রাজধানীর লালবাগের বাসিন্দা দিবারুল আলম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ঢাকার নিয়মিত যানজট এড়াতে তিনি ব্যবহার করেন নিজের সুজুকি জিক্সার-১৫০ মডেলের মোটরসাইকেল কিন্তু এক বছরও না কাটতে দেখলেন, মাইলেজ কমতে শুরু করেছে। ইঞ্জিন বেশি গরম হচ্ছে, এবং সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বাইক হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। কখনও স্টার্টও নিচ্ছে না।
প্রথমে মেকানিকের পরামর্শে কার্বুরেটর পরিষ্কার করানো হলেও সমস্যা ক’দিন পর আবার দেখা দেয়। শেষে নতুন কার্বুরেটর বসাতে হয়, খরচ হয় প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। তবুও তিন মাসের মাথায় একই সমস্যা ফের আসে। দিবারুল জানালেন, মেকানিকের সঙ্গে আলোচনা করে বুঝতে পেরেছেন, মূল কারণ ভেজাল তেল। তেলে ময়লা জমে যাওয়ায় কার্বুরেটর খারাপ হচ্ছে, যা বাইক বন্ধ হওয়ার কারণ।
তিনি বলেন, “বাইক নিয়ে সবসময় ঝামেলায় থাকি। হঠাৎ স্টার্ট না নিলে রাস্তার ধারে মেকানিক খুঁজতে হয়। আগে প্রতি লিটারে ৩২–৩৫ কিলোমিটার চলতো, এখন মাত্র ২৮ কিলোমিটার। ট্যাংকিতে জং ধরে গেছে। মেকানিক বলছেন, ট্যাংকি খুলে চার-পাঁচ দিন পুডিং দিতে হবে, না হলে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে।”
বিএসটিআই সার্টিফিকেশন মার্কস উইংয়ের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, পাম্পে তেলের মান পরীক্ষা করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে ভেজাল তেল পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, “পাম্পগুলো ডিপো থেকে তেল নেয়, তবে কিছু পাম্পের তেল খারাপ হয়ে যাচ্ছে, এটা আমাদের শোকজের বিষয়। সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।”
রাজবাড়ীর বাসিন্দা শ্রাবণ রাজও ভেজাল তেলের সমস্যায় ভোগেছেন। তার টয়োটা করোলা এক্সিও কয়েক বছরের ব্যবহারের পর মাইলেজ কমে মাত্র ৮ কিলোমিটার লিটার হয়ে যায়। গাড়ি ইঞ্জিন মিসফায়ার করা, থ্রটল বডি ও ইনজেক্টরে কার্বন জমা, এবং ইঞ্জিন ওভারহিট হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। শ্রাবণ জানালেন, “ভেজাল তেলের কারণে এসব সমস্যা হয়েছে। পরে গাড়ি বিক্রি করে দিতে হয়েছে।”
যশোরের পারভেজ আলমও নতুন বাইক কেনার সাত-আট মাসের মধ্যে ওভার ফ্লো সমস্যায় পড়েছেন। মেকানিক বলেছে, ভেজাল তেলের কারণে এমন সমস্যা হচ্ছে। সার্ভিস করানো গেলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। ঢাকার কাঁটাবনের মেকানিক মোজাফফর বলেন, “অনেক বাইক ও গাড়ি ওভার ফ্লো বা কার্বুরেটর সমস্যায় আসে। সমাধান করলেও কিছুদিন পরে আবার একই সমস্যা দেখা যায়। এখন প্রধান কারণ ভেজাল তেল।” দর্শকদের জন্য স্পষ্ট বার্তা হলো—ভেজাল তেলের কারণে গাড়ি ও বাইকের পারফরম্যান্স ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মালিকদের সতর্ক থাকা জরুরি, এবং সরকারের উচিত মানহীন তেলের সরবরাহ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
ভেজাল তেলের কারণে গাড়িতে যে ক্ষতি ঘটে
ভেজাল তেলে সাধারণত পানি, রাসায়নিক দ্রব্য বা সস্তা তেল মেশানো থাকে। এই ধরনের তেল ইঞ্জিনের জ্বালানি জ্বালানোর ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে মাইলেজ কমে যায়, ইঞ্জিনের শক্তি কমে যায়, এবং থ্রটল সঠিকভাবে কাজ করে না।
ইঞ্জিনের বেলন, পিস্টন ও স্পার্ক প্লাগে কালো কার্বন জমতে শুরু করে। ভেজাল তেলে ময়লা বা অপরিষ্কার পদার্থ থাকলে ফুয়েল ইনজেক্টর ব্লক হয়ে যায়। ইনজেক্টরের ক্ষতি হলে জ্বালানি সঠিকভাবে ইঞ্জিনে পৌঁছায় না। ফলে দেখা দেয় স্টার্টিং সমস্যা, ধোঁয়া বের হওয়া বা ইঞ্জিনের ঝোঁক কমে যাওয়া। ভেজাল তেল ঠিকমতো দহন না হওয়ায় ইঞ্জিন অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন করে। পানি বা নোংরা পদার্থ ধাতব অংশে ক্ষয় ঘটায়। ট্যাংকির ভেতরে জং ধরে, পাইপ বা লুব্রিকেশন সিস্টেমেও ক্ষতি হয়।
দীর্ঘমেয়াদে, ভেজাল তেলের কারণে ইঞ্জিনের পারফরম্যান্স ও স্থায়িত্ব কমে যায়। বিশেষ করে মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে, কার্বুরেটর নষ্ট হয়ে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া বা স্টার্ট নিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। মাঝে মাঝে কার্বুরেটর পরিষ্কার করলেও, দীর্ঘ সময়ের ব্যবহারে কার্বুরেটর পরিবর্তন করা প্রয়োজন হয়।
তেল চুরির পর ঘাটতি পূরণে মেশানো হয় ভেজাল
দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহের একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বিপিসি আমদানির পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি তেল পরিশোধনাগার ও গ্যাস ফিল্ডের পরিশোধনাগার থেকে তেল সংগ্রহ করে। এরপর তেল ডিলারদের মাধ্যমে বাজারে বিক্রি করা হয়। বিপিসির অধীনে থাকা তিনটি সরকারি কোম্পানি—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা—সারা দেশে ৪৭টি ডিপোতে তেল সরবরাহ করে।
তবে অভিযোগ আছে, এসব ডিপোর মধ্যে কিছু স্থানে ভেজাল তেল মিশিয়ে তেল চুরি করা হচ্ছে। বেসরকারি পরিশোধনাগার থেকেও নিম্নমানের তেল সংগ্রহের অভিযোগ আছে। চুরি করা তেলের ঘাটতি পূরণে ভেজাল তেল মেশানো হয়। আর এতে ভোক্তারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা প্রফেসর ড. শামসুল আলম বলেন, “দিনশেষে ভোক্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দেশের জ্বালানি সংকট যেমন আছে, রাজনৈতিক সংকট তার চেয়েও বেশি। রাজনীতিবিদরা অধিকাংশই ব্যবসায়ী। রাজনীতিবিদরা ব্যবসায়ী হলে আর ব্যবসায়ীরা রাজনীতিবিদ হলে দেশের যে দুর্গতি হয়, সেটাই ঘটছে।”
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক জানান, “আমরা বিপিসিতে অনেকবার চিঠি দিয়েছি। অভিযোগ দেওয়ার বাইরে আর কিছু করার নেই। সরকার দেখবে, আমরা দেখছি কী হয়। কিন্তু বাস্তবে কিছু হয় না। আমরা ডিপো থেকে তেল পাই এবং যেভাবে পাই সেভাবেই বিক্রি করি। ভোক্তারা আমাদের গালি শুনে। বিএসটিআই মান পরীক্ষা করে না, শুধু পরিমাণ দেখেই সমর্থন দেয়।”
সরকারের যুগ্ম সচিব ও বিপিসির পরিচালক (অপারেশন্স ও পরিকল্পনা) ড. এ কে এম আজাদুর রহমান বলেন, “আমরা মোবাইল কোর্ট চালাচ্ছি। আমাদের প্রায় আড়াই হাজার পেট্রোল পাম্প রয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পেলে স্যাম্পল নিয়ে টেস্ট করবো। লিখিত অভিযোগ দিলে অবশ্যই তদন্ত হবে।”
বিএসটিআই সার্টিফিকেশন মার্কস উইংয়ের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “পাম্পের তেলের মান পরীক্ষা করি। কিছু ক্ষেত্রে ভেজাল পাওয়া যাচ্ছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে ঠিক আছে। শোকজ করেছি, তারা জবাব দিয়েছে। পাম্পগুলো ডিপো থেকে তেল নেয়, কিন্তু কিছু পাম্পের তেল খারাপ হচ্ছে—যেখানে অন্য পাম্পের তেল ভালো পাওয়া যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন, কোনো অপরিশোধিত তেল বাজারে আসছে কি না। আমরা পুনরায় স্যাম্পল নিয়ে কাজ চালাব।” ভেজাল তেলের এই ছড়াছড়ি সাধারণ ভোক্তাদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। তেল চুরি ও নিম্নমানের তেলের কারণে গাড়ি-মোটরসাইকেলের কর্মক্ষমতা কমছে, এবং নিরাপদ যানবাহন ব্যবহারের উপর প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষক এবং সেন্টার ফর এনার্জি স্টাডিজের সাবেক পরিচালক প্রফেসর ড. মো. এহসান বলেন, “ভেজাল তেলের সমস্যা বাংলাদেশে নতুন নয়। বহু বছর ধরে চলে আসছে। তেলের সঙ্গে কোন জিনিস মেশানো হচ্ছে তার ওপর ইঞ্জিনের ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে।”

তিনি ব্যাখ্যা করেন, “তেলের স্থানে তেলজাতীয় দ্রব্য, কনডেনসেট বা অন্য কিছু দেওয়া হলে তা দহন করার সময় কার্বনজাতীয় পদার্থ জমা হয়। তখন ইঞ্জিন স্পার্ক করে না বা সঠিকভাবে কাজ করে না। স্পিড কমে যায়। এজন্য ইঞ্জিন খুলে পরিষ্কার করতে হয়। আবার ‘র’ ফুয়েল পিউরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় তেল ব্যবহারযোগ্য করা হয়। কিন্তু যদি তাতে ভেজাল মেশানো হয়, তা জং ধরার কারণ হতে পারে।”
প্রফেসর এহসান আরও বলেন, “সাধারণত প্রোডাকশন কম হওয়া জায়গায় ভেজাল মেশানো হয়। সাপ্লাই চেইনের—ডিপো, পরিবহন ও খুচরা পর্যায়ের—বিভিন্ন জায়গায় তেল চুরি হলে ঘাটতি পূরণের জন্য ভেজাল তেল মেশানো হয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা। সরকার অনেক কমিটি করেছে, কিন্তু পুরোপুরি ম্যানেজ করা সম্ভব হয়নি। তবে সরকারও জানে এগুলো হচ্ছে।”
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর জ্বালানি উপদেষ্টা প্রফেসর ড. শামসুল আলম বলেন, “বাংলাদেশের কোনো সেবামূলক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই জনগণের স্বার্থ রক্ষা করছে না। জনগণের করের টাকায় যারা বেতন পান, তারা দায়িত্ব পালন করেন না। ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি ও স্বার্থের কারণে সমস্যা টিকে থাকে এবং তারা লাভবান হয়।”
তিনি আরও বলেন, “প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, কিন্তু তাদের কোনো প্রভাব নেই। দায়িত্ব পালন হয় না। রাষ্ট্রের ক্ষমতা না থাকায় এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। প্রতিটি সেক্টরের রেগুলেটর মন্ত্রণালয় রেগুলেটরি বা নজরদারির কাজ করে না। তাই যা হওয়ার তাই হচ্ছে। দিনে শেষে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তা।”
প্রফেসর শামসুল আলম বলেন, “দেশে জ্বালানি সংকট যেমন আছে, রাজনৈতিক সংকট তার চেয়েও বেশি। রাজনীতিবিদরা অধিকাংশই ব্যবসায়ী। যখন রাজনীতিবিদ ব্যবসায়ী এবং ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ, তখন দেশের যে দুর্গতি হয়, সেটাই ঘটে।

