আইনি সহায়তা ও মানবাধিকার কার্যক্রমের নাম ব্যবহার করে বড় অঙ্কের অর্থ আদায়ের একটি সংঘবদ্ধ চক্রের তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আইনজীবী তৌফিকা করিমের নেতৃত্বে এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছে। এ ঘটনায় অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা হয়েছে এবং একাধিক ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের সিআইডি ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের তদন্তে দেখা গেছে, তৌফিকা করিম ও তার সংশ্লিষ্টরা আইনি সহায়তার নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে অর্থ আদায় করেছেন। কখনো ল’ ফার্ম, আবার কখনো মানবাধিকার সংস্থার ব্যানার ব্যবহার করে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তৌফিকা ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট মোট ১১৪টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৬৫৩ কোটি টাকার লেনদেনের চিহ্ন মিলেছে। এর মধ্যে তৌফিকা করিমের নিজ নামে থাকা ২৬টি হিসাবে থাকা ২৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সিআইডির তথ্য বলছে, দরিদ্র ও অসহায় বন্দিদের বিনা খরচে আইনি সহায়তা দেওয়ার কথা বলে ‘লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স টু হেল্পলেস প্রিজনার অ্যান্ড পারসনস (এলএএইচপি)’ নামে একটি মানবাধিকার সংগঠন গড়ে তোলা হয়। এই সংগঠনের নামে ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ২৪ কোটির বেশি টাকা সংগ্রহের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া ‘সিরাজুল হক অ্যাসোসিয়েটস’ নামের একটি ল’ ফার্মের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান থেকে আরও বিপুল অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, একটি বিদেশি মালিকানাধীন ব্যাংক থেকে দীর্ঘ সময় ধরে মাসিক ভিত্তিতে কোটি টাকার বেশি অর্থ নেওয়া হয়, যা আইনি পরামর্শ ফি হিসেবে দেখানো হয়েছিল।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১১ জানুয়ারি ঢাকার ভাটারা থানায় অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়।
মামলায় সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, তৌফিকা করিমসহ একাধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সব ব্যাংক হিসাব নজরদারিতে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে আরও সম্পদ জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জানা গেছে, জুলাইয়ের রাজনৈতিক আন্দোলনের পর তৌফিকা করিম দেশ ছেড়ে প্রথমে ভারতে এবং পরে কানাডায় অবস্থান নেন। তবে তার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন সহযোগী এখনো দেশে সক্রিয় রয়েছেন বলে তদন্তে ইঙ্গিত মিলেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আইনি ও মানবিক কার্যক্রমের নামে অর্থ সংগ্রহের এই ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

