লন্ডনের আর্থিক খাতে হঠাৎই অপ্রত্যাশিত এক ঝড় বয়ে গেছে। মার্কেট ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশনস (এমএফএস) নামের একটি প্রতিষ্ঠান প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে চলে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শতকোটি পাউন্ডের আর্থিক ঘাটতি ও জালিয়াতির অভিযোগ। বিষয়টি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের পতনের গল্প নয়; বরং আন্তর্জাতিক ব্যাংক খাত, বেসরকারি ঋণ বাজার এবং বাংলাদেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিদেশি সম্পদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে।
প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে একই সম্পদের বিপরীতে একাধিকবার ঋণ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমন কর্মকাণ্ড এমএফএসের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শ্যাডো ব্যাংকিং এবং স্বল্প-নিয়ন্ত্রিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে বৈশ্বিক অর্থপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কেট ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশনস বা এমএফএস বাংলাদেশের পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীকে সম্পত্তি কেনার জন্য বড় অঙ্কের ঋণ দিয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) তার সম্পদের বিষয়ে তদন্ত করছে।
ব্লুমবার্গের নথি অনুযায়ী, এমএফএসের স্থিতিপত্রে ৯৩০ মিলিয়ন বা ৯৩ কোটি পাউন্ডের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি কেবল প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক কর্মকাণ্ডের সীমাবদ্ধতা নয়; আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও ঋণবাজারের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়ছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা পরেশ রাজা ২০০৬ সালে এমএফএস প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের সহায়তার জন্য আছি যারা মূলধারার ব্যাংকের জন্য উপযুক্ত নন অথবা সমস্যায় পড়েছেন। যারা বিদেশে অবস্থান করছেন কিংবা অপ্রচলিত সম্পদে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের কথাও আমরা শুনি।’
এমএফএস মূলত ‘জটিল, সম্পত্তিভিত্তিক ঋণ’ প্রদান করে থাকে। এর মধ্যে বাই-টু-লেট মর্টগেজ এবং ব্রিজিং লোন অন্তর্ভুক্ত ছিল। এগুলো স্বল্পমেয়াদি ঋণ, যা বিভিন্ন বাস্তব সম্পদে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়।
সাইফুজ্জামান চৌধুরী ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহক হিসেবে আবির্ভূত হন। এ সময় তিনি যুক্তরাজ্যে বড় ধরনের সম্পত্তি পোর্টফোলিও গড়ে তোলেন। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্যানুযায়ী, ভূমিমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি এমএফএস-সম্পৃক্ত ঋণদাতাদের কাছ থেকে শত শত সুরক্ষিত ঋণ গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এসব ঋণের পরিশোধ শুরু হয়।
এনসিএর তদন্তে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুনে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর যুক্তরাজ্যভিত্তিক ১৭ কোটি পাউন্ড মূল্যের সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এমএফএস বা প্রতিষ্ঠাতা রাজার বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের হয়নি।
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এমএফএসের একটি শক্তিশালী আন্ডাররাইটিং দল রয়েছে। এই দল প্রতিটি ঋণ যাচাই করে এবং মানি লন্ডারিংবিরোধী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায় বাংলাদেশের সরকারের কোনো প্রভাব নেই।
প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় এমএফএসের কাঠামো আলাদা। এটি একটি শ্যাডো ব্যাংক, অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি ঋণ প্রদান করে, কিন্তু আমানত গ্রহণ করে না। ফলে মূলধারার ব্যাংকের মতো কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আওতায় পড়ে না। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০০ কোটি পাউন্ড মূলধন সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছিল। একই সঙ্গে দাবি করেছিল, তাদের ঋণ পোর্টফোলিও প্রায় ২৫০ কোটি পাউন্ড। প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে যাওয়ার আগে রাজার বক্তব্য ছিল, ২০২৬ সালে এই ঋণ পোর্টফোলিও ৩৫০ কোটি পাউন্ডে উন্নীত হবে।
এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। বার্কলেজ, জেফারিজ এবং অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের প্রায় ১২০ কোটি পাউন্ড ঋণ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এর প্রভাব শেয়ারবাজারেও পড়েছে। বার্কলেজের শেয়ার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, জেফারিজের ৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের শেয়ার ৪ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে।
আদালতের বিচারক ব্রিগস বলেন, ‘জালিয়াতির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। ঋণদাতাদের স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত সম্পদ সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।’ আদালতে রাজার বক্তব্য ছিল, ‘মূল ব্যবসার ব্যর্থতা নয়, বরং সাময়িক কারিগরি জটিলতার কারণে কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।’
বিশ্লেষকেরা ইতিমধ্যে বড় ব্যাংকগুলোর সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। স্যানট্যান্ডার, ওয়েলস ফার্গো, জেফারিজ এবং বার্কলেজসহ কয়েকটি বড় ব্যাংক এমএফএসকে ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে বার্কলেজের প্রায় ৬০ কোটি পাউন্ড ঝুঁকিতে রয়েছে। জেফারিজের প্রায় ১০ কোটি পাউন্ড এবং অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের প্রায় ৪০ কোটি পাউন্ড ঝুঁকিতে থাকতে পারে।
বাংলাদেশ সরকারও বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পদ এবং সংশ্লিষ্ট ঋণসংক্রান্ত অনিয়ম নিয়ে তদন্ত চলছে।
এদিকে যুক্তরাজ্যে লেবার এমপি টিউলিপ সিদ্দিক দুর্নীতির অভিযোগে মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি খালার সরকারের কাছ থেকে অবৈধভাবে জমি গ্রহণ করেছেন। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এমএফএস কেসটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ, শ্যাডো ব্যাংকিং, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বৈশ্বিক অর্থপ্রবাহের স্বচ্ছতা নিয়ে একটি জটিল উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। এটি শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; বরং বৈশ্বিক আর্থিক নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে ধরেছে।
এমএফএসের ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, শ্যাডো ব্যাংকিং ও বিদেশি সম্পদে বিনিয়োগে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা না থাকলে কীভাবে আর্থিক অনিয়ম বড় আকার নিতে পারে। বিশেষ করে বিদেশি বাজারে বাংলাদেশি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও যথাযথ তত্ত্বাবধানের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই ঘটনাকে অনেকেই আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং এবং শ্যাডো ব্যাংকিং খাতের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। এটি প্রমাণ করে যে, বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে স্বচ্ছতা, কঠোর তদারকি এবং নিয়মিত যাচাই প্রক্রিয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বাংলাদেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিদেশি সম্পত্তি ও ঋণ কার্যক্রম স্বচ্ছ হওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা বাড়াতে বিনিয়োগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এসব কর্মকাণ্ডের জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং প্রয়োজন হলে শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরি।’

