নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপোতে যমুনা অয়েল কোম্পানির প্রায় সোয়া লাখ লিটার ডিজেল উধাও হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করতে গঠিত ছিল বিপিসির (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) একটি কমিটি। দুই মাস আগে কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলেও, বিপিসি বা যমুনা অয়েল এখনও সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
প্রতিবেদনটি অনুযায়ী, ক্যালিব্রেশন কোম্পানি মিথ্যা ক্যালিব্রেশন রিপোর্টের মাধ্যমে তেল চুরির প্রাথমিক প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। পাশাপাশি যমুনা অয়েলের সিবিএ নেতার দৌরাত্ম্য, সিডিপিএল প্রকল্পে অটোমেশন প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং কর্মকর্তাদের গাফিলতির চিত্রও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিষয়টির তিন পর্বের ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হয়েছে আজ।
সাধারণ কর্মচারী থেকে কোটিপতি:
এক সময় যমুনা অয়েলে দারোয়ান হিসেবে কাজ করতেন মো. রফিক। তাঁর ছেলে জয়নাল আবেদীন টুটুল নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের কুতুবপুর ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। রফিকের মৃত্যুর পর টুটুল ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ পদ্ধতিতে ক্যান্টিনে দৈনিক ৫৫ টাকায় চাকরি শুরু করেন।
২০০৫ সালে তিনি চতুর্থ শ্রেণির সাধারণ কর্মচারী হিসেবে স্থায়ী হন। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে গেজার (অপারেটর) পদে নিযুক্ত হন। গেজারের কাজ হলো তেলের পরিমাণ নিরূপণ করা—কখনও তামা বা লোহার কাঠি দিয়ে, কখনও যন্ত্র ব্যবহার করে।
গেজার পদে নিযুক্ত হওয়া মাত্রই টুটুলের আর্থিক অবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি শত কোটি টাকার মালিক হন। ২০১৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে নারায়ণগঞ্জে তার ছয়তলা বাড়িটি সবার নজর কাড়েছিল। বাড়িটি ব্রাজিলের পতাকার রঙে মুড়ে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি বাংলাদেশের জন্য ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতও বাড়িটি দেখতে এসেছিলেন। কর্মস্থল নারায়ণগঞ্জে, সরকারি দলের সুবিধা কাজে লাগিয়ে টুটুল তার বিশাল সম্পদ গড়ে তোলেন।

ফতুল্লা ডিপোর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি জয়নাল আবেদীন টুটুলের হাতে চলে আসে। যমুনা অয়েলের সিবিএ কার্যকরী সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি নিজেকে ডিপোর সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রভাবে, ডিপোয় যেসব অনিয়ম হয়, সেগুলো দেখে মুচলেকা দেন প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ—এতে যোগ দেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে বিপিসির চেয়ারম্যানরাও।
তবে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর টুটুল কর্মস্থলে গাঢাকা দেন। কিন্তু পুরোনো প্রভাবের কারণে শারীরিকভাবে না গেলেও তার নিয়মিত হাজিরার রেকর্ড ডিপোয় বজায় থাকে। ফতুল্লা ডিপোতে সোয়া লাখ লিটার তেল উধাও হওয়ার ঘটনায় টুটুলের নাম সরাসরি উঠে এসেছে। নিজে সেখানে উপস্থিত না হলেও পুরো ডিপো তার নিয়ন্ত্রণে থাকে। টুটুলের নিজস্ব অফিস রয়েছে ডিপোয়, যেখানে বসেই সিসিটিভির মাধ্যমে ডিপোর সব কার্যক্রম তদারকি করেন।
অভিযোগ আছে, ফতুল্লা ডিপোয় অনিয়মের বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে বিপিসির অনীহা এবং যমুনা অয়েল প্রশাসনের অব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে টুটুলই সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করেছেন।
তদন্ত কমিটিকে কর্মকর্তাদের সরাসরি বক্তব্য:
বিপিসির তদন্ত কমিটিকে দেওয়া বক্তব্যে যমুনা অয়েলের ফতুল্লা ডিপোর কর্মকর্তা (অপারেশন) ইমরান হোসাইন জানান, জয়নাল আবেদীন টুটুল পাম্প হাউজ পরিচালনা করেন। ২২ নম্বর ট্যাংকে একটি রিসিভিং, একটি আইটিটি (ইন্টার ট্যাংক ট্রান্সফার) এবং একটি কোস্টাল ট্যাংকারে ডেলিভারি লাইন রয়েছে। ২২ নম্বর ট্যাংকের ক্যালিব্রেশন ডিপো সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন টুটুল।
ট্যাংকের মজুত, ডেলিভারি ও রিসিভিংয়ের হিসাবও তার তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। ডিপোয় অস্থায়ীভিত্তিতে নিযুক্ত বেশিরভাগ কর্মী টুটুলের নিয়ন্ত্রণে। তিনি সার্বক্ষণিক ডিপো মনিটরিং এবং নিয়ন্ত্রণে থাকেন।
মিটারিং স্টেশনে স্থাপিত মিটারের লিভার নষ্ট থাকায় তেল স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরবরাহ হয় না এবং কর্মকর্তাদের সেখানে ঘন ঘন যাতায়াত করা হয় না। মিটারগুলো টুটুলের নির্দেশনা অনুযায়ী ইলেকট্রিশিয়ান খোলেন এবং রক্ষণাবেক্ষণ করেন। সাধারণ কর্মকর্তাদের তা নিয়ে বিস্তারিত অবহিত করা হয় না। জেটি পয়েন্টে ডেলিভারিও টুটুলের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
ডিপোর অস্থায়ী গেজার মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, সিডিপিএল থেকে ডিজেল গ্রহণের সময় তিনি দায়িত্বরত ছিলেন। এর আগে তিনি প্রায় ৯-১০ বছর ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ করেছেন। পরে টুটুলের সুপারিশে গেজার পদে দায়িত্ব পান। তিনি ট্যাংকের ডিপ গ্রহণের পর তা মৌখিকভাবে টুটুল ও ডিপো সুপারকে জানাতেন।
ফতুল্লা ডিপোর মিটারম্যান মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, তিনি ২০০০ সালে ক্যান্টিনে টি-বয় হিসেবে যোগদান করেন এবং ২০০৫ সালে স্থায়ী হন। ২০১৩ সালে মিটারম্যান হিসেবে কাজ শুরু করেন। তবে মিটারিং পয়েন্টে কার্যকর প্রশিক্ষণ তার ছিল না। তিনি উল্লেখ করেন, মিটারগুলোতে থাকা স্বয়ংক্রিয় লিভারটি নষ্ট রাখা হয়েছে, যা তিনি ২০১৩ সাল থেকে লক্ষ্য করছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর টুটুল শারীরিকভাবে ডিপোয় উপস্থিত না হলেও নিয়ন্ত্রণ সবসময় তার হাতেই রয়েছে। টুটুলের গ্রামীণফোন নম্বরের ৩৯ দিনের (২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে ৮ সেপ্টেম্বর) কললিস্ট যাচাই করে দেখা গেছে, মোবাইলের অবস্থান পুরো মাস জুড়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়—বসুন্ধরা, ভাটারা, বারিধারা, কুড়িল, গুলশাল, খিলক্ষেত, বনানী, মিরপুর, তেজগাঁও, এলিফ্যান্ট রোড, নিকুঞ্জ, বংশাল, বাদামতলী, আরমানিটোলা—এবং একবার নারায়ণগঞ্জের কাঞ্চন পৌরসভায়। ফতুল্লা ডিপোতে অবস্থান না থাকলেও টুটুল নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন অন্যান্য ডিপোর ম্যানেজার, ডেপুটি ম্যানেজার এবং ফতুল্লা ডিপোতে তেল আনাচারী ট্যাংকারদের সঙ্গে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যমুনা অয়েলের কয়েকজন কর্মকর্তা জানাচ্ছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জয়নাল আবেদীন টুটুল ফতুল্লা ডিপোয় শারীরিকভাবে হাজিরা দেননি। তবে ডিপোর কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় গুলশানের বাসা থেকেই অফিসের হাজিরা খাতা পরিচালনা করেছেন। বাসায় বসেই তিনি প্রতি সপ্তাহে হাজিরা খাতায় সাইন করেছেন এবং নিয়মিত বেতন-ভাতাও তুলেছেন। টুটুলের নিয়ন্ত্রণ শুধু হাজিরায় সীমাবদ্ধ নয়। যমুনা অয়েলের চার্টারে চলাচলকারী অয়েল ট্যাংকারগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও রাখেন তিনি।
এক সময় ক্যান্টিন বয় থেকে শুরু করা টুটুল আজ ফতুল্লা ডিপোর পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখেন। ‘ব্রাজিল বাড়ি’ নামেও পরিচিত তার বিশাল ছয়তলা বাড়িটি তখন নারায়ণগঞ্জে সবার নজর কাড়ে। কললিস্ট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর দুপুর ১টার দিকে টুটুল খুলনা দৌলতপুর ডিপোর ডেপুটি ম্যানেজার সনৎ বড়ুয়ার সঙ্গে দুই দফায় মোট ৬ মিনিটের বেশি কথা বলেছেন। বিষয়টি সনৎ বড়ুয়া স্বীকার করেছেন, তবে কী কথা হয়েছে, সেটা জানাননি।
টুটুল শুধু ডিপোরই নিয়ন্ত্রণে নেই; চার্টারে চলা জাহাজের সঙ্গে যোগাযোগও তার হাতেই। ৩০ আগস্ট রাতে এবং ২২ আগস্ট বিকেলে ‘এমটি নুরজাহান-১’ জাহাজের সুপারভাইজার মো. কাইয়ুমের সঙ্গে ফোনালাপ হয়েছে। এছাড়া ‘এমটি অমিত’ জাহাজের সুপারভাইজার আবদুল হাইয়ের সঙ্গে ২৫ আগস্ট দুপুর ও সন্ধ্যায় দুবার কথা হয়েছে। আবদুল হাই প্রথমে ফোনালাপ অস্বীকার করলেও কললিস্টের তথ্য জানানো হলে তিনি বলেন, “হয়তো জাহাজ আনলোডের বিষয়টি জানতে চেয়েছি। এমনি অফিসারদের সঙ্গে কথা বলি।”
গত বছরের ১৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ব্রাজিল বাড়িতে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে জয়নাল আবেদীন টুটুল পলাতক ছিলেন। যমুনা অয়েল ফতুল্লা ডিপোর নথিপত্রে দেখা গেছে, টুটুলের হাজিরা ও স্বাক্ষর রয়েছে। তবে দুদকের অভিযানের সময় তাকে অফিসে পাওয়া যায়নি এবং ওই দিনের হাজিরা খাতার স্বাক্ষরও মেলেনি। সহকর্মীরাও জানিয়েছেন, তিনি ছুটিতে ছিলেন, তবে কোনো ছুটির আবেদন দেখাতে পারেননি।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ‘ব্রাজিল বাড়ি’ নির্মাণের জমি টুটুলের বাবার নামে, প্রায় চার একর। দেড় দশক আগে ওই জমিতে দুই ইউনিটের ছয়তলা ভবন নির্মাণ করা হয়, যার ব্যয় আনুমানিক দেড় কোটি টাকার বেশি। বাড়ির পাশের নিজের কেনা পাঁচ একর জমিতে তিনি একটি ডুপ্লেক্স নির্মাণ করেছেন, যেখানে টুটুলের ব্যক্তিগত অফিস রয়েছে। দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়েছে, টুটুল ও তার স্ত্রীর নামে রয়েছে দুটি জাহাজ, দুটি ট্যাংক লরি, একটি প্রিমিও প্রাইভেটকার। এছাড়া তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীতেও রয়েছে একতলা পাকা ভবন।
বিপিসির তদন্তেও প্রমাণ পাওয়া যায়, টুটুল ফতুল্লা ডিপোতে প্রভাব বিস্তার ও বদলি-পদায়নের বিষয়ে জড়িত ছিলেন। এ কারণে টুটুলসহ অন্যান্য মিটার রিডার ও গেজারদের বদলির বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালককে সুপারিশ করা হয়। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক, বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) মো. জাহিদ হোসাইন বলেন, “আমাদের তদন্তে ফতুল্লা ডিপোতে টুটুলের প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছি এবং এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছি।”
টুটুলের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে বহুবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। খুদেবার্তা দিলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে তদন্ত কমিটিকে দেওয়া বক্তব্যে টুটুল দাবি করেছেন, ১৯৯৭ সালে তিনি ফতুল্লা ডিপোতে যোগদান করেন, ২০১০ সালে গেজার পদে পদোন্নতি পান।
টুটুল বলেন, “সিডিপিএলে লোকসানের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ক্যালিব্রেশন চার্টে ভুলের দায় ডিপো সুপারের। তবে সুপার সব তদারকি করতে পারেন না, তাই ভুল হতে পারে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, পাওয়ার প্ল্যান্টে তেল সরবরাহের জন্য আলাদা লাইন ও পাম্প হাউজ রাখা হয়েছে, যা ঘণ্টায় ২ লাখ লিটার তেল ডেলিভারি করতে সক্ষম।
যমুনা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদ বলেন, “আমরা এজিএম নিয়ে ব্যস্ত আছি। পরে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সূত্র:জাগো নিউজ

