গত এক দশকে বাংলাদেশ উন্নয়নের মানচিত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতির স্বাক্ষর রেখেছে। সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ডিজিটাল সেবা—পরিবর্তনের ছাপ সর্বত্র স্পষ্ট। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার ভেতরেই এক নীরব সংকট আমাদের ভবিষ্যৎকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে—আর সেটি হলো ‘দুর্নীতি’। এটি কেবল অর্থের অপচয় নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে, আইনের শাসনকে ক্ষয় করে এবং নাগরিকের আস্থাকে ভেঙে দেয়। যখন ঘুষ ও অনিয়ম দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে ওঠে, তখন উন্নয়নের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না।
এই বাস্তবতায় ‘দুর্নীতির প্রতি শূন্য সহনশীলতা’ কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হতে পারে না। এর অর্থ হওয়া উচিত—দুর্নীতির প্রতিটি ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত; কেন এবং কীভাবে সেই খাতে অনিয়ম ঘটছে তার গভীর অনুসন্ধান এবং এমন টেকসই প্রতিকার খুঁজে বের করা, যা দুর্নীতিকে নির্মূল বা অন্তত উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম। অর্থাৎ প্রতিক্রিয়াশীল নয়—প্রতিরোধমূলক ও কাঠামোগত সংস্কারই নীতির কেন্দ্রবিন্দু।
আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মূল্যায়ন—দুই ক্ষেত্রেই উদ্বেগের ইঙ্গিত স্পষ্ট। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এর দুর্নীতির ধারণা সূচক (CPI)–এ বাংলাদেশ দীর্ঘদিন নিম্ন অবস্থানে রয়েছে। যদিও এটি ধারণাভিত্তিক সূচক; তবুও প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও জনসেবায় ঘুষ–অনিয়ম নিয়ে নাগরিকদের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন এতে প্রতিধ্বনিত হয়।
দুর্নীতি প্রতিরোধে দেশে সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামো বিদ্যমান। দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত ও মামলা পরিচালনা করে; ব্যাংক খাত তদারকিতে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক; আর্থিক বাজারে নজরদারি করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। তবুও ব্যাংকঋণ কেলেঙ্কারি, টেন্ডার কারসাজি, কর ফাঁকি কিংবা প্রকল্প ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি—এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি জনমনে একটাই প্রশ্ন জাগায়, আইনের প্রয়োগ কি সবার জন্য সমান? নাকি প্রভাবশালীদের জন্য আলাদা নিয়ম?
এই প্রশ্নের জবাবেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নৈতিক শক্তি। উন্নয়নের ধারাকে টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক করতে হলে এখনই প্রয়োজন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্যিকারের শূন্য সহনশীলতা—কথায় নয়, কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপে।শূন্য-সহনশীলতা নীতি বলতে এমন একটি অবস্থানকে বোঝায়, যেখানে কোনো নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় বা নমনীয়তা দেখানো হয় না; প্রতিটি লঙ্ঘনের জন্য শাস্তি আরোপ করা হয়। অর্থাৎ অপরাধের মাত্রা বড় বা ছোট—এই পার্থক্য না করে কঠোর প্রয়োগই এখানে মূল দর্শন।
“জিরো টলারেন্স” (Zero Tolerance) শব্দবন্ধটির প্রথম নথিভুক্ত ব্যবহার ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়। তবে এর নীতিগত ভিত্তি আরও স্পষ্ট হয় ১৯৭৩ সালে নিউ জার্সিতে গৃহীত “Safe and Clean Neighborhoods” আইনকে ঘিরে। ওই আইনের মূল ধারণা ছিল—ছোটখাটো অপরাধ বা বিশৃঙ্খলাকে উপেক্ষা করলে তা বড় অপরাধের পথ প্রশস্ত করে; তাই শুরুতেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
১৯৮২ সালে মার্কিন সাময়িকী The Atlantic Monthly–এ James Q. Wilson এবং George L. Kelling “Broken Windows Theory” বা ‘ভাঙা জানালা তত্ত্ব’ নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, এলাকার ছোটখাটো অব্যবস্থা যেমন: ভাঙা জানালা, দেয়ালে গ্রাফিতি বা পথেঘাটে বিশৃঙ্খলা—অপরাধ বিস্তারের ইঙ্গিত দেয় এবং সময়মতো তা দমন না করলে গুরুতর অপরাধ বাড়তে পারে। এখান থেকেই ছোট অপরাধ দমনে কঠোর পুলিশি পদক্ষেপের ধারণা জনপ্রিয় হয়, যা পরবর্তীতে “জিরো টলারেন্স” নীতির ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে এই নীতির সমালোচনা কম নয়। অনেক গবেষক মনে করেন, শূন্য-সহনশীলতা প্রয়োগের ফলে সামাজিক সমস্যাগুলোকে নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করা হয়। এতে গৃহহীনতা বা দারিদ্র্যের মতো সামাজিক বাস্তবতাকে অপরাধ হিসেবে দেখা শুরু হয়। সমালোচকরা বলেন, এই পদ্ধতি প্রায়ই নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বেশি কঠোরভাবে প্রয়োগ হয় এবং রাস্তার অপরাধ দমন হলেও হোয়াইট-কলার বা উচ্চপর্যায়ের অপরাধ অনেক সময় আড়ালে থাকে।
শূন্য-সহনশীলতা নীতির ইতিহাস একদিকে কঠোর আইনপ্রয়োগের ধারণাকে শক্তিশালী করেছে, অন্যদিকে সামাজিক ন্যায় ও সমতার প্রশ্নও উত্থাপন করেছে। তাই এর কার্যকর প্রয়োগের জন্য কঠোরতার সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিকোণ অপরিহার্য।
বাংলাদেশে দুর্নীতির বাস্তবতা আজ গভীরভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ পাচার ও জালিয়াতি—এসব অনিয়ম শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং প্রশাসন, আর্থিক খাত ও জনসেবার বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে থাকা কাঠামোগত সমস্যা। এর ফলে সরকারি ও বেসরকারি সেবার মান কমে যাচ্ছে, নাগরিক ভোগান্তি বাড়ছে এবং উন্নয়নের সুফল সমানভাবে পৌঁছায় না।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মূল্যায়নেও এই উদ্বেগ প্রতিফলিত হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ– এর জরিপগুলোতে প্রশাসনিক কার্যক্রম, বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির উচ্চমাত্রার চিত্র উঠে এসেছে। সিপিআই (CPI)–এর তথ্যও দেখায়, বাংলাদেশের অবস্থান দীর্ঘদিন যাবৎ চ্যালেঞ্জপূর্ণ। এগুলো প্রমাণ করে দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক নয়, সুশাসনের মূল ভিত্তিকেও আঘাত করছে।
সেবাখাতে ঘুষের অভিযোগ বহু পুরোনো। ভূমি অফিস, পাসপোর্ট অফিস, সরকারি হাসপাতাল বা থানায় প্রাপ্য সেবা পেতে নাগরিকদের অনৈতিক লেনদেনের শিকার হতে হয়। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি যোগ্যতার পরিবর্তে প্রভাবকে প্রাধান্য দেয়, যা প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও ন্যায়বিচারকে ক্ষুণ্ন করে।
উন্নয়ন প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ প্রায়শই সামনে আসে। রাস্তা, সেতু বা অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় বৃদ্ধি, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার বা সময়ক্ষেপণ—এসব শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, জনআস্থা কমিয়ে দেয়। অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচারের প্রবণতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। ব্যাংকিং খাত ও ঋণ কেলেঙ্কারি সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও দৃশ্যমান ও দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত হয় না, ফলে জনমনে হতাশা ও অবিশ্বাস তৈরি হয়। যখন আইনের প্রয়োগ সবার জন্য সমান হয় না—এমন ধারণা গড়ে ওঠে, তখন গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে দুর্নীতির বাস্তব চিত্র তাই কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকট, যা অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করছে। এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এখন প্রশ্ন আসছে, জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবে কেন কার্যকর হয় না। জিরো টলারেন্স বা ‘কোনো ছাড় নেই’ নীতি শোনতে যত কঠোর মনে হয়, বাস্তবে এটি প্রায়শই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দিতে ব্যর্থ হয়। মূল কারণ হলো এই নীতি পরিস্থিতির গভীরতা বা প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে সব অপরাধের জন্য একই ধরনের কঠোর শাস্তি আরোপ করে। মানুষের আচরণ জটিল, অপরাধের কারণ ভিন্ন এবং নীতি প্রয়োগকারীদের বিচক্ষণতা ও বিচারবুদ্ধি সীমিত হয়—ফলস্বরূপ কখনও কখনও ন্যায়বিচার নষ্ট হয় এবং দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের বদলে নতুন সমস্যা তৈরি হয়।
অনেক সময় ছোটখাটো অপরাধেও বড় শাস্তি দেওয়ার ফলে জনমনে ভীতি, ক্ষোভ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ- আত্মরক্ষার জন্য বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের মতো ঘটনা একইভাবে কঠোর শাস্তির আওতায় পড়ে। এছাড়াও আইন প্রয়োগকারীরা যখন পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের বিচারবুদ্ধি বা বিচক্ষণতা ব্যবহার করতে পারেন না, তখন অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বেড়ে যায়।
শুধু শাস্তি আরোপ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। জিরো টলারেন্স নীতি প্রায়শই সমস্যার মূল কারণ সামাজিক, পারিবারিক বা মনস্তাত্ত্বিক—সমাধানে মনোযোগ দেয় না। এর ফলে লক্ষণ দূর হলেও, অপরাধের পুনরাবৃত্তি কমানো যায় না। গবেষণায় দেখা গেছে, এই নীতি সহিংসতা বা অপরাধ কমাতে প্রায়ই ব্যর্থ হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।
সংক্ষেপে, যখন বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং অপরাধের কারণ ভিন্ন হয়, তখন সব ক্ষেত্রে ‘একই লাঠিতে সবাইকে মাপা’ নীতি কার্যকর হয় না। তাই কঠোরতা বজায় রাখার পাশাপাশি পরিস্থিতি, প্রেক্ষাপট এবং অপরাধীর প্রোফাইল বিবেচনা করে ন্যায়বিচার ও পুনর্বাসনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণই দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ হ্রাসে কার্যকর।
জিরো টলারেন্স বা শূন্য-সহনশীলতা নীতি বাস্তবে কার্যকর করতে হলে অপরাধ বা নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া যাবে না। এর অর্থ হলো প্রতিটি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এটি কেবল শাস্তির কঠোরতার বিষয় নয়; অপরাধের ওপর নিরপেক্ষ প্রয়োগ, আইনের শাসন ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং কোনো ব্যক্তিগত আবেগ, প্রভাব বা পরিস্থিতি বিচার প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় না আনা জরুরি।
নীতির সফল বাস্তবায়নের জন্য অপরাধ ঘটার সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিক ও কঠোর শাস্তি আরোপ করা অত্যাবশ্যক। অপরাধী বা লঙ্ঘনের ধরন নির্বিশেষে আইন প্রয়োগকারীদেরকে শুধুমাত্র অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে, যাতে কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে অবহেলা বা অনিশ্চয়তা থাকে না। একই সঙ্গে কোন কোন কর্মকাণ্ড জিরো টলারেন্সের আওতায় পড়বে যেমন: মাদকদ্রব্য ব্যবহার, র্যাগিং, সহিংসতা—এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা থাকা জরুরি।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা নীতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের সর্বস্তরে এই নীতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হলে নাগরিকরা স্বয়ং নিয়ম মানতে উৎসাহী হয়। অপরাধের বিচারে দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে দ্রুততম সময়ে শাস্তি কার্যকর করা অপরিহার্য, যাতে ন্যায়বিচার প্রক্রিয়া বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর হয়।
যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য কিছু কাঠামোগত পদক্ষেপও অপরিহার্য। দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যক্রমে সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, দক্ষ প্রসিকিউশন এবং সময়সীমাবদ্ধ বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে বিশেষ আদালত এবং ডিজিটাল কেস-ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করা যেতে পারে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের বার্ষিক সম্পদ-ঘোষণা প্রকাশ করা এবং স্বার্থ-সংঘাত নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা দরকার।
ই-গভর্ন্যান্স ও উন্মুক্ত তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে দরপত্র, প্রকল্প অগ্রগতি এবং ব্যয়ের তথ্য রিয়েল-টাইমে সহজলভ্য করা সম্ভব। ডিজিটাল পেমেন্ট এবং সার্ভিস ডেলিভারি প্রসারিত করলে ঘুষের সুযোগ কমে যায়। ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারে ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, বড় ঋণের কেন্দ্রীয় নজরদারি, খেলাপি পুনরুদ্ধারে দ্রুত ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থা এবং ইনসাইডার ট্রেডিং বা কারসাজিতে তাৎক্ষণিক শাস্তি কার্যকর করা জরুরি।
একই সঙ্গে হুইসেলব্লোয়ারদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তথ্যদাতার পরিচয় ও নিরাপত্তা রক্ষা করা এবং প্রণোদনার মাধ্যমে তাদের উৎসাহিত করা নীতির কার্যকারিতা বাড়ায়। নাগরিক অংশগ্রহণ এবং শিক্ষা জোরদার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল-কলেজে নৈতিকতা ও নাগরিক শিক্ষার প্রচার, সিভিল সোসাইটি ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করলে জিরো টলারেন্সের নীতি আরও টেকসই ও কার্যকর হয়ে ওঠে।
সংক্ষেপে বলা যায়, জিরো টলারেন্স বাস্তবায়ন শুধুমাত্র কঠোর শাস্তি আরোপের বিষয় নয়। এটি মানসিকতার পরিবর্তন, স্বচ্ছতা, দ্রুত বিচার, কাঠামোগত সমর্থন এবং নাগরিক অংশগ্রহণের সমন্বয়ে সম্ভব। এই সব উপাদান একত্রিত হলে নীতি কার্যকর হয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও প্রযুক্তির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি, অনিয়ম এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করতে গণমাধ্যম এবং প্রযুক্তির ভূমিকা অপরিহার্য। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্নীতি উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কেলেঙ্কারি উদঘাটন করে জনমনে সচেতনতা সৃষ্টি করে, যার ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করা যায়। গণমাধ্যম শুধু তথ্য প্রচারের মাধ্যম নয়; এটি জনগণের চোখ এবং কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে, সমাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক।
প্রযুক্তিও দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর হাতিয়ার। অনলাইন সেবা, ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-টেন্ডারিং এবং ই-প্রকিউরমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে ঘুষ বা অনিয়মের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। ডাটা অ্যানালিটিক্স, ব্লকচেইন ভিত্তিক রেকর্ড এবং স্বয়ংক্রিয় মনিটরিং সিস্টেম ব্যবহার করে দুর্নীতিবাজদের দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়। প্রযুক্তি শুধু সেবার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে না, এটি নিয়ম ভঙ্গের তথ্য সংগ্রহ এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার জন্য শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে।
গণমাধ্যম দুর্নীতির খবর প্রকাশ করে জনমত তৈরি করে এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে জনগণ জানতে পারে কীভাবে প্রশাসনিক অনিয়ম ঘটে, কারা প্রভাবশালী হয় এবং রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরাপদ এবং স্বচ্ছ সেবা প্রদান যেমন: ভর্তি প্রক্রিয়া, অনলাইন ফি পেমেন্ট, দরপত্র ও সরকারি সেবা ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে দুর্নীতির সুযোগ কমায়। স্মার্ট গণমাধ্যম ব্যবহার করে সংবাদ পরিবেশন আরও কার্যকর ও দ্রুত করা সম্ভব।
সার্বিকভাবে গণমাধ্যম ও প্রযুক্তির যৌথ প্রচেষ্টা দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যখন জনসচেতনতা এবং স্বচ্ছতা প্রযুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত হয়, তখন জিরো টলারেন্স নীতি শুধু কাগজে নয়, বাস্তবে সফলভাবে রূপ লাভ করতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩টি জেলা বিশেষভাবে সংবেদনশীল। তিনি বলেন, “যদিও এখানে বিভিন্ন সমস্যা বিদ্যমান, আমরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করব। আমাদের লক্ষ্য কাজের মাধ্যমে উন্নয়ন নিশ্চিত করা। আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে আমরা দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে চাই।”
মন্ত্রী আরও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পাহাড়ি এলাকায় কোনো প্রকার দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না। তিনি বলেন, “দুর্নীতি এবং ভূমি দস্যুদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান সম্পূর্ণ শূন্য-সহনশীলতা বা ‘জিরো টলারেন্স’। প্রয়োজনে কমিটি গঠন করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এছাড়া মন্ত্রী জানান, বান্দরবানের লামা উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হবে এবং ধাপে ধাপে এটি অন্যান্য উপজেলায় সম্প্রসারণ করা হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স কেবল একটি নীতি বা ঘোষণাই নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, আইনশৃঙ্খলা এবং জনগণের আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বর্তমান বাস্তবতায় যেখানে সরকারি-বেসরকারি সেবা, ব্যাংকিং খাত বিভিন্ন সেক্টরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে দুর্নীতি প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’, ১৮০ দিনের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এখন অপেক্ষার পালা দুর্নীতি প্রতিরোধে কতটুকু কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

