অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে আইন মন্ত্রণালয়ে সাব-রেজিস্ট্রার বদলি নিয়ে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মাত্র আট মাসে বদলি প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে শতকোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সময়কাল। বলা হচ্ছে, সাব-রেজিস্ট্রার বদলির ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। বরং অর্থের বিনিময়ে পছন্দের কর্মস্থলে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর ২০২৪ থেকে এপ্রিল ২০২৫—এই আট মাসে নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে অন্তত ২৮২ জনকে বদলি করা হয়। সংখ্যাটি নজিরবিহীন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অতীতে এত স্বল্প সময়ে এত বেশি বদলির ঘটনা ঘটেনি।
অভিযোগ রয়েছে, বদলির জন্য জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২০০ জন সাব-রেজিস্ট্রার ঘুষের মাধ্যমে পছন্দের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পোস্টিং নেন। অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে বদলির আদেশ স্থগিত রাখার প্রমাণও মিলেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, কিছু কর্মকর্তাকে ছয় থেকে সাত মাসের মধ্যে তিন থেকে চার বার পর্যন্ত বদলি করা হয়েছে। এতে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ও সেবার ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বদলি প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ না হয়, তবে পুরো প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ভূমি ও সম্পত্তি নিবন্ধনের মতো স্পর্শকাতর খাতে এমন অভিযোগ জনআস্থাকে গভীরভাবে নাড়া দিতে পারে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে অভিযোগের পরিমাণ ও ব্যাপ্তি বিবেচনায় বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে। সাব-রেজিস্ট্রার বদলির ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। সেই বিধান অনুযায়ী ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একই গ্রেডের কর্মকর্তাদেরই পদায়ন করার কথা। অর্থাৎ ‘এ’ গ্রেডের কর্মকর্তা যাবেন ‘এ’ গ্রেডের কার্যালয়ে, আর ‘সি’ গ্রেডের কর্মকর্তা ‘সি’ গ্রেডের অফিসে।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ওই আট মাসে এই নীতিমালা মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নির্ধারিত বিধান উপেক্ষা করে ঘুষের বিনিময়ে ‘সি’ ও ‘বি’ গ্রেডের বহু সাব-রেজিস্ট্রারকে উচ্চতর গ্রেডের অফিসে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ‘এ’ গ্রেডের কয়েকজন সাব-রেজিস্ট্রারকে ‘শাস্তিমূলকভাবে’ নিচের গ্রেডের অফিসে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু একবার নয়, অনেককে বারবার বদলির মুখে পড়তে হয়েছে। কারও কারও ক্ষেত্রে যোগদানের আগের দিনই নতুন বদলির চিঠি দেওয়া হয়েছে। এতে প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ যখন তীব্র আকার নেয়, তখন গত বছরের ১ জুন আইন মন্ত্রণালয় একটি সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি জারি করে। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়, জেলার রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার বদলি ও পদায়নে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনের সুযোগ নেই। পাশাপাশি অসাধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রলোভন ও প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই শত শত সাব-রেজিস্ট্রারের বদলিতে বিপুল অঙ্কের ঘুষ লেনদেন সম্পন্ন হয়। বিজ্ঞপ্তি জারির পর আর কোনো নতুন বদলির আদেশ হয়নি বলে জানা গেছে।
নিবন্ধন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সাব-রেজিস্ট্রার বদলিকে ঘিরে ‘ঘুষ-বাণিজ্য’ নতুন নয়। তাদের ভাষ্য, “দীর্ঘদিন ধরেই এমন লেনদেন চলে আসছে। তবে আগে অন্তত সরকারি নীতিমালার একটি কাঠামো মানা হতো। অন্তর্বর্তী সরকারের ওই আট মাসে সেই ন্যূনতম বিধিও অনুসরণ করা হয়নি। দুদক বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যদি শুধু নীতিমালা ভঙ্গের বিষয়টি তদন্ত করে, তাহলে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ মিলবে।”
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের মুখপাত্র ও মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন বলেন, পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন বা অন্য কোনো মাধ্যমে অভিযোগ দুদকের নজরে এলে তা খতিয়ে দেখা হবে। তিনি জানান, প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা বা অন্য যে কেউ হোক, কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
তথ্য অনুযায়ী, আসিফ নজরুল ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর কয়েকজন জেলা রেজিস্ট্রারের পদোন্নতি ও বদলির আদেশ দেন। সাব-রেজিস্ট্রারদের ক্ষেত্রে প্রথম বদলির আদেশ আসে একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর। ওই আদেশে ১৭ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এতে ‘সি’ গ্রেডের কয়েকজন কর্মকর্তাকে ‘এ’ গ্রেডের অফিসে বদলি করে নীতিমালা লঙ্ঘন করা হয়।
ওই আদেশে মনীষা রায়কে নীলফামারীর জলঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে বদলি করা হয়। চার মাস পর ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তাকে আবার হরিপুর থেকে দিনাজপুরের হাকিমপুরে বদলি করা হয়। কিন্তু হাকিমপুরে যোগদানের আগের দিনই তাকে ফের ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে বদলির চিঠি দেওয়া হয়।
একইভাবে ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল রেহানা পারভীনকে বরিশালের রহমতপুর থেকে ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ায় বদলি করা হয়। তবে দুদিনের মধ্যে, ১১ এপ্রিল, তিনি আবার বদলি নিয়ে বরিশালের মুলাদীতে যোগ দেন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে সঞ্জয় কুমার আচার্য্যকে চট্টগ্রাম সদর থেকে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে বদলি করা হয়। দুদিন পরই তিনি আবার বদলি নিয়ে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় যোগ দেন।
এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের কাশিয়ানির সাব-রেজিস্ট্রার শাহ আব্দুল আরিফকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বদলি করা হয়। তবে যোগদানের আগের দিন, ৬ অক্টোবর, সেই বদলি স্থগিত করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। একটির পর একটি এমন ঘটনায় বদলি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের আমলে জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার বদলিসংক্রান্ত অন্তত ১৬টি আদেশ জারি হয়। ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচটি আদেশে মোট ৮৭ জনকে বদলি করা হয়। ওই সময়ে ৪ সেপ্টেম্বর ১০ জন, ২৯ সেপ্টেম্বর ১৭ জন, ৭ অক্টোবর ৫ জন, ১ ডিসেম্বর ৩৮ জন এবং ১৯ ডিসেম্বর ১৭ জন সাব-রেজিস্ট্রার বদলি হন।
২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত ১১টি আদেশে বদলি করা হয় ১৯৫ জনকে। এর মধ্যে ১৩ জানুয়ারি ৫ জন, ১৫ জানুয়ারি ১২ জন, ৩ ফেব্রুয়ারি ১৭ জন, ৫ ফেব্রুয়ারি ১০ জন, ৯ ফেব্রুয়ারি ২ জন, ১৯ ফেব্রুয়ারি ৩৬ জন, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২ জন, ১৭ মার্চ ২৬ জন, ৯ এপ্রিল ৩৬ জন, ১০ এপ্রিল ৪ জন এবং ২৭ এপ্রিল ৪৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করা হয়। সবচেয়ে বেশি বদলি হয়েছে ২০২৫ সালেই। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অন্তত ২০০ জন সাব-রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার বিনিময়ে পছন্দের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যমান নীতিমালার বিধান:
২০০৯ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে তৎকালীন আইন সচিব কাজী হাবিবুল আউয়ালের স্বাক্ষরে জারি করা প্রজ্ঞাপনের আলোকে সাব-রেজিস্ট্রার বদলির নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, সরকার অনুমোদিত ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ শ্রেণির অফিস অনুযায়ী বদলি কার্যকর হবে।
নবনিযুক্ত সাব-রেজিস্ট্রারদের ‘সি’ শ্রেণির অফিসে পদায়নের কথা বলা হয়েছে। বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি স্থায়ী হলে ‘সি’ শ্রেণিতে পাঁচ বছর সন্তোষজনক চাকরির পর জ্যেষ্ঠতা ও মেধার ভিত্তিতে ‘বি’ শ্রেণিতে পদায়ন সম্ভব। একইভাবে ‘বি’ শ্রেণিতে পাঁচ বছর কাজের পর সুযোগ থাকলে ‘এ’ শ্রেণির অফিসে পদায়ন করা যাবে।
কোনো কর্মকর্তার কার্যক্রম অসন্তোষজনক হলে জনস্বার্থে তাকে নিম্নশ্রেণির অফিসে বদলি করা যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত কারণ উল্লেখ করতে হবে। সাধারণত তিন বছর এক অফিসে কর্মরত থাকার কথা থাকলেও জনস্বার্থে মেয়াদের আগেই বদলি করা যেতে পারে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, একবার ঢাকা বা চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় কাজ করলে পরবর্তী ছয় বছরে সেখানে পুনরায় পদায়ন করা যাবে না। রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকায় কাজ করলে পরবর্তী তিন বছরে সেখানে ফের পদায়ন সম্ভব নয়। ঢাকা বা চট্টগ্রাম জেলায় কাজ করলে ছয় বছর এবং গাজীপুর বা নারায়ণগঞ্জ জেলায় কাজ করলে তিন বছরের মধ্যে পুনরায় একই জেলায় পদায়ন করা যাবে না।
একই অফিসে দ্বিতীয়বার পদায়নের সুযোগ নেই। অবসরোন্মুখ কর্মকর্তারা আবেদনের ভিত্তিতে নিজ জেলা বা পাশের জেলায় পদায়নের সুযোগ পেতে পারেন। স্বামী বা স্ত্রীর কর্মস্থলের বিষয় বিবেচনায় কর্তৃপক্ষ বিশেষ ক্ষেত্রে বিধান শিথিল করতে পারে। কয়েকজন সাব-রেজিস্ট্রার অভিযোগ করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই বিদ্যমান নীতিমালা উপেক্ষা করা হয়েছে।
সূত্র: খবরের কাগজ

