রাজধানী ঢাকায় গত এক বছরে ঘটে যাওয়া সব আলোচিত হত্যাকাণ্ডের পেছনে সক্রিয় ছিলেন ভাড়াটে খুনি। পুলিশ জানিয়েছে, এসব হত্যাকাণ্ডে মূল পরিকল্পনাকারীরা টাকার বিনিময়ে খুনিকে কাজে লাগিয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, রাজধানীতে এখন পর্যন্ত মোট ৪০১ জন ভাড়াটে শুটার বা খুনি শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের নামের তালিকাও তৈরি করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ডিএমপির আটটি অপরাধ বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খুনি শনাক্ত হয়েছে মতিঝিল বিভাগে, ১১৮ জন। ওয়ারী বিভাগে ৭৩ জন, তেজগাঁওয়ে ৬১ জন, মিরপুরে ৬০ জন, রমনাতে ৩৬ জন, লালবাগে ২৪ জন, গুলশানে ১৬ জন এবং উত্তরায় ১৩ জন। অধিকাংশের বিরুদ্ধে ১০ থেকে ৪৩টি মামলা আছে এবং তারা নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন করে।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত বছরের ২১ মার্চ গুলশানে ব্রডব্যান্ড ব্যবসায়ী সুমন মিয়া ওরফে টেলি সুমনকে হত্যায় ভাড়াটে খুনি ব্যবহার করা হয়েছিল। পরের মাসে পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে দোকানে ঢুকে হত্যা করা হয়। কিবরিয়া হত্যায় গ্রেপ্তার প্রধান আসামি জনি ভূঁইয়ার স্বীকারোক্তিতে বলা হয়েছে, এটি পরিকল্পনা করা হয়েছিল বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী মফিজুর রহমান মামুনের নির্দেশে। হত্যাকাণ্ডটি বাস্তবায়ন করেছে দুবাই থেকে দেশে আসা পাতা সোহেল ওরফে মনির হোসেনসহ কয়েকজন পেশাদার ভাড়াটে।
ডিবির (ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মহিউদ্দিন মাহমুদ সোহেল জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত এখনও চলছে। আরও কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে শিগগিরই অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। ডিবি জানায়, রাজধানীতে গত এক বছরে আরও কয়েকটি লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- ২৫ মে মধ্য বাড্ডায় গুলশান থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুল আহসান সাধন,
- ৮ জানুয়ারি কারওয়ান বাজারে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির,
- ২১ মার্চ গুলশানে সুমন মিয়া,
- ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন,
- ১১ ডিসেম্বর শ্যামবাজারে মসলা ব্যবসায়ী আবদুর রহমান ভূঁইয়া।
সব হত্যাকাণ্ডই ভাড়াটে শুটারদের হাতে সংঘটিত হয়েছে। সুমন মিয়া হত্যার নির্দেশদাতা ছিলেন বাড্ডা-গুলশান এলাকার সন্ত্রাসী মেহেদী। তাঁর নেতৃত্বে ওয়াসির মাহমুদ সাঈদ ওরফে বড় সাঈদ, বিল্লাল ও মামুনসহ চার-পাঁচজনের একটি দল গুলি চালায়।
স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মুছাব্বির হত্যার নির্দেশ দেন ‘দীলিপ ওরফে বিনাশ’ নামের শীর্ষ সন্ত্রাসী। এ ঘটনায় পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবির প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় দুই শুটার রহিম ও জিন্নাত, যারা টাকার বিনিময়ে কাজ করেছিল।
ডিএমপি জানিয়েছে, রাজধানীতে এখন পর্যন্ত ৪০১ জন ভাড়াটে শুটার শনাক্ত করা হয়েছে। অধিকাংশের বিরুদ্ধে ১০–৪৩টি মামলা রয়েছে। তারা নির্দিষ্ট এলাকায় থাকেন না, বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান পরিবর্তন করে কাজ সম্পন্ন করে। তালিকাভুক্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- ভাষানটেকের রূপচাঁদ মিয়া – ৪৩টি মামলা,
- বাবুল – ৩৪টি মামলা,
- ভাগিনা তুষার – ২২টি মামলা,
- মন্টু জাহাঙ্গীর – ২০টি মামলা,
- বুকপোড়া সুজন – ১৯টি মামলা।
ক্রিমিনোলজি বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ উমর ফারুক বলছেন, “ভাড়াটে খুনিদের নেটওয়ার্ক ভেঙে না দিলে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা কঠিন।” ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, অপরাধীদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তারে কাজ চলছে। ইতিমধ্যে কয়েকজনকে ধরাও হয়েছে।

