অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য একে একে প্রকাশ হচ্ছে। শুধু তাই নয়, উপদেষ্টাদের সুপারিশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও মিলছে। সদ্য সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে শত শত অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর যারা ক্ষমতার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তাদের হাতের ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে লুটপাট চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই সাবেক সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার উপদেষ্টাদের দুর্নীতির বিষয়ে সরব হয়েছিলেন। ২০২৫ সালের আগস্টে তিনি জানিয়েছিলেন, অন্তত আটজন উপদেষ্টার সীমাহীন দুর্নীতির প্রমাণ তাঁর কাছে রয়েছে। সরকার অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করলেও, ক্ষমতা ছাড়ার পর সেই অভিযোগ একে একে সত্যতা পাচ্ছে।
দুদক সূত্র জানায়, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসসহ প্রায় সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে দায়িত্ব ছাড়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই। দুর্নীতির অভিযোগে চারজন উপদেষ্টা ও এক বিশেষ সহকারীর ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এর মধ্যে রয়েছেন সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ফাওজুল কবির খান, আসিফ মাহমুদ, আদিলুর রহমান খান এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বখস চৌধুরি।
সূত্র জানায়, উপদেষ্টাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখছে সংস্থাটি। দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি পাঠিয়ে তথ্য তলব করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও যুব-ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে। তার একান্ত সহকারী (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে এত বেশি অনিয়ম ও দুর্নীতি অভিযোগ ছিল যে তাকে উপদেষ্টা পদেই বরখাস্ত করা হয়েছিল। এই এপিএসের দুর্নীতি তদন্ত করছে দুদক।
চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে মোয়াজ্জেম হোসেনের গাড়িচালকের ভাই সম্পর্কেও। এনবিআরের আয়কর নথি অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তার আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার আয়ের তথ্য রয়েছে। এছাড়া আসিফ মাহমুদ প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর, অযৌক্তিক প্রকল্প নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসক এজাজের দুর্নীতিও তদন্ত করছে দুদক।
অন্তর্বর্তী সরকারের আরেক ছাত্র উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের এপিএসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তাঁর স্ত্রীর মাধ্যমে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’-এ নিয়োগ অনিয়ম ও শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে টেলিভিশন চ্যানেল লাইসেন্স প্রদানে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ জমা পড়েছে।
দুর্নীতির অভিযোগ থেকে বাদ যায়নি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার সহকর্মী স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমসহ আরও কেউ।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তবে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। প্রাথমিক তথ্য আমলযোগ্য হলে তা অবশ্যই তদন্ত করা দরকার।”

