সিরাজুল ইসলাম, যিনি এস ইসলাম হোম অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেড এর কর্ণধার, তার বিরুদ্ধে প্রায় ৮৭৬ কোটি টাকা অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া তার রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণের চার মাস পার হলেও ৭৪টি চালানের বিপরীতে ৩৫ লাখ ২৯ হাজার মার্কিন ডলার দেশে ফেরত আনা হয়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব লেনদেনে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক, মহাখালী করপোরেট শাখা ব্যবহৃত হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন ইতিমধ্যেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ পাঠানো হয়েছে। তবে, সিরাজুল ইসলাম এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
দুবাই থেকে যুগান্তরের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে গিয়ে সিরাজুল ইসলাম জানান, “আমি কোনো অর্থ পাচার করিনি। করোনাকালীন সময়ে ব্যাংক যথাসময়ে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দেয়নি। তাই কিছু বিল দেশে ফেরত আসেনি। ৭৪টি রপ্তানি বিলের বিপরীতে ৩৫ লাখ ২৯ হাজার মার্কিন ডলার ফেরত আসেনি। ধীরে ধীরে এটি আনা হবে। আগে বিলের সংখ্যা ছিল ১০০টির বেশি, তা কমিয়ে এনেছি। অগ্রণী ব্যাংক ৩৮ কোটি টাকা পাবে, কিছু দিন খেলাপি ছিলাম, এখন নবায়ন করা হয়েছে।”
বিএফআইইউ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে সিরাজুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ায় ২২৭টি রপ্তানি চালানের মাধ্যমে ৭৫ লাখ ৭৮ হাজার মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। কিন্তু পণ্যের এইচএস কোড ভিত্তিক তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইউনিট মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে ১.৭৮ গুণ থেকে ১০.৬৪ গুণ কম দেখানো হয়েছে।
ফলে, প্রকৃত রপ্তানি মূল্য হতে পারে ১ কোটি ৩৪ লাখ ডলার থেকে ৮ কোটি ৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ৫৮ লাখ ২২ হাজার ডলার থেকে ৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার অবৈধভাবে দেশে ফেরেনি। দেশের মুদ্রায় এটি দাঁড়ায় প্রায় ৭০ কোটি থেকে ৮৭৬ কোটি টাকার মধ্যে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি পিস টি-শার্ট, প্যান্ট বা ট্রাউজারের মূল্য ১ থেকে ১.৫ মার্কিন ডলার দেখানো হয়েছে। গোয়েন্দারা মনে করছেন, প্রকৃত বাজারমূল্য এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। একই গন্তব্যে বড় চালানকে ছোট ইনভয়েসে বিভক্ত করার প্রক্রিয়াও পাওয়া গেছে, যা শুল্ক নজরদারি এড়ানোর কৌশল হতে পারে।
রপ্তানির অর্থ ব্যাংক হিসাব খোলার পরপরই নগদে উত্তোলন করা হয়েছে। ২০২০ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৪৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা জমা ও সমপরিমাণ নগদ উত্তোলন হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের লেনদেন অর্থের উৎস ও গন্তব্য আড়াল করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ আছে, সিরাজুল ইসলাম দুবাইভিত্তিক ‘মোহাম্মদ সিরাজুল গার্মেন্টস ট্রেডিং এলএলসি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানেরও মালিক। এই প্রতিষ্ঠানের নামে রপ্তানি চালান দেখানো হয়েছে। তবে বিদেশে বিনিয়োগ বা কোম্পানি গঠনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়া যায়নি। জাহাজীকরণের চার মাস পেরিয়ে গেলেও ৩৫ লাখ ২৯ হাজার মার্কিন ডলার দেশে ফেরেনি। দেশে ফেরানো না হলে এটি বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সংক্রান্ত আইন এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী অপরাধ হতে পারে।
বিএফআইইউ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স অর্থ রপ্তানি মূল্য প্রত্যাবাসনের নামে দেশে পাঠানো হয়েছে কিনা বা অবৈধ হুন্ডি/হাওলা পদ্ধতি আছে কিনা তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত। সাভারের বিরুলিয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম দেখা গেছে। সেখানে ৪০০-৪৫০ কর্মী কাজ করছেন। তবে ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অগ্রণী ব্যাংকের মহাখালী শাখার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা জানান, ঋণের পরিমাণ ৯০ কোটি টাকার বেশি, যার বেশির ভাগ খেলাপি। তবে প্রধান কার্যালয়ের একজন ডিজিএম জানিয়েছেন, বর্তমানে অধিকাংশ ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। ব্যাংক সমস্ত তথ্য বিএফআইইউকে সরবরাহ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “কিছু ব্যাংকে ঋণের নামে অর্থ পাচারের প্রাথমিক দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই বিষয়ে কঠোর এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ পাচার প্রতিরোধে সজাগ। যদি কোনো ব্যাংকের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

