বুধবার ভোর ৫টা। শাকসবজি আনতে রিকশা-ভ্যান নিয়ে যাত্রাবাড়ীর পথে ছিলেন ফয়জুর রহমান নামের এক বৃদ্ধ। জুরাইনের মুন্সিবাড়ী এলাকায় পৌঁছাতেই অন্ধকার গলি থেকে বেরিয়ে আসে তিন যুবক। মুহূর্তেই ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে তাঁর মোবাইল| ফোনসেট ও পাঁচ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় তারা। এরপর দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
এ ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। রাজধানী ঢাকার নিত্যদিনের জীবনে এটি এখন পরিচিত এক করুণ বাস্তবতা। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারী—কেউই নিরাপদ নয়। ভোরবেলা ও গভীর রাতে চলাচলকারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকছেন।
পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের তথ্য বলছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক ছিনতাই স্পট বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থান রয়েছে। এসব জায়গায় প্রায়ই সম্পদ ও জীবনহানির ঘটনা ঘটছে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন আইজিপি আলী হোসেন ফকির দায়িত্ব নেওয়ার পর ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশি তৎপরতা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক মাসে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারিতে ছিনতাইয়ের হার অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। পুলিশের হিসাবে ডিএমপির সব থানা এলাকায় এ সময়ে মোট ৩০৮টি ছিনতাইয়ের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
কারণ অনেক ভুক্তভোগী আইনি ঝামেলা ও থানায় যাওয়া এড়াতে মামলা বা সাধারণ ডায়েরি করেন না। সবজি বিক্রেতা ফয়জুর রহমানও ছিনতাইয়ের শিকার হলেও থানায় যাননি বলে কালের কণ্ঠকে জানান।
পরিসংখ্যান বলছে, মোট ছিনতাইয়ের ৬৫ শতাংশ ঘটছে মোটরসাইকেল ব্যবহার করে। ২০ শতাংশ ঘটছে সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে। আর বাকি ১৫ শতাংশে ছদ্মবেশ বা কথার ফাঁদে ফেলে পথচারীদের বিভ্রান্ত করা হয়।
ঢাকায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ থানা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকা।
যাত্রাবাড়ীতেও ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে। কুতুবখালীর বাসিন্দা শাহাদত হোসেন জানান, প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর যাত্রাবাড়ী মোড়ে ওত পেতে থাকে ছিনতাইকারী ও টানা পার্টির সদস্যরা। ফ্লাইওভারের নিচে কিছু তরুণ চাকু দেখিয়ে মোবাইল ফোনসেট ও টাকা ছিনিয়ে নেয়। বাসের জানালার পাশে বসে মোবাইলে কথা বললে ছোঁ মেরে ফোন নিয়ে যায়। রিকশায় থাকা নারীদের কানের দুল ও গলার মালা টেনে নেওয়ার ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে কয়েকটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। উত্তরা ও বিমানবন্দর অঞ্চলে রয়েছে উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের লেকপাড়, হাউস বিল্ডিং এলাকা, বিমানবন্দর গোলচত্বর ও কাওলা। মিরপুর ও গাবতলী অঞ্চলে রয়েছে মিরপুর-১, ১০ ও ১২ নম্বর গোলচত্বর, টেকনিক্যাল মোড়, গাবতলী বাস টার্মিনালসংলগ্ন বেড়িবাঁধ ও কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড। তেজগাঁও ও ফার্মগেট অঞ্চলে রয়েছে কারওয়ান বাজার লেভেল ক্রসিং, তেজগাঁও সাতরাস্তা, ফার্মগেট ফুটওভারব্রিজ ও বিজয় সরণি। মোহাম্মদপুর ও ধানমণ্ডি অঞ্চলে রয়েছে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ, তিন রাস্তার মোড়, নবোদয় হাউজিং এলাকা, ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর ও লেকসংলগ্ন নির্জন স্থানগুলো। যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ অঞ্চলে সায়েদাবাদ জনপথ মোড়, যাত্রাবাড়ী মোড়, শনির আখড়া ও দোলাইরপাড় মোড় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ারী বিভাগের পুলিশের ডিসি মল্লিক আহসান উদ্দিন সামি গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ছিনতাই স্পটগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করেন, কিন্তু থানায় মামলা না করায় পুলিশের কাজ কঠিন হয়ে পড়ে। গ্রেপ্তারের পর জেলে পাঠানো হলেও তারা সহজে জামিনে বেরিয়ে আবার ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছিনতাই বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি আর্থসামাজিক ও কাঠামোগত কারণ রয়েছে। বেকার তরুণদের একটি অংশ দ্রুত আয়ের আশায় বা মাদকের টাকা জোগাতে এই পথে নামছে। রাজধানীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পর্যাপ্ত সড়কবাতি বা নজরদারি ক্যামেরা নেই। আইনি দুর্বলতাও একটি কারণ। পেশাদার ছিনতাইকারীরা জানে, এই অপরাধে সহজে জামিন পাওয়া যায়।
সাবেক এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার মতে, ধারাবাহিক নজরদারির ঘাটতিও বড় কারণ। অনেক সময় ট্রাফিক পুলিশ যানজট নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকে। ফলে তাদের চোখের সামনেই অপরাধ ঘটলেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।
রাজধানীর এই পরিস্থিতিতে ছিনতাই রোধে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির। ইতিমধ্যে আবদুল্লাহপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এলাকায় ছিনতাই প্রতিরোধে এপিবিএন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ থানাগুলোতে রাতের টহল ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, ভোর বা গভীর রাতে চলাচলের সময় নির্জন ও অন্ধকার পথ এড়িয়ে চলতে। রিকশায় বসে ব্যাগ নিজের কাছে রাখতে। মোবাইলে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে। অপরিচিত কারো দেওয়া খাবার বা পানীয় গ্রহণ না করতে। ছিনতাইয়ের শিকার হলে প্রতিরোধ না করে দ্রুত নিরাপদ স্থানে গিয়ে ৯৯৯ নম্বরে কল করতে।

