বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের বড় একটি অংশ অনলাইন গেমে গভীরভাবে যুক্ত। স্মার্টফোন, ট্যাব কিংবা কম্পিউটারে জনপ্রিয় নানা গেম এখন তাদের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। নতুন প্রজন্ম দ্রুত এই ভার্চুয়াল জগতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে।
তবে বিনোদনের এই পরিসরে নীরবে বিস্তার ঘটছে সাইবার প্রতারণার। প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, গেমের আড়ালে সংগঠিত চক্র কৌশলে শিশু-কিশোরদের টার্গেট করছে। সহজ-সরল মনোভাব এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে সীমিত ধারণাকে কাজে লাগানো হচ্ছে নানা ফাঁদে।
কীভাবে ঘটছে প্রতারণা: অনলাইন গেমকে কেন্দ্র করে কয়েক ধরনের প্রতারণা বেশি দেখা যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ।
ফ্রি ডায়মন্ড বা রিওয়ার্ডের প্রলোভন: জনপ্রিয় গেমে বিনামূল্যে ডায়মন্ড বা রিওয়ার্ড দেওয়ার কথা বলে ভুয়া লিংকে ক্লিক করানো হয়। এতে ব্যক্তিগত তথ্য বা ব্যাংকিং তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হয়।
ফেক আইডি ও চ্যাটিং ফাঁদ: গেমের ভেতরের চ্যাট অপশন ব্যবহার করে অচেনা ব্যক্তি বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। পরে ব্ল্যাকমেইল বা অর্থ দাবি করা হয়।
ফিশিং লিংক: গেম আপডেট বা টুর্নামেন্টের নামে ভুয়া ওয়েবসাইটে নিয়ে গিয়ে লগইন তথ্য চুরি করা হয়।
ইন-অ্যাপ পারচেজ প্রতারণা: অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকের অজান্তে কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে গেম আইটেম কেনা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রতারণা ঠেকাতে শুধু প্রযুক্তি নয়, সচেতনতারও প্রয়োজন।
গেমিংয়ে নজর রাখার উপায়: শিশু অনলাইনে কী করছে তা জানতে সরাসরি জেরা না করে কৌশলে বোঝার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি।
পেরেন্টাল কন্ট্রোল ব্যবহার: Google Family Link-এর মতো অ্যাপ ব্যবহার করে গেম ডাউনলোড, খেলার সময়সীমা ও ব্যবহারের ধরন নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
গেমের রেটিং যাচাই: ডাউনলোডের আগে বয়সভিত্তিক রেটিং দেখে নেওয়া উচিত। এতে বোঝা যায় গেমটি কোন বয়সের জন্য উপযুক্ত।
বিশ্বস্ত উৎস থেকে ডাউনলোড: ভুয়া ওয়েবসাইটে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে কমবয়সিদের টার্গেট করা হচ্ছে। তাই কেবল বিশ্বাসযোগ্য প্ল্যাটফর্ম থেকেই গেম নেওয়া প্রয়োজন।
ওপেন স্পেস গেমিং: দরজা বন্ধ করে একা না খেলে পরিবারের সামনে গেম খেলার অভ্যাস গড়ে তুললে নজরদারি সহজ হয়।
অনলাইন বন্ধুদের সম্পর্কে জানা: লাইভ চ্যাট অপশন থাকলে সন্তান কার সঙ্গে কথা বলছে তা খেয়াল রাখা দরকার। অপরিচিত কাউকে ব্যক্তিগত তথ্য দিচ্ছে কিনা সেটিও দেখা উচিত।
অভিভাবকদের করণীয়: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। দরকার নিয়মিত সংলাপ ও আস্থা তৈরি।
- সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন। সে কোন গেম খেলছে এবং কার সঙ্গে খেলছে তা জানুন।
- গেম ও ডিভাইসে প্রাইভেসি সেটিংস চালু রাখুন।
- ফ্রি রিওয়ার্ড বা উপহারের লোভে অচেনা লিংকে না যাওয়ার শিক্ষা দিন।
- বাস্তবে না চেনা কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করতে সতর্ক করুন।
- কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিং তথ্য সন্তানের নাগালের বাইরে রাখুন।
- নির্দিষ্ট সময়ের বেশি গেম খেলা নিরুৎসাহিত করুন।
ডিজিটাল যুগে অনলাইন গেম পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তবে দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহার শেখানো গেলে ঝুঁকি কমানো যায়। পরিবারে প্রযুক্তি ব্যবহারের স্পষ্ট নীতি ও সচেতন আলোচনা শিশুদের সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সতর্কতা ও নজরদারি বাড়ালে সাইবার প্রতারণার আশঙ্কা অনেকটাই কমে আসবে।

