রাজধানীতে আবার সক্রিয় হচ্ছে কিশোর গ্যাং। কয়েকদিনে শিশু হত্যাসহ ব্যবসায়ীদের মারধরের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডিএমপি সব থানা পুলিশকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এম নজরুল ইসলাম বলেন, “কিশোর গ্যাং দীর্ঘদিনের সমস্যা। তাদের নিয়ন্ত্রণে নতুন অভিযান শুরু হয়েছে। অপরাধীদের নিয়মিত আটক ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সম্প্রতি আদাবরে চাঁদাবাজির ঘটনায় পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়েছে।”
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে হাজার হাজার অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও ধর্ষণ। এই সময়ে পাঁচ হাজারের বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক করা হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, কিশোরদের অপরাধ দেশের জন্য বড় সামাজিক হুমকি। লেখাপড়ার বয়সে তারা হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে জড়াচ্ছে। ছিনতাই, চুরি, মাদক কারবার ও ধর্ষণেও তাদের সম্পৃক্ততা বেড়েছে।
ডিএমপির একাধিক থানার কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কিশোর গ্যাং এলাকায় মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত। এদের নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নতুন অভিযান চালাচ্ছে।
রাজধানীর অন্তত ৩৫টি থানার তথ্য অনুযায়ী, কিশোরদের বড় অংশ ‘গ্যাং কালচারে’ যুক্ত। অভিযান চললেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। ডিএমপি সদর দপ্তর বলেছে, প্রতিটি থানা এলাকায় একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারি পৃথক তথ্যভাণ্ডার না থাকলেও বিভিন্ন সংস্থা জানাচ্ছে, ২০২২ সালে দেশে ১৭৩টি কিশোর গ্যাং ছিল। ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২৩৭টি। রাজধানীতে এখনও সক্রিয় ১২৭টি গ্যাং। এরা বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় ছোট-বড় গ্রুপে অপরাধ চালায়। স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতাও এদের সঙ্গে যুক্ত।
এই গ্যাংগুলো ইভ টিজিং, ছিনতাই, চুরি, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও হত্যাকাণ্ডে জড়াচ্ছে। দেশের অন্য এলাকায়ও পরিস্থিতি প্রায় একই রকম। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের ২৩৭টি কিশোর গ্যাং এখনও সক্রিয়।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছেন, “চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক প্রতিরোধে মাঠ পর্যায়ের পুলিশকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বাভাবিক আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।” তিনি এই নির্দেশনা দিয়েছেন দেশব্যাপী সব পুলিশ ইউনিট, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলা পুলিশ সুপারদের সঙ্গে ভার্চুয়াল সভায়।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৬৯ শতাংশ কিশোর অপরাধী দারিদ্র্য, পারিবারিক অবহেলা ও সামাজিক সমস্যা কারণে অপরাধের পথে আসে। মাদক, পর্নোগ্রাফি, উগ্রতা, লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি ও অপরাধপ্রবণতা কিশোরদের আরও অপরাধ প্রবণ করে।
আদাবরে চাঁদাবাজি হামলা:
গত শনিবার আদাবরে একটি এমব্রয়ডারি কারখানায় কিশোর গ্যাং হামলা চালায়। চাঁদা না পেয়ে কয়েকজন শ্রমিককে কুপিয়ে আহত করে। আদাবর থানার সামনের সড়কে স্থানীয়রা রাত ১০.৩০ মিনিটে সন্ত্রাসীদের বিচারের দাবি জানায়। পরে যৌথ বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ডিএমপির মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী কমিশনার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “মূল অভিযুক্ত রাসেল ও তার সহযোগীসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে।”
এমব্রয়ডারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রায়হান জহিরের ভাতিজা জানিয়েছেন, শনিবার সন্ধ্যায় দেশীয় অস্ত্রসহ ১০-১২ জন কিশোর গ্যাং হামলা চালায়। ঈদকে সামনে রেখে তারা আগাম চাঁদা দাবি করেছিল। চাঁদা না দেওয়ায় শ্রমিকরা আহত হয়।
পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে জানিয়েছে, হামলাকারীরা আগে থেকেই কারখানার ওপর নজর রাখছিল। এলাকায় আরও অন্তত সাতটি কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয়।
সিসি ক্যামেরার উদ্যোগ:
মোহাম্মদপুর ও আদাবরে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে ৫৫০টি সিসি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-১৩ আসনের সংসদ সদস্য ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, বিএনপি বা সরকারদলীয় পরিচয়ে কাউকেও অপরাধ করতে দেওয়া হবে না।
যাত্রাবাড়ীতে শিক্ষার্থী হত্যা:
শুধু চাঁদাবাজি নয়, যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় একটি শিক্ষার্থীকে ছুরি মেরে হত্যা করেছে কিশোর গ্যাং। নিহত মাহিম মিয়া (১৫) স্থানীয় মাদরাসার ছাত্র। যাত্রাবাড়ী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হাফিজুল ইসলাম বলেন, কিশোর মাহিম মিয়া হত্যার ঘটনায় স্থানীয় কিশোর গ্যাং গ্রুপের সদস্যরা জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের ধরতে অভিযান চলছে।

