বাংলাদেশের সড়কগুলো এখন যেন অসংখ্য ক্ষুদ্র ‘বেসরকারি টোলপ্লাজায় ছড়িয়ে পড়েছে। জেলা অনুযায়ী পদ্ধতি আলাদা হলেও লক্ষ্য একই—চালকের পকেটে হাত দেওয়া। সম্প্রতি প্রকাশিত মানচিত্র প্রমাণ করেছে, এই সমস্যা কোনো একক অঞ্চলের নয়, পুরো দেশের ব্যাপ্ত। ফলে সমাধানও থাকতে হবে জাতীয় পর্যায়ের, প্রযুক্তিনির্ভর ও কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক।
সড়কপথে এই অব্যবস্থাপনা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করছে না, জনসাধারণের চলাচলেও বাধা সৃষ্টি করছে। তাই কেন্দ্রীয়ভাবে টোল ব্যবস্থার নিয়মকানুন শক্তিশালী করা এবং ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। এখনও অনেক জেলার সড়কে অনিয়মিত ও অবৈধ টোলসংগ্রহ চলছে। প্রতিটি টোলপ্লাজা পৃথকভাবে পরিচালিত হওয়ায় নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারকে বৃহত্তর কৌশল গ্রহণ করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, স্বয়ংক্রিয় রশিদ ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় অনুমোদন ছাড়া টোল নেওয়ার ওপর কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তাব উঠেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি সড়ক ব্যবহারকারীর জন্য স্বচ্ছ, নিরাপদ ও সমানভাবে পরিচালিত করার লক্ষ্যে এমন উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
ভোরবেলা রাজধানীর ব্যস্ত প্রবেশপথ। দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লেগুনার সারি একে একে থামে। কোনো সরকারি টোলপ্লাজা নেই, কাউন্টার নেই, রসিদ নেই। তবুও হাত বদল হচ্ছে টাকা। কয়েকজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে গাড়ি থামাচ্ছে, চালকের হাতে চাপিয়ে দিচ্ছে একটি টোকেন, তারপর নিচ্ছে নির্দিষ্ট অঙ্ক। কেউ প্রশ্ন করছে না, কেউ প্রতিবাদ করছে না। এই দৃশ্য আজকের বাংলাদেশের সড়কে নতুন নয়—এটাই নিয়মে পরিণত হয়েছে।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, রাজশাহী থেকে কক্সবাজার—দেশের প্রায় প্রতিটি সড়ক-মহাসড়কে চলছে এক অদৃশ্য ‘টোলব্যবস্থা’। তবে এটি সরকারি নয়, নিয়ন্ত্রণ করছে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। মাঠপর্যায়ের সংগঠনগুলোর দাবি, প্রতিদিন শত কোটি টাকারও বেশি অর্থ আদায় হচ্ছে। বছরে তা দাঁড়ায় প্রায় ৩,৬০০ কোটি টাকার ওপরে। এটি এক বিশাল ‘শ্যাডো ইকোনমি’, যা চোখের সামনে থাকলেও হিসাবের বাইরে।
চাঁদাবাজির পদ্ধতি এখন বেশ ‘স্মার্ট’। কোথাও রাস্তায় দাঁড়িয়ে নগদ আদায় হয়, কোথাও সংগঠনের ব্যানারে মাসিক চুক্তি করা হয়, আবার কোথাও গাড়ির কাচে টোকেন লাগিয়ে মাস শেষে টাকা সংগ্রহ করা হয়। নাম দেওয়া হয়—শ্রমিক কল্যাণ ফান্ড, মালিক সমিতি চাঁদা, নিরাপত্তা ফি, লাইন মেইনটেন্যান্স ইত্যাদি।
বাসচালক রফিকুল বলেন, “চাদা না দিলে গাড়ি ছাড়বে না। ঝামেলা করলে মারধর করা হয়। তাই চুপচাপ দিয়ে দেই।” অনেক চালকের ভাষায়, এটি ‘নিরাপত্তা ফি’। দিলে ঝামেলা নেই, না দিলে বিপদ।
খোলা আকাশের নিচে বেপরোয়া লুট:
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শনিরআখড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাস থামিয়ে ৫-৭ জনের একটি দল লাইন ধরে টাকা নিচ্ছে। পাশেই মোটরবাইক চালকরা দাঁড়িয়ে দেখছেন। একজন বলেন, “আগে এক-দুইজন ছিল। এখন পুরো টিম। যেন জমিদারি।” চট্টগ্রাম বন্দরের বিশ্বরোড এলাকায় ট্রাকচালকদের অভিযোগ, মাল নামানোর আগে ও পরে—দুইবারই টাকা দিতে হয়। বিভিন্ন নামে আলাদা আলাদা কালেকশন হয়।
চাঁদাবাজি শুধু অর্থ নয়, সহিংসতার রূপও নিচ্ছে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে এক লেগুনাচালককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, কারণ তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সামান্য টাকা নিয়ে বচসা থেকে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। এ ধরনের ঘটনা একক নয়। বিভিন্ন এলাকায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, মারধর ও গাড়ি ভাঙচুর এখন নিত্যদিনের বিষয়। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একই—আইনের শাসন কোথায়?
এই সংগঠিত চাঁদাবাজরা কারা?
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চাঁদার টাকা এক জায়গায় জমে থাকে না—এটি ভাগ হয়ে যায় বিভিন্ন স্তরে। অংশ পায় রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতাকর্মী; অংশ পায় শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের সদস্য; অংশ যায় স্থানীয় দালালচক্রের কাছে। অভিযোগ আছে, কতিপয় পুলিশ ও হাইওয়ে সদস্যও এতে যুক্ত।
অতীতে যেসব গ্রুপ ক্ষমতার ছত্রছায়ায় দাপট দেখাত, তাদের ক্ষমতা পাল্টালেও কাঠামো বদলায়নি—শুধু মুখ বদলেছে। “রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে এই ধরনের চাঁদাবাজি টিকতেই পারত না।”
জেলা অনুযায়ী চাঁদাবাজির ছক:
পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশজুড়ে চাঁদাবাজির চিত্র একরকম নয়। কোথাও এটি বাস স্ট্যান্ডকেন্দ্রিক, কোথাও বন্দরকেন্দ্রিক, আবার কোথাও মহাসড়কের চেকপোস্টে। মাঠপর্যায়ের চালক, মালিক, শ্রমিক ও স্থানীয় সূত্র থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, প্রতিটি অঞ্চলে আলাদা ‘মডেল’ চালু রয়েছে। নিচে রাজধানী করিডরের বাস্তবচিত্র তুলে ধরা হলো।
রাজধানী করিডর : ঢাকা (যাত্রাবাড়ী-সায়েদাবাদ-শনিরআখড়া-গাবতলী)
-
চিত্র: রাজধানী ঢাকার এই করিডর দেশের সবচেয়ে বড় ‘হাব’। প্রতিটি বাস, লেগুনা ও ট্রাককে অন্তত ২-৩ জায়গায় থামানো হয়। আদায়ের ধরন: লাইন ফি, শ্রমিক কল্যাণ ফি, টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণ ফি এবং টোকেন বা স্টিকার।
-
আনুমানিক হার:
- সিটি বাস: ১,০০০–১,২০০ টাকা/দিন
- লেগুনা/হিউম্যান হলার: ৭০০–৮০০ টাকা/দিন
- ট্রাক/কাভার্ড ভ্যান: ১,০০০–১,৫০০ টাকা/দিন
- দৈনিক সংগ্রহের পরিমাণ আনুমানিক ৩০–৪০ লাখ টাকার বেশি।
বৈশিষ্ট্য: প্রকাশ্য আদায়, দলবদ্ধ কালেক্টর, না দিলে হুমকি ও মারধর।
বন্দর ও শিল্প করিডোর: চট্টগ্রাম
-
চিত্র: বন্দরকেন্দ্রিক ট্রাক ও কার্গো চলাচল। প্রতিটি লোড-আনলোডে ‘ফি’ আদায়। ধরন: ট্রাক মালিক সমিতি, লোডিং-আনলোডিং চার্জ, গেট পাস এবং মাসিক স্টিকার।
-
আনুমানিক হার: ট্রাক ১,৫০০–২,৫০০ টাকা/ট্রিপ; কাভার্ড ভ্যান ২,০০০ টাকা। দৈনিক সংগ্রহ ৪০–৫০ লাখ টাকার বেশি।
-
বৈশিষ্ট্য: একাধিক ধাপে টাকা আদায়—বন্দর ঢোকার সময়, বের হওয়ার সময়, বিশ্বরোডে পুনরায়।
উত্তরাঞ্চল করিডোর: রাজশাহী ও আশপাশ
-
চিত্র: আঞ্চলিক রুট, কৃষিপণ্য পরিবহন বেশি। আদায়ের ধরন: ইউনিয়ন বা স্থানীয় শ্রমিক সংগঠন, বাজার ফি ও রুট কন্ট্রোল।
-
আনুমানিক হার: ট্রাক ৮০০–১,০০০ টাকা; লোকাল বাস/হিউম্যান হলার ৫০০–৭০০ টাকা। দৈনিক সংগ্রহ ১০–১৫ লাখ টাকার বেশি।
-
বৈশিষ্ট্য: স্থানীয় প্রভাবশালী ‘দাদাগিরি’ নির্ভর, লিখিত রসিদ নেই।
পর্যটন ও দক্ষিণ করিডোর: কক্সবাজার
-
চিত্র: পর্যটন মৌসুমে বাস ও মাইক্রোবাসের চাপ বেশি। আদায়ের ধরন: পার্কিং/টার্মিনাল চার্জ, ‘সিকিউরিটি’ ফি ও মৌসুমি চাঁদা।
-
আনুমানিক হার: দূরপাল্লার বাস ২,০০০–২,২০০; মাইক্রোবাস ১,০০০–১,৫০০ টাকা। দৈনিক সংগ্রহ ৮–১২ লাখ টাকা।
-
বৈশিষ্ট্য: ঈদ ও ছুটির দিনে আদায় দ্বিগুণ।
সারা দেশের আনুমানিক সারসংক্ষেপ:
-
দৈনিক আদায়:
- বাস: ৩৬ লাখ টাকা
- ব্যাটারিচালিত রিকশা: ৬০ কোটি
- হিউম্যান হলার: ৪ কোটি
- ট্রাক/কাভার্ড ভ্যান: ৩০ কোটি
- অন্যান্য: কয়েক কোটি টাকা
-
মোট: প্রতিদিন শত কোটিরও বেশি। তথ্য উৎস: বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান।
বিশ্লেষণ: মানচিত্র যা বলছে, তিনটি স্পষ্ট প্যাটার্ন দেখা যায়:
১. যেখানে ট্রাফিক বেশি, সেখানে চাঁদা বেশি।
২. বন্দর/টার্মিনালকেন্দ্রিক এলাকায় সংগঠিত সিন্ডিকেট।
৩. নগদ লেনদেনই মূলশক্তি।
অর্থাৎ, এটি ছিটেফোঁটা অপরাধ নয়—এটি কাঠামোগত অর্থনীতি। বাংলাদেশ এখন অসংখ্য ক্ষুদ্র ‘বেসরকারি টোলপ্লাজা’-য় ভরা। জেলা অনুযায়ী পদ্ধতি বদলায়, কিন্তু লক্ষ্য এক—চালকের পকেট। মানচিত্র প্রমাণ করে, সমস্যা বিচ্ছিন্ন নয়, জাতীয়। সমাধানও হতে হবে কেন্দ্রীয়, প্রযুক্তিনির্ভর ও কঠোর।
হিসাব যা চমকে দেয়: বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী:
- ঢাকার ৩,০০০ বাস থেকে দৈনিক ৩৬ লাখ টাকা
- ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে ৬০ কোটি টাকা
- ৫০ হাজার হিউম্যান হলার থেকে ৪ কোটি টাকা
- ৩ লাখ ট্রাক/কাভার্ড ভ্যান থেকে ৩০ কোটি টাকা
- সিএনজি ও অন্যান্য যান থেকে কয়েক কোটি
মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “এটা শুধু দুর্নীতি নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির ওপর ডাকাতি।”
শেষ পর্যন্ত ভোগে কে?
চাঁদা দিয়ে বাস মালিক ক্ষতিপূরণ নেন—ভাড়া বাড়িয়ে। ট্রাকচালক পণ্যের পরিবহন খরচ বাড়িয়ে। ফলে চাল, ডাল, সবজি, সিমেন্ট—সব কিছুর দাম বাড়ে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি এক ধরনের ‘হিডেন ট্যাক্স’। সরকার নয়, সাধারণ মানুষ দিচ্ছে—সিন্ডিকেটকে।
কেন থামছে না?
- নগদ লেনদেন
- জবাবদিহির অভাব
- রাজনৈতিক ছত্রছায়া
নগদ অর্থ মানেই ট্রেইল নেই। মামলা নেই, প্রমাণ নেই। অপরাধ প্রমাণ কঠিন।
শৃঙ্খলা ফেরানোর ৩ পথ:
১. ডিজিটাল পেমেন্ট চালু করে নগদ লেনদেন বন্ধ করা।
২. সিসিটিভি নজরদারি ও অটোমেটেড মামলা ব্যবস্থা।
৩. অবৈধ ও কাগজবিহীন যানবাহন দ্রুত অপসারণ।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “ক্যামেরাভিত্তিক নজরদারি চালু হলে সরকারই জরিমানা পাবেন, ব্যক্তিগত আদায় বন্ধ হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য যদি সহযোগিতা করে, তবে গণঅসন্তোষ তৈরি হতে পারে।” তিনি আরো বলেন, অতীতেও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিছু প্রভাবশালী নেতা-মহাজন কোটি কোটি টাকা তুলতেন। ধারাবাহিকতা এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
মন্ত্রীর বক্তব্যে বিতর্ক: রেল, সড়ক ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, “সমঝোতার ভিত্তিতে টাকা নিলে তা চাঁদা নয়, কিন্তু জোর করে আদায় করলে সেটি চাঁদা।” এই মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। অনেকেই বলছেন, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এমন বক্তব্য পরিস্থিতিকে বৈধতা দেওয়ার মতো শোনাতে পারে।
হাইওয়ে পুলিশের অবস্থান:
ঢাকা-চট্টগ্রাম বিভাগের হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, “ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের প্রায় ৮০ শতাংশ কাগজপত্রে অনিয়ম রয়েছে। বৈধ কাগজ ছাড়া কোনো গাড়ি হাইওয়েতে চলতে পারবে না। কেউ জড়িত প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল প্রশ্ন এখন একটাই—কত দ্রুত কঠোর অভিযান শুরু হবে। কারণ প্রতিদিনের ছোট ছোট চাঁদাই মিলিয়ে তৈরি করছে হাজার কোটি টাকার অন্ধকার অর্থনীতি, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত বইছে সাধারণ মানুষই।
বাংলাদেশের সড়ক এখন অদৃশ্য অর্থনীতির দখলে। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা উঠছে, অথচ সরকারের কোষাগারে এক টাকাও যাচ্ছে না। প্রশ্ন একটাই—রাষ্ট্র কি এই সিন্ডিকেট ভাঙবে, নাকি সড়ক থাকবে দখলদারদের হাতে?

