ভোলার চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নামে হাজার কোটি টাকার কাজ অবৈধভাবে ভাগাভাগি এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগের মূল নেপথ্যে রয়েছেন ভোলা-চরফ্যাশন ও মনপুরা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব।
দুদক জানিয়েছে, জ্যাকব ভাণ্ডারিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলামের লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান ‘ইফতি ইটিসিএল (প্রা.) লিমিটেড’-এর লাইসেন্স ব্যবহার করে হাজার কোটি টাকার কাজ অবৈধভাবে ভাগ নিয়েছেন এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। এই অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে কি না, মানি লন্ডারিংয়ের দিক থেকেও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন দুদকের পিরোজপুর জেলার উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম। একই সময়ে, মিরাজুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে কাজ না করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গত বছরের ২৪ এপ্রিল দুদক সাবেক সংসদ সদস্য জ্যাকবের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে মামলা দায়েরের অনুমোদন দিয়েছিল। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তার নামে ১৩ কোটি ৯৮ লাখ ৯ হাজার ৯২৯ টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে যা তার আয়ের সঙ্গে মিলছে না।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, জ্যাকব বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে মোট ৮৫ কোটি ৬৯ লাখ ৩০ হাজার ৪১৯ টাকা স্থানান্তর ও রূপান্তর করেছেন, যা সন্দেহজনক লেনদেন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া তার স্ত্রী নিলীমা নিগার সুলতানার নামে ৩ কোটি ২৮ লাখ ৬৪ হাজার ৪৫ টাকার সম্পদ রয়েছে। যথাযথভাবে সম্পদ বিবরণী না দাখিলের কারণে তার বিরুদ্ধে দুদক নোটিশ জারি করেছে।
দুদক সূত্রে আরও জানা যায়, মিরাজুল ইসলামের লাইসেন্স ব্যবহার করে ভোলা-চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের ওয়ার্কঅর্ডার নেওয়া হয়। এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, জ্যাকব লাইসেন্স ব্যবহার করে কাজ ভাগাভাগি করতেন, এবং এই লাইসেন্স ছাড়া ঠিকাদাররা প্রকল্পের কাজ পেতেন না। একাধিক প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে।
অবৈধ কাজের তালিকায় ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মনপুরা ও চরফ্যাশনের বিভিন্ন নোটিশ নম্বরের প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার কাজের ওয়ার্কঅর্ডার জ্যাকব ও তার সহযোগীরা নিয়েছেন। ২৯ জানুয়ারি পিরোজপুরের দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলাগুলো দায়ের করা হয়। মামলার বাদী দুদকের সহকারী পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম, এবং মামলার তদারকি করছেন উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম।
দুদকের এজাহারে বলা হয়েছে, সাবেক চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলাম তার আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ প্রায় ৯৯ কোটি ১২ লাখ ৮৭ হাজার টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। তার সম্পদে রয়েছে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, দোকান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক হিসাব, শেয়ার বিনিয়োগ এবং ৯টি গাড়ি। এর বিপরীতে বৈধ আয়ের উৎস মাত্র ১৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
এছাড়া মিরাজুল ইসলামের স্ত্রী শামীমা আক্তারের বিরুদ্ধে প্রায় ২৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকার সম্পদ অর্জন ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি ‘মেসার্স শিমু এন্টারপ্রাইজ’-এর প্রোপ্রাইটর হিসেবে কাজ নিয়ে বাস্তবে তা না করে অর্থ আত্মসাত করেছেন। ১২৩ কোটি টাকা স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে অবৈধ অর্থের উৎস গোপনের চেষ্টা করা হয়েছে।
দুদকের পিরোজপুর জেলা উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমরা ইফতি ইটিসিএল লাইসেন্স ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তদন্ত চালাচ্ছি। কোথায় কোথায় লাইসেন্সের অপব্যবহার হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হবে। সাবেক এমপি জ্যাকবের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাত ও মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টি অনুসন্ধান করা হবে।”
এদিকে জ্যাকব জেলহাজতে থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি। তবে এলজিআরডির চলতি নির্বাহী প্রকৌশলী ইমদাদুল হক নিশ্চিত করেছেন, বিগত দিনে ইফতি ইটিসিএল নামে বিপুল পরিমাণ কাজ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগেও মিরাজুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে পিরোজপুর দুদক কার্যালয় থেকে ৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যা বর্তমানে তদন্তাধীন।

