রুপের ঋণ বিষয়ে এত বিস্তারিত আমি কিছু বলতে পারব না। ব্যাংক আইন অনুযায়ী মামলার বিষয়ে আপিল করা হয়েছে।” সিআইবি রিপোর্ট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার সিআইবি রিপোর্ট ক্লিয়ার আছে।”
‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর চেয়ারম্যান আইয়ূব মিয়া জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য সংশ্লিষ্ট গ্রাহক বা কোম্পানি ব্যাংক কোম্পানি আইন মেনে প্রশাসকের কাছে আবেদন করতে হয়। এরপর প্রশাসক আইন অনুযায়ী ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেন। সূত্র: শেয়ার বিজ

