দেশে সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে মাদকের ধরন। চোরাকারবারিরা ধারাবাহিকভাবে নতুন নতুন মাদক এনেছে। গত আট বছরে এ প্রবণতা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এই সময়ে দেশে ঢুকেছে ১২ ধরনের নতুন মাদক। একই সঙ্গে নতুন কৌশলে এসেছে হেরোইন ও কোকেনের চালান।
মাদকের ধরন বদল, বদলেছে সেবনকারীর প্রবণতা:
মাদকের রূপ বদলের সঙ্গে বদলেছে সেবনকারীদের আচরণ। আশির দশকের শুরুতে এক প্রজন্ম হেরোইনে আসক্ত ছিল। পরে তারা ফেনসিডিলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ১৯৮০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত হেরোইন ও ফেনসিডিল সমানভাবে মাদকজগতে জায়গা ধরে রাখে। এ দুটি নিস্তেজকারক মাদক। একুশ শতকের শুরুতে নতুন মাদক হিসেবে আসে ইয়াবা। তখন অনেকেই এতে আসক্ত হয়ে পড়ে। এখনও ইয়াবা তার অবস্থান ধরে রেখেছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে প্রভাব বজায় রেখেছে। ২০২১ সাল থেকে ইয়াবার বাজারে জায়গা নিতে চেষ্টা করছে ক্রিস্টাল মেথ বা আইস।
১৯৫০ সাল থেকে দেশে মাদকের প্রবেশ, উৎস, পথ, বিস্তার এবং সেবনকারীদের আচরণগত পরিবর্তন নিয়ে অনুসন্ধান করা হয়।
স্বাধীনতার আগে ও পরের মাদকের চিত্র:
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৫০ সাল থেকে স্বাধীনতার পরও দেশে প্রধান মাদক ছিল গাঁজা, আফিম, দেশি মদ, ভাং ও তাড়ি। স্বাধীনতার পর গাঁজা ও আফিম উৎপাদন এবং বিক্রির জন্য সরকারি লাইসেন্স নিতে হতো। নির্দিষ্ট দোকানে এসব বিক্রি হতো। স্বাধীনতার পর বাজারে আসে মৃতসঞ্জীবনী সুরা নামে আয়ুর্বেদিক সিরাপ। এটি ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও পরে মাদক হিসেবে অপব্যবহার হয়। ১৯৭৫ সালের দিকে সরকার এটি বন্ধ করে দেয়। ১৯৮৭ সালে গাঁজা উৎপাদন নিষিদ্ধ করা হয় এবং ১৯৮৯ সালে বিক্রি বন্ধ করা হয়। এর আগে ১৯৮৪ সালে আফিম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। গাঁজা নওগাঁয় চাষ হতো এবং আফিম আসত ভারত থেকে। আফিমের ব্যবহার কম হলেও গাঁজা এখনও বাজারে টিকে আছে।
আশির দশকে হেরোইনের বিস্তার:
হেরোইন আগে থেকেই কিছুটা ব্যবহৃত হলেও আশির দশকে এর বিস্তার ঘটে। এটি ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসে। একই সময়ে সীমান্তপথে ভারত থেকে ফেনসিডিল আসতে শুরু করে। নব্বইয়ের দশকে ফেনসিডিলের সরবরাহ ও ব্যবহার বাড়ে। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত হেরোইনই ছিল জনপ্রিয় মাদক। এরপর ফেনসিডিলের জনপ্রিয়তা বাড়লে হেরোইনের চাহিদা কমতে থাকে। একই সময়ে আসে ইনজেকটিং ড্রাগ বুপ্রেনরফিন। এটিও ভারত থেকে আসে।
ইয়াবার উত্থান ও আইসের আগমন:
একুশ শতকের শুরুতে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আসা শুরু হয়। ২০০৭ সালের পর এর বিস্তার দ্রুত বাড়ে। তখন ফেনসিডিল ও হেরোইনের চাহিদা কমে যায়। তবে এগুলোর ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ২০১০ সালের দিকে আইস আসতে শুরু করলেও তখন বাজারে প্রভাব ফেলতে পারেনি। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম আইস জব্দ হয়। ২০২০ সাল থেকে এর ব্যবহার বাড়তে থাকে।
অভিযানের মধ্যেও নতুন মাদকের প্রবেশ:
‘চল যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ স্লোগানে ২০১৮ সালের ৪ মে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু হয়। কিন্তু সেই সময়েই দেশে নতুন মাদক ঢুকতে থাকে। ২০১৮ সালের পর থেকে ১২ ধরনের নতুন মাদক শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এমডিএমবি, আইস, এলএসডি, এমডিএমএ, ডিএমটি, ডিওবি, ম্যাজিক মাশরুম, কিটামিন, কুশ, ট্যাপেন্টাডল ও ট্রামাডল। এসব মাদক ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে ডাকযোগে পার্সেল হয়ে আসে।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে টেকনাফে নতুন ধরনের হেরোইন উদ্ধার হয়। এটি চ্যাপ্টা ও জমাট আকারে ছিল। পরীক্ষায় জানা যায়, এটি সাধারণ পাউডারের তুলনায় অন্তত ১০ গুণ শক্তিশালী। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো ব্ল্যাক কোকেন পাওয়া যায় ফরিদপুরে। পেনসিলের শিসের মতো কালো এই পদার্থ পরীক্ষার পর কোকেন হিসেবে শনাক্ত হয়।
অভিযান, হতাহতের তথ্য ও বাস্তবতা:
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ১৫ মে থেকে ২০২০ সালের ৩১ মে পর্যন্ত মাদকবিরোধী অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ৫৩৫ জন নিহত হন। আত্মসমর্পণ করেন ১২৩ জন কারবারি। তবুও মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক বলেন, সীমান্ত দিয়েই মাদক প্রবেশ করে। তাই সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি। সব সংস্থার সমন্বয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আলাদা ইউনিট গঠন করে মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। রাষ্ট্র আন্তরিক হলে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তিনি কূটনৈতিক পর্যায়েও সংলাপ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
কেন এক মাদক ছেড়ে অন্য মাদক:
এক মাদক ছেড়ে অন্য মাদকে ঝোঁকার পেছনে রয়েছে নানা কারণ। দীর্ঘদিন একই মাদক সেবনে শরীর অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তখন আগের মতো নেশা হয় না। ফলে বেশি শক্তিশালী মাদক খোঁজা শুরু হয়। সহজলভ্যতা, দাম, সামাজিক প্রভাব ও নতুনত্বের আকর্ষণও ভূমিকা রাখে। তরুণদের আড্ডা ও পার্টিতে নতুন মাদক জনপ্রিয় হলে অন্যরাও তা অনুসরণ করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাপ এড়াতে কারবারিরা নতুন মাদক আনে। একই মাদকে লাভ কমে গেলে নতুন মাদকে মুনাফা বেশি হয়। এতে বাজারের ধরন বদলে যায় এবং এর প্রভাব পড়ে সমাজ ও নিরাপত্তায়।
ভেপ ও ই-সিগারেটের মাধ্যমে দেশে ছড়িয়েছে এমডিএমবি নামের নতুন মাদক। গত ডিসেম্বরে এটি প্রথম শনাক্ত হয়। এটি মালয়েশিয়া থেকে এসেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
আশির দশকে হেরোইনের বাজার:
দেশে হেরোইনের অনুপ্রবেশ ঘটে আশির দশকে। ১৯৮৪ সালে পাবনায় প্রথম এটি ধরা পড়ে। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এর প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। ফেনসিডিল এলেও প্রথম দিকে হেরোইনের চাহিদা কমেনি। কারণ এর আসক্তি প্রবল। অনেকেই দুই মাদক পালা করে ব্যবহার করত। ইয়াবা আসার পর হেরোইন ও ফেনসিডিলের চাহিদা কমতে শুরু করে। তবে এগুলো এখনও রয়েছে। গাঁজার চাহিদাও সমানভাবে আছে। বেনাপোল, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে এখনও ফেনসিডিল আসে।
ইয়াবা শনাক্তের শুরুর গল্প:
২০০২ সালের ডিসেম্বরে রাজধানীর নিকেতনে ছোট ট্যাবলেট জব্দ হয়। এতে ডব্লিউওয়াই লেখা ছিল। পরে বনশ্রী থেকেও একই ধরনের ট্যাবলেট উদ্ধার হয়। তখনও এটি ইয়াবা বলে জানা যায়নি। পরীক্ষার পর বিষয়টি নিশ্চিত হয়। ২০০৫ সালের পর ইয়াবার ব্যবহার দ্রুত বাড়ে। আকার ছোট হওয়ায় বহন সহজ। দাম কম হওয়ায় এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
নতুন মাদক খাত ও আইসের বিস্তার:
২০১৮ সালের আগস্টে খাত নামে নতুন মাদক আসে। এটি ইথিওপিয়া থেকে আনা হয়। দেখতে চায়ের পাতার মতো। একই বছরে এটি জব্দ করা হয়।
২০১৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জিগাতলায় আইস জব্দের মাধ্যমে এটি আলোচনায় আসে। এটি অত্যন্ত শক্তিশালী মাদক। ২০২১ সাল থেকে এর ব্যবহার বাড়ছে। উদ্ধার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২১ সালে ৩৭ কেজি, ২০২২ সালে ১১৩ কেজি, ২০২৩ সালে ১৮৬ কেজি ৬৩২ গ্রাম এবং গত বছর ১১২ কেজি আইস জব্দ করা হয়েছে।
চাহিদা বাড়লে সরবরাহও বাড়ে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আইসের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে। শক্তিশালী হওয়ায় অনেকেই ইয়াবা ছেড়ে এতে ঝুঁকছে।
এলএসডি, এমডিএমএ, ডিএমটি ও ডিওবি:
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে এমডিএমএ প্রথম জব্দ হয়। এলএসডি ২০১৯ সালের জুলাইয়ে মহাখালীতে উদ্ধার হওয়ার পর সামনে আসে। কানাডা থেকে তরল ও স্ট্রিপ আকারে এটি আনা হয়েছিল।
২০২১ সালের জুনে তেজগাঁওয়ে ডিএমটি জব্দ হয়। এটি সেবনে বিভ্রম তৈরি হয়। একই বছরের নভেম্বরে ডিওবি সামনে আসে। পোল্যান্ড থেকে কুরিয়ারে এনে এটি বিক্রি করা হচ্ছিল।
কিটামিন, ম্যাজিক মাশরুম ও কুশ:
কিটামিন প্রথম ধরা পড়ে ২০১১ সালে। পরে আবার এর প্রবেশ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ইউরোপে পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
২০২১ সালের জুলাইয়ে ম্যাজিক মাশরুম শনাক্ত হয়। ২০২২ সালের আগস্টে কুশ নামে নতুন মাদক আসে। এটি গাঁজার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। আফ্রিকার দেশগুলো থেকে এটি আসে।
ব্যথানাশক ট্যাবলেটের অপব্যবহার:
ট্যাপেন্টাডল ও ট্রামাডল মূলত ব্যথানাশক ওষুধ। অপব্যবহারের কারণে এগুলো নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর সীমান্ত দিয়ে এগুলো আসতে থাকে।
দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, তবুও সুফল কম:
২০০৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মাদকবিরোধী চুক্তি হয়। এ পর্যন্ত সাতটি বৈঠক হয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে ১৯৯৪ সালের চুক্তির আওতায়ও বৈঠক চলছে। তবে এসব উদ্যোগে তেমন সুফল আসেনি। ফলে মাদক প্রবেশ বন্ধ হয়নি।
যা বলছে কর্তৃপক্ষ:
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, দেশে ইয়াবা ও সিনথেটিক মাদক সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। কম দাম, সহজ বহন ও দ্রুত আসক্তি এর কারণ। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত এটি ছড়িয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, নতুন মাদকের বেশিরভাগই সিনথেটিক। পুরোনো মাদক নিয়ন্ত্রণে এলে নতুন বিকল্প তৈরি হয়। সরবরাহকারীরা বাজার ধরে রাখতে নতুন মাদক আনে। ভবিষ্যতে অনলাইনভিত্তিক মাদক সরবরাহ বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সীমিত জনবল নিয়েই নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তদারকি চলছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও নেওয়া হচ্ছে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর নেটওয়ার্ক মোকাবিলা বড় চ্যালেঞ্জ।
পুলিশের এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চলছে। কারবারিদের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। সম্পদ জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

