দেশের শিক্ষার মান ও স্বচ্ছতার পথে বড় ধাক্কা দিতে পারে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। সম্প্রতি ডিআইএ একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যেখানে ৯৭৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৯০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে শুধু সরকারি অর্থ লোপাট নয়, ১৭৬ একর সরকারি জমি বেহাত এবং জাল সনদে শিক্ষক নিয়োগের মতো ঘটনায় সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
ডিআইএর প্রতিবেদনের সময়কাল হলো গত বছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর। এই ছয় মাসে পরিচালিত তদন্তে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় ও সরকারি অনুদানের হিসাবরক্ষণ, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার বৈধতা, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ যাচাই, শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও পরীক্ষার ফলাফল, এবং শিক্ষার পরিবেশ ও পরিকাঠামোর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
ডিআইএ মূলত দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে কাজ করে। এটি চার ধরনের তদারকি কার্যক্রমের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে। শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নিরীক্ষা নয়, প্রশাসনিক ও একাডেমিক পরিদর্শনও নিয়মিত করা হয়। ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি, খেলার মাঠসহ অন্যান্য অবকাঠামোর পর্যাপ্ততা যাচাই ও উন্নতির জন্য পরামর্শ প্রদানের দায়িত্বও রয়েছে সংস্থার।
বর্তমানে ডিআইএ ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবহার করে ‘পিয়ার ইন্সপেকশন’ এবং অনলাইন রিপোর্টিং সিস্টেম চালু করেছে। জাল সনদ শনাক্ত, ভুয়া সনদে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের চিহ্নিতকরণ এবং প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা প্রধানের আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। ডিআইএর এই প্রতিবেদন দেশের শিক্ষা খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দেশের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—স্কুল, কলেজ, কারিগরি ও মাদ্রাসা—দূর্নীতির ছায়া থেকে মুক্ত নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) জানিয়েছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জাল সনদ, অবৈধ নিয়োগ এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অনিয়ম ঘটানো হয়েছে।
ডিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯৭৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট ৮৯ কোটি ৮২ লাখ ২৫ হাজার ৬০৭ টাকার আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়েছে। একই সঙ্গে ১৭৬ দশমিক ৫২৩ একর সরকারি জমি বেহাত হয়েছে। এছাড়া জাল সনদে চাকরি, অবৈধ নিয়োগ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ লোপাটের মতো বিষয়ও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, জাল সনদে নিয়োজিত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নের নামে লোপাট করা অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর, শিক্ষা বোর্ড ও প্রতিষ্ঠান প্রধানদের ইতিমধ্যেই প্রতিবেদন ইমেইলের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে।
ডিআইএর পরিচালক প্রফেসর এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, “সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এই দপ্তরটি গঠন করেছিলেন। আমি যোগ দেওয়ার পর পরিদর্শন পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছি। এখন থেকে পরিদর্শন শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া প্রতিবেদনের শুরুতেই ‘মোটাদাগে আর্থিক অনিয়ম’ এবং ‘অডিট আপত্তি’ সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়। এতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক নজরে প্রতিষ্ঠানের অবস্থা বুঝতে পারবে।”
পরিচালক আরও জানান, “পরিদর্শন কার্যক্রমকে স্বচ্ছ করতে মন্ত্রণালয় ও ডিআইএ মিলে তিন স্তরের তদারকি চালানো হচ্ছে। কোনো কর্মকর্তা কোনো প্রতিষ্ঠানে অবস্থানকালেই বড় দুর্নীতির খাতগুলো চিহ্নিত করে লিখিতভাবে আমাদের জানাবেন। ফলে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কারচুপির সুযোগ থাকবে না।”
ডিআইএ সূত্র বলছে, দেশে প্রায় ৩৬ হাজার ৭০০ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক নিয়োগসহ ২০ ধরনের তথ্য যাচাই করা হয়। ডিআইএ পরিদর্শন ও নিরীক্ষা দুই ভাগে হয়। প্রথম ভাগে অডিট বা নিরীক্ষা করা হয়, যেখানে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম এবং জাল সনদ শনাক্ত করা হয়। দ্বিতীয় ভাগে ইন্সপেকশন বা একাডেমিক সুপারভিশন হয়। এতে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় উপদেশ দেওয়া হয়।
ডিআইএ কর্মকর্তা মূলত অডিটে বেশি মনোযোগী হন, কারণ এখানে ধরা পড়লে প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা ও অনিয়ম স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা যায়। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শিক্ষকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে শিক্ষার দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে।
ঘুষের অভিযোগ মূলত চারজন কর্মকর্তার দিকে কেন্দ্রিত: শিক্ষা পরিদর্শক আবু দাউদ, মকবুলার রহমান, নূশরাত হাছনীন এবং সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক আজিম কবীব। আবু দাউদ অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাওয়ার পরও নিচের পদে অবস্থান রেখেছেন। মকবুলার রহমানের বিরুদ্ধে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের এক মাসের সমপরিমাণ বেতন ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নূশরাত হাছনীনের বিরুদ্ধে পটুয়াখালী ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একাধিকবার ঘুষ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
গত নভেম্বর মাসে দৈনিক কালবেলায় প্রকাশিত “মিনিস্ট্রি অডিটে ঘুষের রেট এক মাসের বেতন” শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশের পর ডিআইএ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টি নিয়ে আলাদাভাবে অনুসন্ধান শুরু করে। তদন্তের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় চারজন কর্মকর্তাকে দপ্তর থেকে সরিয়ে দেয়। এই ঘটনা শিক্ষাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার দিকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সূত্র: কালবেলা

