জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য নিত্যদিনের ঘটনা। আগের মতোই হাসপাতালের বাইরে ও ভিতরে রোগীদের ভাগিয়ে নেওয়া, অতিরিক্ত টাকা নেওয়া এবং ওষুধ ফের বিক্রির মতো অনিয়ম চলছে প্রকাশ্যেই। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই একাধিকবার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বহুবার সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের সহায়তা চেয়েও এই দালাল নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বাহিরের দালালদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার মধ্যে হাসপাতালে কর্মরত অভ্যন্তরীণ দালাল চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে কর্মচারীদের একটি সিন্ডিকেট রোগী ভাগাভাগি, ওয়ার্ড বয় হয়ে চিকিৎসক সেজে চিকিৎসা দেওয়া, অতিরিক্ত ওষুধ ক্রয় করিয়ে বিক্রি করা, বেড বরাদ্দে টাকা নেওয়া এবং জোর করে বকশিশ আদায়সহ নানারকম অনিয়মে জড়িত। এসবের সুনির্দিষ্ট তথ্য, ছবি ও ভিডিও প্রতিবেদকরা সংগ্রহ করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, হার্টের রিং পরানো রোগীদের শিট খোলার জন্য ৫০০ টাকা নিচ্ছেন ওয়ার্ড বয় আলাউদ্দিন। একইভাবে মশিউর রহমান লাবলু ও আলাউদ্দিন রিং পরানো রোগীদের শিট খুলছেন, অর্থাৎ দালাল চক্র কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলতে আসছে। অভিযোগ বা প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে অভিযুক্তদের এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে স্থানান্তর করেই দায় সারানো হয়। এর ফলে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ সৎ চিকিৎসক ও কর্মকর্তা কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছেন।
চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি এক ঘটনায় এর ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া জিন্নাত আলীকে হৃদরোগ হাসপাতালে নেওয়া হয়। জরুরি বিভাগ থেকে সিসিইউতে পাঠানোর পরও একজন স্টাফ বাধা দেন। রোগীর অবস্থা খারাপ দেখিয়ে তাদের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানো হয়, যেখানে অর্থ নেওয়া হলেও চিকিৎসা কার্যকর হয়নি। রোগীর অবস্থা আরও অবনতি হলে, শেষে হাসপাতালে ফিরিয়ে আনা হলেও তিনি মারা যান। রোগীর স্বজন আবু হুরায়রা হাসপাতালের নানান বিভাগে প্রতিকার চাইতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তিনদিনে হাসপাতালে ডজনখানেক চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সঙ্গে আলাপ করে নিয়মিত এমন ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। জরুরি বিভাগ, ক্যাথল্যাব, সিসিইউ-১ ও সিসিইউ-২তে পৃথক সিন্ডিকেটের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এরা রোগী ভাগাভাগি, টাকা আদায় ও ডাক্তার সেজে ওষুধ বিক্রির কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। এসব ঘটনা ভিডিও এবং স্থির চিত্রসহ প্রতিবেদকরা সংগ্রহ করেছেন।
হাসপাতালের সব স্তরে সক্রিয় অপরাধী চক্র
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে রোগী ভাগাভাগি, অতিরিক্ত টাকা আদায় ও ওষুধ পাচারের দালাল চক্রের ঘটনা দেড় দিনের নয়, বরং দীর্ঘদিনের। জাগো নিউজের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই চক্র শুরু হয় হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে।
জরুরি বিভাগে ওয়ার্ড বয় শহীদুল ইসলাম, রাশেদুল আলম, আশিকুর রহমান, স্ট্রেচার বেয়ারার আলী হোসেন এবং ডোম মো. লিটনের একটি সিন্ডিকেট কার্যক্রম চালাচ্ছে। রোগী ট্রলি বা হুইল চেয়ার পেতে হলে আগে টাকা দিতে হয়। টাকা ছাড়া কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন না। রোগীর অবস্থা খারাপ বা সুবিধাবঞ্চিত হলে, ভয় দেখিয়ে আইসিইউয়ের বদলে বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে কমিশন আদায় করা হয়।
সিসিইউ-১ ও সিসিইউ-২ তে এমএলএসএস আব্দুল জব্বার, ওয়ার্ড বয় আব্দুল গফুর ও আশরাফুল হকের নেতৃত্বে সিন্ডিকেট চলছে। একজন রোগীর বেড দিতে তারা ২–৩ হাজার টাকা নেওয়ার মতো অনিয়ম করছে। ডাক্তার সেজে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া, অতিরিক্ত ওষুধ কিনে পাচার করা এবং এমআই রোগীদের ভাগাভাগি করা এ চক্রের নিয়মিত কাজ। এছাড়া, হৃদরোগ হাসপাতালের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকের ক্লিনিকে এনজিওগ্রাম বা পিসিআই করিয়ে কমিশন আদায়ও এদের কর্মকাণ্ডের অংশ।
সিসিইউতে আগে থেকেই ওষুধের নাম লিখে রাখা হয়। মেডিকেল অফিসারের সিল মেরেই রোগীর স্বজনদের হাতে স্লিপ তুলে দেওয়া হয়। রোগীরা ওষুধ কিনলে তা পুনরায় ওয়ার্ড বয়দের হাতে চলে যায়। তিন শিফটের ওয়ার্ড বয়দের সিন্ডিকেট প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকার ওষুধ বিক্রি করে এবং তার ভাগ কমিশন ব্রাদাররা পান। এ কাজে সহযোগিতা করেন ব্রাদার শাহিন, সাদী ও জুয়েল। সিসিইউতে রোগীদের জন্য সিভিপি সেট কেনা হলেও প্রকৃত ব্যবহার হয় না। পুরাতন সেট খুলে নতুন সেট বসানো হয় এবং পুরাতন সেট পরে বিক্রি করা হয়। একটি সিভিপি সেটের দাম প্রায় ৩ হাজার টাকা।

ক্যাথল্যাব ও এইচডিইউ-তে ওয়ার্ড বয় আলাউদ্দিন, আব্দুর রহমান এবং মশিউর রহমান লাবলু পিএসআই রোগীর শিট খুলে ৫০০–১০০০ টাকা নেন। অন্য ক্যাথল্যাবে সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে সিন্ডিকেট রোগীদের এনজিওগ্রামের পর অতিরিক্ত টাকা আদায় করে। না দিলে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়।
হাসপাতালের লিফটম্যানরা নিয়মিত লিফটে ডিউটি করেন না। কেউ আউটডোরে, কেউ চিকিৎসকের রুমে, কেউ জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। এদের কাজের মূল উদ্দেশ্য হলো রোগীকে বাইরের ক্লিনিকে পাঠিয়ে কমিশন নেওয়া। জরুরি বিভাগে লিফটম্যান সুমনও রোগীর স্বজনদের থেকে ৫ হাজার টাকা আদায় করে লাইফ সাপোর্টসহ চিকিৎসার আশ্বাস দেন। জাগো নিউজের হাতে এ সম্পর্কিত ছবি ও ভিডিও রয়েছে।
ফ্রি ওয়ার্ডেও রোগীদের বেড পেতে টাকা দিতে হয়। রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যাতায়াতেও অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। হাসপাতালের বহিঃবিভাগে ওয়ার্ডে হকারদের উপস্থিতি এবং বহিরাগত দালাল ও অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের উৎপাত পুরো হাসপাতালের ভেতরে-বাইরে বিশৃঙ্খলার চিত্র ফুটিয়ে তোলে। অনুসন্ধানে পরিষ্কার হয়েছে, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে একাধিক স্তরের দালাল চক্র রোগীদের দুর্ভোগ ও অর্থশোষণে নেপথ্য নায়ক হিসেবে কার্যকর।
অভিযুক্তদের বক্তব্য:
ক্যাথল্যাবের ওয়ার্ড বয় আরিফুর রহমান বলেন, “পিসিআই রোগীদের শিট খোলার দায়িত্ব মূলত ডাক্তারদের। তবে আমরা ওখানেও শিট খুলি।” টাকা নেওয়ার বিষয় জানতে চাইলে তিনি জানান, “এগুলো আমরা বাদ (ছেড়ে) দিছি।”
একই ক্যাথল্যাবের ওয়ার্ড বয় সাইফুল ইসলাম বলেন, রোগীদের কাছ থেকে ৫০০–১০০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগে, “আপনি হয়তো ভুল শুনছেন। আমরা এমন কাজ করি না।” সিসিইউ-১ এর ওয়ার্ড বয় আব্দুল মালেকও তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “এরকম কিছু আমার জানা নেই।”

তবে সিসিইউ-১ এর একজন অপর অভিযুক্ত ফোনে স্বীকার করেছেন, ডাক্তার সেজে চিকিৎসা দেওয়া, বেড দিতে গিয়ে টাকা নেওয়া, ওষুধ বেশি কিনে বিক্রি করা এবং রোগী বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানোর ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, “এগুলো আমি প্রতিবাদ করি। ওয়ার্ড মাস্টাররা রোস্টার করে ৩০০–৪০০ টাকা নেন। প্রতিবাদের জন্য আমাকে এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে ঘোরানো হয়।” তবে তিনি তার নাম প্রকাশ করতে অনুরোধ করেন।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী জানান, “আমাদের অজ্ঞাতসারেই কিছু দুষ্টু চক্র অপরাধ-অনিয়মে জড়িয়ে যায়। এ কাজে চিকিৎসক-কর্মকর্তারাও কখনো বিক্রি করে। টাকা নেওয়ার সময় বলে—‘অমুক স্যারকে দেওয়া লাগবে’। তবে তারা নিজেও জানে না। রোগী ও স্বজনদের সচেতন হওয়া উচিত। কেউ অনিয়ম দেখলে আমাদের জানালে ব্যবস্থা নেবো।”
ভাস্কুলার ওটির ওয়ার্ড বয় গিয়াস উদ্দিনও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ভিডিও ফুটেজের প্রমাণ দেখিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার জানা নেই।” বাকি অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রচেষ্টা করা হলেও বারবার ফোনে তারা সাড়া দেননি।
আমার সুস্থ বাবাকে মেরে ফেলেছে, বিচার চাই’
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ভুক্তভোগী আবু হুরায়রা তার বাবার চিকিৎসা নেওয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। তিনি জানান, মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতাল থেকে শ্বাসকষ্ট নিয়ে বাবাকে নেওয়া হলে হৃদরোগ হাসপাতালে সকাল সাড়ে ৭টায় জরুরি বিভাগে আনা হয়। সেখান থেকে সিসিইউতে ভর্তি হওয়ার কথা থাকলেও শহীদ নামে একজন স্টাফ বাধা দেন।
আবু হুরায়রা বলেন, “দুইজন স্টাফ পরীক্ষা করে বললো, বাবার হার্টে কোনো সমস্যা নেই, মাথায় সমস্যা। দ্রুত আইসিইউতে নেওয়া লাগবে। এখানে আইসিইউ নাই। ঢাকায়ও আইসিইউ পাওয়া কঠিন। আমি রাজি হলে তারা গাড়ি ঠিক করে নিয়ে গেছেন।”

হৃদয় হাসপাতালে প্রথমে ৬ হাজার টাকা ভর্তির জন্য নেওয়া হয়। এরপর পরীক্ষা ও ওষুধের জন্য আরও ১৬ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে। আবু হুরায়রা জানালেন, “এত ওষুধ একদিনে দেওয়া হবে, অথচ আরও একজনের একদিনে দুই লাখ টাকা বিল করা হচ্ছে। আমি দেবে কীভাবে?
রোগীর স্বজন যখন এই অনিয়মের খোঁজ নিতে গেলে হামলার শিকার হন। আবু হুরায়রা বলেন, “রোগী আনতে গিয়ে আমাকে মারধর করা হলো। ৯৯৯-এ ফোন দিলে পুলিশ আসে। হাসপাতাল থেকে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও সিঁড়ি থেকে আমাকে আধা ঘণ্টা আটকে রেখে মারধর করা হয়। শেষে থানায় অভিযোগ করেছি।” ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন, “আমার বাবা সুস্থ ছিলেন। আমরা শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছি, চিকিৎসা না পেয়ে তিনি মারা গেছেন। এই অনিয়ম ও সহিংসতার বিচার চাই।”
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ধরনের ঘটনা হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও সিসিইউতে নিয়মিতভাবে ঘটে আসছে। রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত করে অর্থ আদায়, বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানো এবং সহিংসতা—এগুলো একাধিক রোগী ও স্বজনদের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাসপাতালে সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহযোগিতা চান পরিচালক
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী স্বীকার করেছেন, “আমাদের অজ্ঞাতসারেই কিছু দুষ্টু চক্র অপরাধ ও অনিয়মে জড়িয়ে যায়। এ কাজে চিকিৎসক-কর্মকর্তারাও কখনও বিক্রি হয়। টাকা নেওয়ার সময় বলে, ‘অমুক স্যারকে দেওয়া লাগবে’, অথচ তারা নিজেও জানে না।”
পরিচালক আরও জানান, “আমাদের সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী প্রতিদিন আসে। এজন্য অনেক কিছু চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। এই ক্ষেত্রে রোগী ও স্বজনদের সচেতন থাকা দরকার। কেউ অনিয়ম দেখলে আমাদের জানালে আমরা ব্যবস্থা নেব। সাংবাদিকদেরও সহযোগিতা চাই। তারা যদি চোখে পড়ে কিছু দেখে আমাদের জানায়, আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব।”
তিনি উল্লেখ করেছেন, “আবু হুরায়রার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত শহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া যেসব অভিযোগ পেয়েছি, সেগুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করেছি এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছি।”
পরিচালক সতর্ক করেছেন, “বেসরকারি হাসপাতালগুলোর বিষয়েও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নজরদারি প্রয়োজন। না হলে তারা একের পর এক এমন শহীদ (অভিযুক্ত ওয়ার্ড বয়) তৈরি করবে। সূত্র: জাগো নিউজ

