একের পর এক শিশুর জীবন বিনষ্ট হচ্ছে সমাজের নৃশংসতার বলি হয়ে। কখনো ধর্ষণ, কখনো ধর্ষণের পর নির্মম হত্যা, কখনো বা সম্পত্তি-বিরোধ ও পারিবারিক কোন্দলের জেরে ঘটে যাচ্ছে শিশুদের মর্মান্তিক মৃত্যু। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আমাদের সমাজে শিশুদের ওপর যে বর্বরতা চলছে, তা নির্মমভাবে প্রকাশ করছে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ধর্ষণের পর গলাকাটা অবস্থায় উদ্ধার হওয়া সাত বছরের শিশু ইরা গতকাল মঙ্গলবার (৩ মার্চ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। তার মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতার বিরুদ্ধে এবং শিশুর হত্যাকারীর কঠোর শাস্তি দাবি করে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শিশুটি যে বর্বরতার শিকার হয়েছে, তা সমাজে নরপশুর মতো আচরণের প্রতি গভীর রোষ সৃষ্টি করেছে।
রাজধানীর গেন্ডারিয়া থানার এলাকা থেকে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয় প্লাস্টিকের ড্রামের ভিতর। প্রতিবেশী তুচ্ছ কারণে শিশুটিকে হত্যা করে লাশ লুকানোর চেষ্টা চালায়। একই সঙ্গে দিনাজপুরে সম্পত্তির লোভে শিশু সিরাজুল আল শামসকে হত্যা করা হয়। ফরিদপুরে এক শিশু শ্রমিককে কাজের সময় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, এমন ঘটনায় সমাজে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তীব্র হয়ে উঠেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা বেড়ে চলেছে। এটি বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতাকে আরও প্রকট করে তুলছে। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব, সামাজিক অস্থিরতা, অনৈতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার এবং নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি শিশুরা বারবার নৃশংসতার শিকার হওয়ার মূল কারণ।
রাষ্ট্রকে শিশুদের প্রতি আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। একই সঙ্গে পরিবারগুলোকেও সচেতন হয়ে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শুধুমাত্র এই পদক্ষেপই সমাজে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং নৃশংসতা রোধ করতে সক্ষম।
অপরাধ প্রবণতা ও শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে যা বলেছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হেলাল উদ্দিন:
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ সংবাদ মাধ্যমে বলেন, শিশুদের ওপর সহিংসতার মূল কারণের মধ্যে প্রথমেই আসে তাদের দুর্বলতা। “শিশুরা সহজ টার্গেট, তারা তুলনামূলকভাবে সুরক্ষাহীন। অপরাধীরা জানে, তাদের দিক থেকে প্রতিরোধ আসবে না। তাই শিশুরা সহজে টার্গেট হয়ে যায়,” তিনি উল্লেখ করেন।
দ্বিতীয়ত, সমাজ ও পরিবার শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়ে পর্যাপ্ত সচেতন নয়। ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, “আমরা শিশুদের পরোক্ষ নিরাপত্তা দিচ্ছি—বাচ্চাদের ঘরে রাখছি, নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু প্রত্যক্ষ নিরাপত্তা দিতে পারছি না। কীভাবে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, কীভাবে আত্মরক্ষা করতে হবে, সে শিক্ষা পরিবার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দিচ্ছে না। এটি শেখানো অত্যন্ত জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—সবকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নিতে হবে। “শুধুমাত্র ঘরে নিরাপদ রাখা যথেষ্ট নয়। শিশুদের বাইরের পরিবেশেও নিজের সুরক্ষা করার ক্ষমতা দিতে হবে। এটি তাদের জন্য অপরিহার্য শিক্ষা,” তিনি যোগ করেন।
সামাজিক অপরাধ বিষয়ক বিশ্লেষণ দিয়েছেন ড. তৌহিদুল হক:
সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যাসহ এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত বিচার বা শাস্তি না হওয়ায় অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে।”
তিনি আরও বলেন, “শিশুর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে বিচার বিলম্বিত হয়, বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত কম হয়, এবং দোষী নানা কায়দায় অভিযোগ থেকে মুক্তি পায়। ফলে আমাদের রাষ্ট্র বা সমাজ শিশুদের জন্য নিরাপদ নয়। শিশুবান্ধব আইনি কাঠামো যথেষ্ট নেই, এবং প্রাপ্তবয়স্কদের দায়িত্বশীল আচরণের ক্ষেত্রেও ঘাটতি দেখা দেয়। যদি রাষ্ট্র ও সমাজ মিলিতভাবে এই সংকট দূর করতে পারে এবং শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবে এই ধরনের অপরাধের প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে।”
শিশুদের ওপর সহিংসতা নিয়ে পরিসংখ্যান কী বলছে?
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে শিশুদের প্রতি অমানবিক আচরণ ও সহিংসতার ঘটনা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। সংগঠনটি শিশু নির্যাতনকে সমাজের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবাধিকার সংকটগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক নির্যাতন ও হত্যার পাশাপাশি নারী ও শিশুর আত্মহত্যার হার সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও বিচারহীনতার গভীর সংকটকে প্রমাণ করছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ২৪৩টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। পরের মাসে, অর্থাৎ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এই সংখ্যা বেড়ে ২৫৭টি হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ঘটেছে ২৫৩টি। ধর্ষণের ঘটনা জানুয়ারিতে ৩৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৩টি, যেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু ও কিশোরী রয়েছে। দলবদ্ধ ধর্ষণের সংখ্যা জানুয়ারিতে ১১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১২টি। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা জানুয়ারিতে ৩টি এবং ফেব্রুয়ারিতে ৫টি। এমএসএফ জানায়, যৌন নিপীড়নসহ শিশু ও নারীর প্রতি সহিংসতা ক্রমাগত বাড়ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন বলেন, “সামাজিক অস্থিরতা শিশু নির্যাতনের অন্যতম প্রধান কারণ। তবে শিশুর ওপর যে অপরাধগুলি ঘটছে, সেগুলোতে পুলিশ যথাযথ আইনগত পদক্ষেপ নিচ্ছে। সব ঘটনার গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হয়।”
তিনি আরও বলেন, “বিচার নিশ্চিত করা আদালতের দায়িত্ব। তবে শিশুদের প্রতি সহিংসতা বা এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধি করা খুবই জরুরি। শুধুমাত্র পুলিশি পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়, পরিবার ও সমাজকেও সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নিতে হবে।
শিশুদের ওপর ক্রমবর্ধমান সহিংসতা আমাদের সমাজের এক গোপন কিন্তু ভয়াবহ বাস্তবতা। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া, বিচারবিচ্ছিন্নতা, এবং সামাজিক অস্থিরতা শিশুরা বারবার নৃশংসতার শিকার হওয়ার প্রধান কারণ। রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজ—তিনটি ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীলতা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা ছাড়া শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ বা পুলিশি পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়; শিশুরা যাতে নিজের সুরক্ষা জানে, আত্মরক্ষার শিক্ষায় দক্ষ হয়, এবং নিরাপদ পরিবেশে বড় হতে পারে—এটাই সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। শিশুদের নিরাপত্তা রক্ষাই আমাদের মানবিক দায়িত্ব, এবং এ দায়িত্ব সবাইকে সম্মিলিতভাবে গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে একটিও শিশুর জীবন অমানবিক নৃশংসতার বলি না হয়।

