জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কিছু ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠন করা হয়েছিল, যাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা যায়। অনেক ব্যাংকে এর ইতিবাচক ফল দেখা গেলেও এনআরবিসি ব্যাংকে পরিস্থিতি উল্টো।
ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররা বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মোহাম্মদ তৌহিদুল আলমের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন নিয়োগ-বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। এ বিষয়ে তারা লিখিতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং দুদক চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগকারীদের মধ্যে রয়েছেন শেয়ারহোল্ডার আবু মোহাম্মদ সাইদুর রহমান, সফিকুল আলম, লকিয়ত উল্লাহ ও মোহাম্মদ নাজিম।
শেয়ারহোল্ডারদের অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়। শেয়ারহোল্ডাররা আশা করেছিলেন, এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, পুনর্গঠনের পরও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি। বরং অনিয়ম, নিয়োগ-বাণিজ্য ও লুটপাট বেড়েছে।
সূত্রে বলা হয়, ব্যাংকে একটি সিন্ডিকেট গঠিত হয়েছে, যেখানে ব্যবস্থাপনা পরিচালকও জড়িত। শেয়ারহোল্ডারদের দাবি, ২০২৩ সালের ৫ মে ব্যবস্থাপনা পরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ব্যাংকের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। সিন্ডিকেট সদস্যরা পরিকল্পিত শূন্যপদ তৈরি করে নিয়োগ-বাণিজ্য চালাচ্ছেন। প্রতিটি পদে ১০–২০ লাখ টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। অভিজ্ঞ ও সিনিয়র কর্মকর্তাদের পদত্যাগে বাধ্য করা হয়, এরপর সেই পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, কোম্পানি সেক্রেটারি, চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার, চিফ রিস্ক অফিসার, চিফ হিউম্যান রিসোর্স অফিসারসহ ৩৮ জনকে উচ্চপদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বা প্রক্রিয়াধীন। অনেককে এমডির পছন্দ অনুযায়ী বা অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
শেয়ারহোল্ডাররা আরও উল্লেখ করেছেন, এমডির পূর্ববর্তী কর্মস্থলের অনুগতরা নিয়োগে প্রাধান্য পাচ্ছেন। নিয়োগ-বাণিজ্যের ফলে ব্যাংকের করপোরেট গভর্ন্যান্স দুর্বল হয়ে পড়ছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, টিভি ও বিজ্ঞাপন বিলের মাধ্যমে অর্থের একটি অংশ বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরকে উপঢৌকন হিসেবে দেওয়া হচ্ছে।
ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার নিয়োগকেন্দ্রিক দুর্নীতিও উল্লেখযোগ্য। আগ্রহী প্রার্থীরা সরাসরি চেয়ারম্যান ও এমডির দপ্তরে যোগাযোগ করছেন। শেয়ারহোল্ডাররা দাবি করছেন, নিয়োগ-বাণিজ্য এনআরবিসি ব্যাংকে চরম আকার ধারণ করেছে। তারা দুদক ও বিএফআইইউর তদন্তের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন, নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা উপেক্ষা করে বড় পরিসরে নিয়োগ দেওয়া হলে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাবে, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা দেখা দেবে এবং মূলধন চাপের শঙ্কা বাড়বে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৩ সালের বিআরপিডির সার্কুলার নং-১৭ অনুযায়ী ব্যাংকটি পিসিএর কাঠামোর আওতায় রয়েছে। তবে নতুন নিয়োগ ও ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত নীতি উপেক্ষা করা হচ্ছে। ফলস্বরূপ, ২০২৪ সালে ব্যাংকের মুনাফা ৮২০ কোটি টাকায় ছিল, যা ২০২৫ সালে ৪৫৭ কোটি টাকায় নেমে গেছে। নারী কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক হয়রানি সহ নিরাপত্তাহীনতার কারণে চাকরি ছাড়ার অভিযোগও উঠেছে। শেয়ারহোল্ডাররা উল্লেখ করেছেন, ব্যাংকের আয়ের বড় অংশ আসত মাইক্রোক্রেডিট থেকে। তবে সেই আয় সংকুচিত হওয়ার ফলে কর্মীদের গণহারে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, “বাংলাদেশে কিছু ব্যাংক ভালো করছে, আবার কিছু ব্যাংক তাদের বোর্ড ও ম্যানেজমেন্ট নিয়ে লুটপাট করছে। বড় সমস্যা হলো করপোরেট গুড গভর্ন্যান্সের দুর্বলতা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একা তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না; বোর্ড ও ম্যানেজমেন্টের পেশাদারিত্ব প্রয়োজন।” অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আরটিজিএস ফি মওকুফ, ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান ও ঘন ঘন বোর্ড সভার মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। মন্দ ঋণ (এনপিএল) পুনরুদ্ধারে অগ্রগতি নেই। ফলে ব্যাংক ধীরে ধীরে লোকসানি ব্যাংকের পথে চলে যাচ্ছে।
দুদক সূত্র নিশ্চিত করেছে, এনআরবিসি ব্যাংকের নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ তাদের কাছে পৌঁছেছে। দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম বলেছেন, “অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক চাপে থাকা ব্যাংকের ক্ষেত্রে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা উচিত।
এনআরবিসি ব্যাংকের এমডি ড. মোহাম্মদ তৌহিদুল আলম বলেন, “আমরা সবকিছু নিয়ম মেনে করেছি, নিয়মের বাইরে কিছু করিনি। তবে চেয়ারম্যানের কোনো প্রতিক্রিয়া পাইনি।” বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ উদ্দিন খান বলেছেন, “ব্যাংকে কোনো অভিযোগ পেলে তা আমলে নিয়ে তদন্ত করা হবে। সত্যতা প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সূত্র: শেয়ার বিজ

