দেশের সড়ক পরিবহন খাতে শ্রমিক সংগঠনগুলোর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট, তবে মালিক সংগঠনগুলোর হিসাব ধন্দজনক। দেশের সবচেয়ে বড় শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন, যা দেশের ২৫৩টি ইউনিয়নকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
অন্যদিকে মালিক সংগঠনগুলোর সংখ্যা বা কাঠামো নির্দিষ্টভাবে জানা নেই। কেন্দ্রীয়ভাবে তিনটি মূল মালিক সংগঠন কার্যক্রম চালাচ্ছে—বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি, বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি। দেশের প্রতিটি জেলায় এই সংগঠনগুলোর আরও একাধিক শাখা থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।
এর বাইরে রয়েছে অযান্ত্রিক যানবাহন যেমন ঠেলাগাড়ি, রিকশা-ভ্যান এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি নসিমন, করিমন পরিবহনের জন্য আলাদা আলাদা সংগঠন। শ্রম মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে সড়ক পরিবহন খাতে মালিক ও শ্রমিকসহ মোট ৯৩২টি সংগঠন রয়েছে। এই সংগঠনগুলোর আয়ের প্রধান উৎস হলো পরিবহন থেকে সংগৃহীত চাঁদা। সংগঠনগুলো দাবি করে, এই অর্থ ব্যবহার করা হয় সংগঠন পরিচালনা ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা চালাতে। তবে খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ব্যয় আদায়কৃত চাঁদার তুলনায় খুবই নগণ্য।
দেশের সড়ক পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠন ছাড়াও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং কিছু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত বলে একাধিক গবেষণা ও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
পরিবহন খাতের মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো সারা দেশে কত টাকা আদায় করে তার সঠিক হিসাব নেই। তবে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন এ খাতে প্রায় ২ কোটি ২১ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। এর বড় অংশই মালিক-শ্রমিক সমিতির নামে আদায় হয়। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, দেশের সব বাণিজ্যিক পরিবহন চলতে হয় চাঁদা দিয়ে। মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, পরিবহনভেদে দৈনিক চাঁদা ১০ টাকা থেকে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠে। আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রমিক সংগঠনগুলো ৩০ টাকা এবং মালিক সংগঠনগুলো ৪০ টাকার হারে চাঁদা তোলার কথা জানিয়েছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এই চাঁদা তোলা বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন মালিক-শ্রমিক নেতারা।
মালিক-শ্রমিক নেতাদের দাবি, আদায়কৃত চাঁদার টাকা ব্যবহার করা হয় পরিবহন ব্যবস্থাপনা, সংগঠন পরিচালনা এবং নেতাদের সম্মানীর জন্য। কিন্তু খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদায়কৃত চাঁদার তুলনায় এই ব্যয় নগণ্য। অধিকাংশ চাঁদা কোনো দৃশ্যমান খাতে খরচ হয় না; বরং তা নেতাদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয় এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদেরও অংশ দেওয়া হয়।
দেশের শ্রমিক সংগঠনের প্রায় সব কার্যক্রম পরিচালিত হয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন-এর আওতায়। জানা গেছে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা শাজাহান খান দীর্ঘদিন এই সংগঠনে একক নিয়ন্ত্রণ রাখতেন। তবে আওয়ামী লীগের পতনের পর সংগঠনটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন বিএনপিপন্থী শ্রমিক নেতারা।
বর্তমানে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আব্দুর রহিম বক্স। তিনি বলেন, “ইউনিয়ন পরিচালনার জন্য আমরা ৩০ টাকা এবং ফেডারেশনের নির্ধারিত চাঁদার হার ১০ টাকা। বাস থেকে আমরা এই টাকা তুলতে পারলেও, ট্রাক থেকে পাঁচ বছর ধরে তুলতে পারছি না।”
চাঁদার অর্থ কোথায় ব্যয় হয়—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, “শ্রমিক নেতাদের সম্মানী আছে, সংগঠন পরিচালনার খরচ আছে। ফেডারেশন চালাতে মাসে ৮-৯ লাখ টাকা লাগে। তবে দেড় বছরের বেশি হলো ফেডারেশনের জন্য চাঁদা তোলা বন্ধ আছে। এখন বলতে গেলে আমরা ভর্তুকি দিয়ে সংগঠন চালাচ্ছি।”
পরিবহন শ্রমিক সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে ধরা হলে তিনি বলেন, “আমরা মাত্র ১০ টাকা বা ৩০ টাকা চাঁদা তুলি। সড়কের মূল চাঁদাবাজি হচ্ছে মালিক সমিতির নামে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, খুলনা থেকে কুষ্টিয়াগামী ১০০ মাইলের একটি রুটে মালিক সমিতি আপ-ডাউনে প্রায় ৩ হাজার টাকা করে নেন। এ বিশাল অংকের টাকা শ্রমিক ফেডারেশন নয়, মালিক সমিতি আদায় করছে। শুধু খুলনা-কুষ্টিয়া নয়, দেশের সব রুটে এমন চাঁদা তোলা হচ্ছে।”
দেশের পরিবহন খাতের মালিকদের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগঠন হলো বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। আওয়ামী লীগ শাসনামলে এ সংগঠনের শীর্ষ নেতা ছিলেন এনা পরিবহনের মালিক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ। তবে আওয়ামী লীগের পতনের পর নেতৃত্ব নিয়েছেন বিএনপিপন্থী পরিবহন মালিক হিসেবে পরিচিত সাইফুল আলম।
মালিক সমিতির বিরুদ্ধে সড়কে মোটা অংকের চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সংগঠনটির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, “অভিযোগটি সত্য নয়। সড়কে চাঁদা তোলার বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার জন্য পরিবহন কোম্পানিগুলোকে কিছু অর্থ ব্যয় করতে হয়। প্রতিটি কোম্পানির অফিস স্টাফ, ওয়ে বিল, টিকেটিং, কাউন্টার মাস্টার, সিরিয়াল ম্যান, গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীসহ বিভিন্ন খাতের খরচ থাকে। এ টাকা পরিবহন থেকে সংগৃহীত হয় এবং কোম্পানি ও মালিক পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে খরচ পরিচালনা করেন। এটি কোনোভাবেই চাঁদাবাজি নয়।”
দূরপাল্লার পরিবহনের ক্ষেত্রে ‘স্টার্টিং’ ও ‘এন্ডিং’ পয়েন্ট ছাড়া মালিক সমিতির নামে আর কোনো টাকা তোলা হয় না বলে তিনি জানান। “একটা ইন্ডাস্ট্রি চালাতে খরচ তো থাকে। আমরা সেই খরচের টাকা গাড়ি থেকে সংগ্রহ করি।” সাইফুল আলম আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে মালিক সমিতির নামে সব ধরনের চাঁদা আদায় বন্ধ রয়েছে। “অতীতে সমিতির নামে ইচ্ছামতো চাঁদাবাজি করা হয়েছে। এখন দেশে নির্বাচিত সরকার এসেছে, তাই আমরা আলোচনা করে সমিতির জন্য চাঁদার একটি নির্দিষ্ট হার ঠিক করতে চাই।”
এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুধুমাত্র ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে প্রায় ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদা তোলা হয়। এ চাঁদার একটি অংশ আদায় করে মালিক-শ্রমিকরা। অন্য একটি শীর্ষ মালিক সংগঠন বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। যশোর ও সাতক্ষীরা ছাড়া এ সংগঠনের জেলাভিত্তিক অন্য কোনো শাখা নেই। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও শ্যামলী এন আর ট্রাভেলস-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ দাবি করেছেন, তাদের সংগঠন কোনো পরিবহন থেকে টাকা বা চাঁদা নেয় না।
যদিও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি চাঁদা তোলা বন্ধ রেখেছে এবং বাস ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন পরিবহন থেকে কোনো টাকা তুলছে না, তবুও সড়কে টাকার লেনদেন চলছে—এমন প্রশ্নের জবাবে শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ বলেন, “শ্রমিক ফেডারেশন বা মালিক সমিতি নয়; টাকা তুলছে ভুঁইফোঁড় কিছু সংগঠন। এসবের কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই, কিন্তু তারা খুব ক্ষমতাশালী। আমি গতকাল গাবতলীর দারুস সালাম মোড়ে দেখলাম, ছোট গাড়ি থেকে হঠাৎ একজন ব্যক্তি এসে টাকা নিয়ে গেল। সে কার নিয়োগকৃত তা আমরা কিছুই জানি না। সারা দেশেই এমন ঘটনা ঘটছে। সাধারণ মালিকরা এ ধরনের ঘটনার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।”
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলে দেশের সড়ক পরিবহন খাতে প্রভাবশালী ছিলেন সাবেক নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার এনায়েত উল্লাহ এবং জাতীয় পার্টির নেতা মশিউর রহমান রাঙ্গা। আওয়ামী লীগের পতনের পর পরিবহন খাতে প্রভাব দেখা যাচ্ছে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস-এর।
চাঁদাবাজির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে শিমুল বিশ্বাস বলেন, “আমি প্রায় চার দশক ধরে পরিবহন খাতে কাজ করছি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অবৈধ চাঁদাবাজি। এটি মালিক-শ্রমিকরা করেন না; টাকা তুলেন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।”
তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ ছোট্ট দেশ, বিরাট জনসংখ্যা। এখানে পরিবহনের বিশৃঙ্খলা আমাদের সবাইকে কষ্ট দেয়। এটা জাতীয় সমস্যা, আমাদের সবাইকে মিলে যার সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশের পরিবহন সেক্টরকে আরো জনবান্ধব করতে হবে। এখানে কোনো রকম বিশৃঙ্খলা, জনদুর্ভোগ যেন না থাকে সেজন্য কাজ করতে হবে। আর চাঁদাবাজির বিষয়টা তো আমরা ৫ আগস্টের (২০২৪) পর অফিশিয়ালি বন্ধ রেখেছি। এখন যেগুলো হয়, সেটা আমার নলেজের (জানার) বাইরে। আমি এগুলোর ঘোর বিরোধী।

