চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলাকে অনেকেই এখন ‘ক্রাইম জোন’ বলেই উল্লেখ করছেন। হত্যা, চাঁদাবাজি, সংঘর্ষ ও প্রকাশ্য গুলির ঘটনায় যেন লাগাম নেই। পাহাড়, নদী ও খালবেষ্টিত ২৪৬ দশমিক ৫৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলায় রয়েছে ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা। প্রায় ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৩৫৮ মানুষের বসবাস এখানে। শিক্ষার হার ৮৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ হলেও সন্ত্রাসী তৎপরতায় পুরো জনপদ আজ আতঙ্কগ্রস্ত।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে বুধবার পর্যন্ত রাউজানে ২১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অধিকাংশ হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। অনেক ঘটনায় মূল হোতারা এখনো শনাক্তই হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বহু বছর ধরেই রাউজানে একাধিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিল। তবে ৫ আগস্টের পর তাদের তৎপরতা ও সংখ্যা বেড়েছে। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, বালু-মাটির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, ইটভাটা ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায় এবং অপহরণকে কেন্দ্র করে সংঘাত বাড়ছে।
প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, গুলিবর্ষণ ও হামলা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে দাঁড়াতে পারছে না—এমন অভিযোগও রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের পর সংঘটিত ২১টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ১৫টি রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হয়েছে। একই সময়ে শতাধিক সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ।
নিহতদের মধ্যে ১০ জন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী, একজন ব্যবসায়ী এবং চারজন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অন্যরা সাধারণ মানুষ।
সর্বশেষ বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের অলিমিয়াহাট বাজারে যুবদল নেতা মুহাম্মদ আবদুল মজিদ (৫০) কে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। মুখোশধারী অস্ত্রধারীরা মোটরসাইকেলে এসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। তার শরীরে চোখের ওপরে, বুকে ও কোমরে গুলি লাগে।
এর আগে ৫ জানুয়ারি একই ইউনিয়নে বিএনপি নেতা জানে আলম সিকদার (৫০) কে নিজ বাড়ির সামনে একইভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশ বলছে, দুটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে একই অপরাধী চক্রের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।
তবে এখনো কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।
গত ১৮ মাস ধরে রাউজানে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে। গুলি, ছুরিকাঘাত, পিটিয়ে হত্যা—সব ধরনের সহিংসতা ঘটেছে।
রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকারদের মধ্যে রয়েছেন—
মুহাম্মদ আবদুল মজিদ, জানে আলম সিকদার, আলমগীর, আবদুল হাকিম, কমর উদ্দিন, মো. ইব্রাহিম, মানিক আবদুল্লাহ, মুহাম্মদ সেলিম, দিদারুল আলম।
এ ছাড়া ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত আবদুল মান্নান, মুহাম্মদ ইউসুফ মিয়া, আবু তাহের ও মুহাম্মদ হাসান নিহত হয়েছেন।
স্থানীয় বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম বাবুল অভিযোগ করেছেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের খুব কাছেই হলেও কাউকে গ্রেফতার করা যাচ্ছে না। তার ভাষায়, “পুলিশ সক্রিয় হলে হয়তো পরের হত্যাকাণ্ড ঠেকানো যেত।”
তবে পূর্বগুজরা পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের পরিদর্শক দিপ্তেষ দাশ বলেন, অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
রাউজান থানার ওসি সাজেদুল ইসলাম দাবি করেন, বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার ও গ্রেফতার হয়েছে। অভিযুক্তদের ধরতে অভিযান চলছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেল বলেন, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারই প্রধান কারণ। অভিযুক্তদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কদলপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুস সবুর বলেন, “১৪টি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় একযোগে যৌথ অভিযান চালিয়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না করলে খুন-চাঁদাবাজি কমবে না।”
স্থানীয়দের মতে, রাজনৈতিক অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, প্রভাব বিস্তার ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত মিলেই রাউজানকে সহিংসতার চক্রে আটকে ফেলেছে।
পুলিশ বলছে, নির্বাচনের পর পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছে। তবে তারা স্বীকার করছে, হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে—যা এখনো প্রকাশ করা হচ্ছে না।
বাসিন্দাদের প্রশ্ন একটাই—২১টি হত্যার পরও যদি মূল হোতারা ধরা না পড়ে, তাহলে কবে ফিরবে স্বাভাবিক জীবন?
রাউজান এখন উন্নয়ন ও শিক্ষার জন্য নয়, বরং সহিংসতার খবরেই বেশি আলোচিত। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে আতঙ্কের এই চক্র ভাঙা কঠিন হয়ে পড়বে—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয়রা।

