দেশজুড়ে পরিবহন খাতে ‘শ্রমিক কল্যাণ ফান্ড’-এর নামে নিয়মিত বিপুল অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করা হয়। তবে পরিবহনশ্রমিকরা অভিযোগ করছেন, এই তহবিলের প্রকৃত সুফল তাদের কাছে পৌঁছায় না। তাদের দাবি, তহবিলের হিসাব-নিকাশ স্বচ্ছ নয় এবং বড় অংশ সংগঠনের নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে।
কল্যাণ তহবিলের নিয়মিত চাঁদার পাশাপাশি নানা খাতে অঘোষিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, চাঁদার কারণে আইন ভঙ্গসহ অপরাধমূলক ঘটনা ও রক্তক্ষয়ী সহিংসতা বাড়ছে। মহাসড়কে এই চাঁদাবাজি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম চাঁদার বিষয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, মালিক ও শ্রমিক সমিতি সমঝোতার ভিত্তিতে অর্থ তোলা হলে তাকে চাঁদাবাজি বলা যায় না। জোরপূর্বক অর্থ আদায় হলে তা চাঁদাবাজি হিসেবে গণ্য হবে। মন্ত্রীর এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ও বিভিন্ন মহলে সমালোচিত হয়েছে। পরিবহনশ্রমিকরা বলছেন, নির্ধারিত চাঁদার বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়। সময়মতো অর্থ পরিশোধ না করলে গাড়ি আটকে রাখা ও অন্যান্য হয়রানির শিকার হতে হয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম জানান, “টার্মিনালে নেওয়া অর্থ পরিচালনার খরচ মেটানোর জন্য। তবে সড়কে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঘটনা থাকলে তা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে আমরা একমত।” তিনি আরও বলেন, “৫ আগস্টের পর থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো কল্যাণ তহবিল নেওয়া হচ্ছে না। অন্য কোথাও তহবিলের নামে অর্থ তোলা হলে তার দায় আমাদের নয়।”
যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “মন্ত্রীর বক্তব্য পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদের আনুকূল্য প্রদানের উদ্দেশ্য হতে পারে। এটি গ্রহণযোগ্য নয়।“ তিনি আরও উল্লেখ করেন, সড়কে বিভিন্ন যানবাহন থেকে প্রতি বছর অনৈতিকভাবে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়।
পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৯ লাখের বেশি বাণিজ্যিক যানবাহন থেকে বছরে ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি চাঁদা তোলা হয়। অনানুষ্ঠানিক অর্থের কোনো নির্দিষ্ট হিসাব নেই।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে নজরদারি সংস্থা টিআইবির একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএ, মালিক-শ্রমিক সংগঠন এবং স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা এই অর্থের ভাগ পান। অনেক ক্ষেত্রে কল্যাণ তহবিলের নামে নেওয়া টাকার লিখিত রসিদ বা বার্ষিক হিসাব শ্রমিকদের দেখানো হয় না।
চাঁদা আদায়ের পদ্ধতি:
সারা দেশে পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বিভিন্ন মাত্রায় চলছে। রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী টার্মিনাল থেকে বাস ছাড়ার সময় টার্মিনাল টোল, শ্রমিক কল্যাণ, মসজিদ বা ধর্মীয় খাত, চেইন মাস্টার, কলার বয় ও মালিক সমিতি ফিসসহ বিভিন্ন নামে ২০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও লেগুনা সার্ভিস থেকেও প্রতিদিন ৫০ থেকে ১৫০ টাকা ‘লাইন খরচ’ নেওয়া হয়। দূরপাল্লার যাত্রায়ও বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ চালকেরা জানিয়েছেন।
রাজশাহীর শিরোইল বাস টার্মিনাল ও ভদ্রা কাউন্টারে শ্রমিক ইউনিয়নের নামে বাসপ্রতি ৬২০ টাকা এবং মালিক সংগঠনের নামে ২২০ টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শ্রমিকদের এক সূত্র জানিয়েছে, আদায় করা পুরো অর্থ কল্যাণ তহবিলে জমা হয় না। তবে রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম পাখি দাবি করেছেন, এই অর্থ শ্রমিক কল্যাণ ও সার্ভিস ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়।
চট্টগ্রামের শাহ আমানত সেতু মোড় এলাকা থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রামমুখী বাস ও মিনিবাসের কাছ থেকে গাড়িপ্রতি ১২০ টাকা চাঁদা নেওয়া হয়। থ্রি-হুইলার ও অটোটেম্পো থেকেও ‘ওয়েবিল’ ও লাইন খরচের নামে বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়। নতুন ব্রিজ মোড় থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত (১৭ নম্বর) রুটেও উল্লেখযোগ্য চাঁদার অভিযোগ রয়েছে। ফরিদপুরে বিভিন্ন পয়েন্টে বাস ও ট্রাক থেকে ১০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও কুমিল্লায়ও টার্মিনাল টোল, চেইন মাস্টার বা স্ট্যান্ড ইজারার নামে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
মালিক-শ্রমিকদের মন্তব্য:
এই বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহনশ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আবদুর রহিম বক্স দুদু বলেন, “মালিকেরা কল্যাণ তহবিলের নামে যে টাকা তোলেন, তা বাস্তবে শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যবহার হয় না। যেটুকু দেওয়া হয়, তা সীমিত এবং মূলত মালিকদের সুবিধার জন্য। চাঁদার অর্থ মূলত মালিকদের আত্মীয়স্বজন বা উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের কাছে চলে যায়। শ্রমিক মারা গেলে বা অসুস্থ হলে দেওয়া অর্থও সীমিত। ঢাকার বাইরে সাধারণত এই সুবিধা পাওয়া যায় না। তাই কল্যাণ তহবিল শ্রমিকদের কাজে আসে না।” আবদুর রহিম বক্স আরও বলেন, “সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। অনেক রুটে আগের মতোই তা চলছে।”
অন্যদিকে, বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি এবং শ্যামলী এন আর ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ বলেন, “বড় পরিবহন প্রতিষ্ঠান হিসেবেও আমরা নিয়মিত চাঁদাবাজির ভুক্তভোগী। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল, নওগাঁ, বগুড়া ও বরিশাল অঞ্চলে বেশি অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। রাজধানীর ভেতরে মহাখালী ও সায়েদাবাদ এলাকায় এ ধরনের ঝামেলা তুলনামূলকভাবে বেশি।”
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) দেলোয়ার হোসেন মিঞা জানান, “মহাসড়কে চাঁদাবাজির কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। কোথাও এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আইনের অবস্থান:
বাংলাদেশে পরিবহনখাতে চাঁদাবাজির দীর্ঘদিনের সমস্যা শুধু কার্যকর নজরদারি ও শ্রমিক কল্যাণের অভাবের সঙ্গে নয়, আইনগত ফাঁকের সঙ্গেও জড়িত। সড়ক পরিবহন আইনের ৩৮ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার বা অনুমোদিত সংস্থা গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে টার্মিনাল উন্নয়ন ও পরিচালনা করতে পারবে এবং নির্ধারিত টার্মিনাল চার্জ আরোপ করতে পারবে। তবে ওই নির্ধারিত চার্জ ছাড়া টার্মিনাল, সড়ক বা মহাসড়কে কোনো পরিবহন যান থেকে অর্থ আদায় আইনসম্মত নয়।
২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চাঁদার নির্দিষ্ট অঙ্ক নির্ধারণ করে নতুন একটি খসড়া নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছিল, পরিবহন মালিক সমিতি থেকে সর্বোচ্চ ৪০ টাকা, শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে ২০ টাকা এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা তোলা যাবে। যদি কোনো টার্মিনালে শ্রমিক কমিটি থাকে, আলোচনা সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৭০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা যাবে।
তবে বিরোধিতার কারণে ওই নীতিমালা সরকারি অনুমোদন পায়নি। এরপরও মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নামে ৭০ টাকা চাঁদা তোলা অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন খাতেও নতুন চাঁদা যুক্ত হয়ে অর্থ আদায়ের অস্বচ্ছ ব্যবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সমস্যার প্রতিকার সংক্রান্ত পর্যবেক্ষকের মন্তব্য:
পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি দীর্ঘদিনের সমস্যা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক বলছেন, এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। তিনি আরও বলেন, “চাঁদাবাজি মূলত রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রশাসনের নীরব সমর্থনের কারণে গড়ে উঠেছে। যদিও সমস্যার সমাধান সম্ভব, তা সম্পূর্ণরূপে সরকারের ও উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। চাঁদাবাজি নির্মূল হলে পরিবহন ব্যবস্থা অনেক পরিচ্ছন্ন ও নিয়ন্ত্রিত হবে।”
অধ্যাপক শামসুল হকের বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, সমস্যার মূল কারণ শুধু অর্থের অভাব নয়; প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাব চাঁদাবাজিকে বৈধতার ছদ্মবেশ দিয়েছে। তাই দীর্ঘমেয়াদী সমাধানও রাজনৈতিক ইচ্ছা ও কার্যকর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া সম্ভব নয়।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “কঠোর জিরো টলারেন্স নীতি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাই মূল সমাধান। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে দ্রুত মামলা ও দৃশ্যমান শাস্তি, টার্মিনালে সরকারি নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।”
চাঁদাবাজি নির্মূলের জন্য একটি সমন্বিত পদ্ধতি প্রয়োজন। শুধু আইন থাকলেই হবে না; সরকারের সক্রিয় নজরদারি, পুলিশি কার্যকর ব্যবস্থা এবং টার্মিনাল ও রুটে স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা কমাতে পারে।

